দেশবাসীকে পাহাড়সম প্রত্যাশা ও স্বপ্নে বিভোর করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা হয়েছিল। গণ অভ্যুত্থানে চব্বিশের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর ৮ আগস্ট এ সরকারের যাত্রা। মাত্র ১৮ মাসে সরকারের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব নয়। তবে সত্যিকার সদিচ্ছা ও ধারাবাহিক চেষ্টা থাকলে আরও বহু ক্ষেত্রেই মানুষের ভালোবাসা, আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার জায়গা তৈরি করা সম্ভব হতো। এ সময়ে সরকার যতটা জনমুখী হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে নানান এজেন্ডামুখী। সে কারণে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি চর্চিত হয়েছে, সেটি হলো-এ সরকার কি সহসা ক্ষমতা ছাড়বে? এ সরকার কি নির্বাচন দেবে? সেসব প্রশ্ন পেছনে ফেলে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চতুর্থ গণভোট। নানান কারণে দিনটি অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঐতিহাসিক। অনেক প্রতীক্ষা, ত্যাগ, রক্ত, কষ্ট এবং দীর্ঘশ্বাসের বিনিময়ে অর্জিত আজকের এই ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা। নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেশবাসীর একান্ত কামনা। ভোট গ্রহণ কার্যক্রমের পর যত দ্রুত সম্ভব ফলাফল ঘোষণা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। এর অন্যথা হলে আবারও নতুন কোনো প্রশ্নের জন্ম নেবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, বিদেশিরা কী চায় সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। দেশের জনগণ কীভাবে শান্তি পাবে, সেটাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সে কারণে ভোটের ফল প্রকাশে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব হলে অথবা ফল আটকে রেখে অন্য কোনো নতুন হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা হলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তখন মবের বিস্তার আরও সহিংস হতে পারে। দেশবাসী আর মব চায় না, শান্তি চায়। অনেক অশান্তির মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছর পার করতে হয়েছে। গত ১৮ মাসেও দেশে শান্তি আসেনি। তাই দেশ গঠনে নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক সরকারের কোনো বিকল্প নেই। জনগণের ভোটে যে বা যারা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবেন, সেই সরকারকে অগ্রিম অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। শুভ হোক তাদের নতুন পথের যাত্রা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে আজ নির্বাচন হচ্ছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। এবার ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ আর মহিলা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। দেশে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৭৯টি। বুথ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬ হাজার। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৭টি। নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং কর্মকর্তা। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ভোটার। বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পেপার। ব্যালট পেপার গ্রহণ করেছেন ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮ জন।
ইসি জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। তারা থাকবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৫০০, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য রয়েছেন। বিএনসিসির ১ হাজার ৯২২ জন ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকবেন। এ ছাড়া গত রবিবার থেকে মাঠে রয়েছেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। গত মঙ্গলবার থেকে ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক আগে থেকেই ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতায় সশস্ত্র বাহিনী মাঠে আছে। এর বাইরেও প্রতি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, প্রতি উপজেলায় ইউএনও, এসিল্যান্ডদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রয়েছে।
একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ নির্মোহ ও নিরপেক্ষ হতে হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যেকোনো মূল্যে জাতিকে সেই ‘ভালো’ নির্বাচন উপহার দিতে হবে। প্রায় ১৬ বছর দেশের মানুষের কোনো প্রকৃতপক্ষে ভোটাধিকার ছিল না। স্বৈরসরকার তিনটি প্রহসনের নির্বাচন করে নিয়েছে। সেই বঞ্চনা পুষিয়ে নিতে এবার ভোটাধিকার শতভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুটি ভোট এক দিনে হওয়ায় ভোট গণনায় বিলম্ব হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আগেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সে কারণে শেষ সময়ে সরকার কী করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সবার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, তা আগাম কেউই বলতে পারছে না। ইতোমধ্যে নানানরকম জরিপ প্রকাশিত হলেও জরিপগুলো ত্রুটিমুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। কিন্তু গণভোটের ফলাফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কে দেশবাসী ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়ে গেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকার ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও ‘হ্যাঁ’ অর্থাৎ পরিবর্তনের পক্ষে সম্মতি দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট আগে গণনা করে ফল ঘোষণার পর গণভোটের ব্যালট গণনা করলে নতুন বিতর্কের জন্ম হতো না। অবশ্য সরকারের কার্যক্রমে দেশবাসী বুঝতে পারছে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো দেশবাসীর জন্য আর গণভোট হলো অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তার জন্য। সরকারসংশ্লিষ্টরা হয়তো মনে করছেন, নিজেদের সেফ এক্সিট ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনোরকম ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে যা-ই ভাবা হোক না কেন, দেশের সচেতন জনগণ ইতোমধ্যে অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছে। জনগণের মধ্যে যারা অভিজ্ঞ, দূরদর্শী তারা আশঙ্কা করছেন, ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি কেন্দ্রের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা বিলম্বিত হলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। নির্বাচনের ফল ঘোষণা বিলম্বের কারণে সারা দেশে সহিংস ঘটনা বা মব পাড়ামহল্লায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। সুতরাং ফল ঘোষণা বিলম্বিত করে পর্দার অন্তরালে কিছু করার চেষ্টা করলে শেষ সময়ে সরকারের পরিণতি ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকেও তাদের পূর্বসূরিদের ভয়াবহ পরিণতি মনে রাখতে হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দেশবাসীর যতটা প্রত্যাশা ছিল, ১৮ মাস পর হিসাবের খাতায় হতাশাও ততটাই। এখন আবার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠছে দেশবাসী। অবশ্য আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের মানুষ সাগরের পাড়ে বালির বাঁধের মতো বারবার আশায় বুক বাঁধে, আর বারবার আশাহত হয়। তার পরও আমাদের নতুন নতুন স্বপ্ন দেখতে হয়। দেশের মানুষ চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর আশাহত হয়ে ছাব্বিশের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দেশপ্রেমিক সরকার কামনা করছে। নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে, সেটি হলো সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে নিয়ে পথ চলা। দেশের মধ্যে যেন আর কখনো রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সৃষ্টি না হয়। দ্বিতীয় কাজটি হলো, কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা। চুক্তিভিত্তিক সব কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রশাসন সাজাতে হবে। তৃতীয় কাজটি করতে হবে অর্থনীতিকে সুশৃঙ্খল করা। এর জন্য দেশি বিনিয়োগকারী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা। ব্যাংকিং খাতকে স্বচ্ছ করা। চতুর্থ কাজটি হলো বেকারত্ব দূর করার জন্য ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। পঞ্চম কাজটি হলো অন্তর্বর্তী সরকার যতগুলো আইন ও চুক্তি সম্পাদন করেছে, সব পুনর্মূল্যায়ন করা। সেই সঙ্গে নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করতে হবে। নির্বাচনি ইশতেহার শুধু ছেলেভুলানো কথামালা হয়ে থাকলে চলবে না।
১৯৭১ সালে যে শিশুটির জন্ম হয়েছে, তার বয়স এখন ৫৫। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৩ বছর। সে হিসেবে জীবনের সিংহভাগ অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রায় সবারই চুলে পাক ধরেছে। এই বয়সি মানুষ অনেকে দাদা-দাদি বা নানা-নানিও হয়েছেন। এর আগের জেনারেশন অর্থাৎ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জন্ম নেওয়া বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীও আমাদের মধ্যে আছেন। অনেকে দুনিয়া ছেড়ে চলেও গেছেন। কিন্তু বিভাজনের রাজনীতি, দোসর খোঁজার রাজনীতি, অনৈক্যের রাজনীতি থেকে আমরা মুক্তি পেলাম না। ভারতপ্রেম, পাকিস্তানপ্রেম, যুক্তরাষ্ট্রপ্রেম, চায়নাপ্রেম বাদ দিয়ে নিরেট বাংলাদেশপ্রেমী শতভাগ জনগোষ্ঠী আমাদের তৈরি হলো না। ইদানীং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ধর্মকে ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। দুনিয়া ও আখেরাত নিয়ে চিন্তা করে। এ সুযোগে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি কিছু ধর্মব্যবসায়ী টাউট-বাটপাড়ের আবির্ভাবও হয়েছে। কোটারিস্বার্থে শুধু রাজনীতিতে ব্যবহার না করে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের পবিত্র নীতি-আদর্শ অনুসরণ করলে অবশ্যই কল্যাণরাষ্ট্র গঠন সম্ভব। আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি জনমুখী সরকারের প্রতিষ্ঠা হলে একাত্তর ও চব্বিশে আমাদের সব শহীদের আত্মা শান্তি পাবে। যে দল জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। গণতন্ত্রের বিজয় হবে। আমরা আমারও হব বিজয়ী জাতি। অনেক দিন পর জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে, আরও একটি বিজয় অর্জিত হবে। জয় হোক দেশের সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার মানুষের।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন