জেন-জি বা জেনারেশন জেড, যাদের জন্ম মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। এ প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য সময়ের সাক্ষী হয়ে বেড়ে উঠেছে। এরা জন্মের পর থেকেই দেখেছে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল বিনোদন ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যবস্থা। আগের প্রজন্ম যেখানে প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে গ্রহণ করেছে, সেখানে জেন-জি প্রযুক্তির মাঝেই বেড়ে উঠেছে। ফলে তাদের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ জেন-জি ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং তাদের নাগরিক জীবনের প্রথম বড় দায়িত্ব পালনের মুহূর্ত। এ প্রজন্ম রাজনীতিকে দেখে ডিজিটাল পর্দার ভিতর দিয়ে, ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব বিতর্ক, অনলাইন সংবাদ, টিকটক ভিডিও কিংবা লাইভ স্ট্রিমের মাধ্যমে। তারা রাজনীতিবিদদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে, প্রশ্ন তোলে এবং তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। ফলে তাদের কাছে নির্বাচন মানে কেবল দলীয় প্রতীক নয়, নির্বাচন মানে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি। জেন-জি জানে, ভোট কেবল অধিকার নয়, এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে অংশ নিতে পারে। তাই তাদের প্রথম নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ যেমন প্রবল, তেমনি দায়িত্ববোধও তুলনামূলকভাবে গভীর।
জেন-জির বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ই-স্পোর্টস, ভার্চুয়াল গেমিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব সব মিলিয়ে তাদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ প্রজন্ম বৈশ্বিক চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত, তারা শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের খবরও নিয়মিত অনুসরণ করে। ফলে তারা প্রশ্ন করে কেন শিক্ষাব্যবস্থা আরও আধুনিক হবে না, কেন কর্মসংস্থান প্রযুক্তিনির্ভর হবে না, কেন দক্ষতার মূল্যায়ন হবে না, কেন দুর্নীতি থাকবে, কেন তরুণদের মতামত উপেক্ষিত হবে। জেন-জি দ্রুত তথ্য গ্রহণ করে এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা চায় মেধাভিত্তিক সমাজ, উদ্ভাবনী অর্থনীতি, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তাদের কাছে খেলাধুলা মানে শুধু মাঠে খেলা নয়, এটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও পেশাগত সম্ভাবনার জায়গা। যোগাযোগ মানে কেবল মুখোমুখি কথা নয়, এটি ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক, গ্লোবাল কমিউনিটি এবং তাৎক্ষণিক সংযোগ। এ প্রেক্ষাপটে জেন-জি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, যা তাদের ডিজিটাল জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। প্রথম নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় তারা তাই খোঁজে এমন নেতৃত্ব, যারা প্রযুক্তিকে ভয় পায় না, বরং প্রযুক্তিকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে জানে।
নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রতি জেন-জির প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক। তারা চায় একটি ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশ, যেখানে শিক্ষা হবে দক্ষতাভিত্তিক, কর্মসংস্থান হবে বহুমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর, রাষ্ট্র পরিচালনা হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। জেন-জি বিশ্বাস করে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত অটোমেটেড বাংলাদেশ, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। তারা চায় ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে দুর্নীতি করুক, সরকারি সেবা হোক সহজ ও দ্রুত, এবং নাগরিক হয়রানি দূর হোক। পাশাপাশি তারা পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়েও সচেতন। এ প্রজন্ম মুখস্থবিদ্যার রাজনীতি চায় না, তারা চায় ডেটা, পরিকল্পনা ও ফলাফলভিত্তিক রাজনীতি। নতুন সরকার যদি তরুণদের উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করে, স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তোলে, ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট কাজের সুযোগ বাড়ায়, তবে জেন-জি নিজেদের দেশেই ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে। তারা আর শুধু চাকরিপ্রার্থী হতে চায় না, তারা হতে চায় চাকরিদাতা, উদ্ভাবক ও বিশ্বমানের নাগরিক। এ প্রত্যাশাগুলো পূরণ করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ও বড় সুযোগ।
জেন-জির প্রথম নির্বাচন আসলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ প্রজন্ম যদি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়, সচেতনভাবে ভোট দেয় এবং নির্বাচনের পরও নাগরিক দায়িত্ব পালন করে, তবে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। জেন-জি প্রশ্ন করতে জানে, প্রতিবাদ করতে জানে এবং প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায় করতেও প্রস্তুত। তারা আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, গুজবের চেয়ে যাচাইকৃত তথ্যকে প্রাধান্য দিতে শিখছে। তাই তাদের অংশগ্রহণ নির্বাচন আরও অর্থবহ করতে পারে। তবে এ প্রজন্মকে উপেক্ষা করলে বা শুধু ভোটের সময় গুরুত্ব দিলে তাদের মধ্যে হতাশা জন্মাতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই জেন-জির আশা-আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে যুক্ত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথম নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জেন-জির রাজনৈতিক মানসিকতা গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। যদি তারা দেখে যে ভোটের মাধ্যমে সত্যিই পরিবর্তন আসে, তবে তারা গণতন্ত্রে আস্থা রাখবে। আর সেই আস্থা থেকেই গড়ে উঠবে একটি দায়িত্বশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ, যেটি জেন-জির স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং তাদের প্রথম নির্বাচনের মূল প্রেরণা।
লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক
আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়