১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল চেতনা ছিল টু নেশন থিওরি অর্থাৎ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাজুড়ে পাকিস্তান হবে। বাংলা ও পাঞ্জাব মুসলিম-অধ্যুষিত হওয়া সত্ত্বেও ভাগ করা হয়। এ থেকে বোঝা যায়, টু নেশন থিওরি নামকাওয়াস্তে ছিল। ফলে ফেডারেল পাকিস্তানের টেরিটোরিয়াল আয়তনভিত্তিক পাঁচটি প্রদেশের একটি প্রদেশ হলো পূর্ব পাকিস্তান, যা ভারতের পেটের মধ্যে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। ভারত তার নিকটতম প্রতিবেশী। পাকিস্তান, চীন অন্যান্য দেশ দূরতম প্রতিবেশী।
বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিবেশী বদলানো যায় না। বিশেষ করে ভারত বৃহৎ দেশ হওয়ায় সর্বদাই চাইবে বাংলাদেশ যেন তাদের অনুগত থাকে। এগুলো কোনো রকেট সায়েন্স নয়, বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞানেরও প্রয়োজন নেই। তবে প্রতিবেশী বদলাতে না পারলেও প্রতিবেশীর মানসিকতা বদলানো যাবে না, তা নয়। ভারতের মানসিকতা বদলানোর জন্য বাংলাদেশিদের মানবিক হওয়া ভারতের সঙ্গে কৌশলগতভাবে মেলবন্ধন করা, সরাসরি বৈরিতা বর্জন করা শুধু দরকারই নয় খুবই দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ কারও অধীনে থাকবে না, কারও মর্জিতে চলবে না। বাংলাদেশের এই আকাক্সক্ষাই স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। প্রতিবেশী দেশের কাছে তার তা মাথাব্যথার কারণ। যার ফলে হাদিকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
প্রিয় পাঠক, পূর্ব পাকিস্তান আমলে যা শুনতাম তা হচ্ছে, এ দেশের ব্যাপকসংখ্যক শিল্পকারখানা হচ্ছে না, মানুষ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না, আদমজী, দাউদ বাওয়ানি, ইস্পাহানি ইত্যাদি আলিশান আলিশান মিল ফ্যাক্টরিগুলোর নেতৃত্বে বাঙালি নাই। ছয়টি সুগার মিলে আখনামক কাঁচামাল নেই, এগুলো চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে, ব্যাপক বৈষম্য হচ্ছে। এ দেশে চিনির দাম বেশি, পশ্চিম পাকিস্তানে অনেক কম। পাট উৎপন্ন হয় পূর্ব পাকিস্তানে, পাটজাত সামগ্রী প্রস্তুত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।
আমি আমার অভ্যাসগত কারণে আমার মুরুব্বিদের জিজ্ঞাসা করতাম, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে ছয়টি সুগার মিল, পশ্চিম পাকিস্তানে ১৭টি সুগার মিল, পূর্ব পাকিস্তানে আলিশান যে কটি পাট মিল, পশ্চিম পাকিস্তানে তার থেকে বেশি পাট মিল, তাহলে কেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে কাঁচা পাট এবং আখ জাহাজকে জাহাজ পাচার হয়? তারা উত্তরে বলতেন, পশ্চিম পাকিস্তানের কাঁচামাল দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মিল চলে, পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচামাল দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মিল চলে। এ ক্ষেত্রে আমি বৈষম্যের বাতাবরণ মেলাতে পারি না। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর শুধু চিনির মিল এবং পাট মিলই নয় উত্তরবঙ্গের কেন্দ্রস্থল বগুড়ার গ্লিসারিন সাবান তথা জানে সাবা সাবান, বগুড়া কটন অ্যান্ড স্পিনিং মিলের কম্বলসহ রকমারি গার্মেন্ট প্রোডাক্ট, ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত এবং রপ্তানিযোগ্য প্রোডাক্ট, গ্লাস ফ্যাক্টরি, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, অটোজ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ বগুড়ায় ছিল না-কি বলা মুশকিল। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে আদমজি, দাউদ বাওয়ানি ইত্যাদি বহুমুখী পাটশিল্প বন্ধ হয়ে গেল কেন?
