জাতি এখন নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায়।
কারণ দেশে বিনিয়োগের খরা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করে পতিত সরকার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করলেও দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক গতি সঞ্চার করতে পারেনি। উপরন্তু রেমিট্যান্সের অর্থ লোপাট এবং জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। অন্তর্র্বর্তী সরকার সে অবস্থার উত্তরণে নানামুখী সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বড় বিনিয়োগের সঙ্গে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রূপান্তর ও হস্তান্তরের নিশ্চয়তা থাকতে হয়। শুধু জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের পক্ষেই দেশে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশ একটি বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনের পথে হাঁটছে। এই নির্বাচনের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। বিশেষত কর্মসংস্থান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে একটি নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো অনিশ্চয়তা বা অনির্বাচিত সরকারের অধীনে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। এমন বাস্তবতায় যেনতেন প্রকারের একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে হলে প্রধান রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের সুস্পষ্ট কর্মপন্থা, সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও নীতিমালা থাকতে হবে।
আগামী দিনের অর্থনৈতিক উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচনোত্তর সরকারকে কার্যকর দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপিসহ আগামী সরকারের সম্ভাব্য অংশীদারদের এ বিষয়ে হোমওয়ার্ক বা প্রস্তুতিসহ যথাযোগ্য কর্মপন্থা ও কর্মসূচি হাজির করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারেও এ বিষয়ে যথাযথ রূপরেখা থাকতে হবে। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতি একটি ক্রান্তিকালীন অবস্থা অতিক্রম করছে। দেশিবিদেশি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব অবস্থা ফিরিয়ে আনাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় সমাজে নানামুখী সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও বাজার মূলধনের নিম্নগামিতা যে সংকটের জন্ম দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সরকারি নীতিমালার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে দেড় যুগের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও হতাশা কাটিয়ে নতুন আলোতে পা ফেলার সন্ধিক্ষণ। এর মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় চলে এসেছে। তবে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অনেকেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ভোটার উপস্থিত করতে পারাটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। গণ অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশে অন্তত ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ৪৫ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও অধিকার সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এইচআরএসএস জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬২টি নির্বাচনি সহিংসতায় ৯৭০ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে হামলা ও হেনস্তার ঘটনাও বেড়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ১২টি ঘটনায় ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার এবং ৬ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গত এক বছরে কারাগারে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাকি ১০১ জন অসুস্থতায় মারা গেছেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি বিধায় ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল ও যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। গণ অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, অবাধ ও উৎসবমুখর। নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ জরুরি।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য