লাখ লাখ শ্রমিক বেকার কেন? চিনির কলগুলো কোনোমতে ভর্তুকিতে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এগুলোর আগের অবস্থা এবং বর্তমান অবস্থা যারা একচোখে দুই দফার অবস্থা দেখেছে তাদের অন্তর কষ্টে জর্জরিত হয়ে হাদির অন্তরতুল্য হয়, তাতে লাভ কি? দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি বাস্তবতা, সত্য ধারণা, চিন্তা-চেতনা না করে সে ক্ষেত্রে কার কী করার আছে!
দেশের রাজনৈতিক দলভুক্ত তৃণমূল পর্যায় থেকে মূল পর্যায় পর্যন্ত সবারই খাই খাই, পাই পাই প্রত্যাশা পূরণে হেন অপকাজ নাই যে তারা পরোক্ষভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে করতে উদ্যত হয় না। ২০২৪-এর জুলাইয়ে যা ঘটল তা বিপ্লব না অভ্যুত্থানের আভিধানিক অর্থের পার্থক্যে বৈষম্য দূরীকরণের চেতনাতে আমল দেওয়া হয় না। ফলে বিপ্লব দ্বারা ব্যক্তির পরিবর্তন শুধু নয়, বন্দোবস্তের পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন, পদ্ধতির পরিবর্তন হতে হবে। যে পদ্ধতি দ্বারা এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যে সেবা করার মনোভাব গড়ে উঠবে তেমনটিই কাম্য। তাহলে নমিনেশন পাওয়ার জন্য ন্যায্যবাদী ছাড়া অন্যরা আকাক্সক্ষা করবে না। দায়বদ্ধতা বড় কঠিন জিনিস, এই কঠিন কাজ করার জন্য ব্যক্তিসম্পদ আকাক্সক্ষীরা নির্বাচনে ব্যয় করে বেকায়দায় পড়তে চাইবেন না।
ন্যায্য ভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভালো মনের অধিকারী, সেবা করার আকাক্সক্ষী উপযুক্ত ব্যক্তিরাই শুধু নমিনেশন চাইবে। ধনসম্পদ আকাক্সক্ষীরা উদ্যোক্তা হবে, ব্যবসাবাণিজ্য করবে, মন্ত্রী-এমপিরা তাদের দায়বদ্ধতা থেকে উপযোগিতা অনুমানে অভিভাবকত্ব করবে। যে মন্ত্রী-এমপির অধিক সম্পদ হবে তার প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে, ফরমাল আদালত এবং জনআদালতে জবাবদিহি করতে হবে, এগুলোই হচ্ছে জুলাই সনদের চেতনা।
১২ ফেব্রুয়ারিতে গণভোট হবে এবং সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ভোট হবে। মন্ত্রী-এমপির ভোটে সবাই সোচ্চার। গণভোটে গৌণ মানসিকতায় আছেন। কোনো একটি দেশের আমূল পরিবর্তন, বন্দোবস্তের পরিবর্তন করে বিপ্লবকে সার্থক না করলে বিপ্লবের জন্য বলপ্রয়োগকারী অ্যাক্টিভিস্ট নেতা-নেত্রীর প্রতি স্বীকৃতি এবং শহীদদের প্রতি সম্মান কোনোটাই হয় না, হলে হাদিদের আত্মহুতি দিতে হতো না।
ন্যায় এবং অন্যায়ের পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ অনেক দিন জিইয়ে থাকে। তারপর কোনো না কোনো সময় ন্যায়ের যুদ্ধ জিতবেই, অন্যায়কারীদের অনিষ্ঠ হবে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস