বিশ্ব মোড়ল হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনে জায়নবাদী শক্তি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বলয়ে রূপান্তর করার যে ভূরাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ইরান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ভাষ্য ব্যবহার করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নির্মাণ করেছে, সেখানে ইরানকে ক্রমাগতভাবে একটি ‘হুমকি-রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত ও উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের নীতি এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক আদর্শ অনুসারে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নির্ধারণ তার নিজস্ব অধিকার। ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা, প্রক্সি সংঘাত উসকে দেওয়া, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং সরাসরি সামরিক হুমকি এসবই বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়। বরং সবকিছুই এক ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত আধিপত্যবাদী কৌশলের অংশ। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হুমকি নির্মাণ’ (থ্রেট কনস্ট্রাকশন) বলা যায়, যেখানে একটি রাষ্ট্রকে ধারাবাহিকভাবে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করা হয়। এর ফলে সে রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার যৌক্তিক এবং নৈতিক বৈধতা তৈরি করা যায়।
ইরানের ওপর পারমাণবিক শক্তি অর্জনের অজুহাতে চাপ প্রয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের নীতি থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই দ্বৈত মানদণ্ডের শিকার। একদিকে কিছু রাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, অন্যদিকে অন্য রাষ্ট্রের একই আকাক্সক্ষা ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা’ এবং ‘বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা’র জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাস্তবতায় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের ওপর ইসরায়েল তার একক সামরিক ও কৌশলগত প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তির রাজনীতি (পাওয়ার পলিটিকস) তত্ত্ব অনুসারে, আধিপত্যবাদী শক্তি কখনোই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান মেনে নিতে চায় না; বরং প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও বিচ্ছিন্নকরণের মাধ্যমে তাকে দুর্বল করে রাখার চেষ্টা কিংবা তার সক্ষমতা অর্জনের সব প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনাশের চেষ্টা করে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের নীতিগুলো কৌশলগত ভাষ্যে রূপান্তরিত হয় আর ন্যায়ের দাবি পরিণত হয় শক্তির প্রয়োগের নৈতিকীকরণে। এখানেই উন্মোচিত হয় আধিপত্যবাদের প্রকৃত রূপ, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আঞ্চলিক সংকটকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় রূপান্তরিত করার ঝুঁকি বহন করে।
উদ্বেগের বিষয়, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই নীতিই যদি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার অঘোষিত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে তার সভ্যতার ধারক ও বাহক হওয়ার নৈতিক দাবি অনিবার্যভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শক্তির একচ্ছত্র প্রয়োগ কখনোই সভ্যতার সূচক হতে পারে না; বরং তা প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার আধুনিক সংস্করণ। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোমান সাম্রাজ্য থেকে ঔপনিবেশিক ইউরোপ যে শক্তিই ‘সভ্যতা বিস্তার’-এর নামে অগ্রসর হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তার মুখোশের আড়ালে ক্ষমতা দখল ও সম্পদ লুণ্ঠনের প্রকল্পই প্রধান হয়ে উঠেছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে ‘রিয়ালিজম’ শক্তির ভারসাম্য ও স্বার্থকে রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে নীতি-নৈতিকতা নয়, বরং ক্ষমতার সংরক্ষণই মুখ্য। কিন্তু একই সঙ্গে ‘লিবারালিজম’ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন ও পারস্পরিক নির্ভরতার গুরুত্ব তুলে ধরে; আর ‘কনস্ট্রাকটিভিজম’ দেখায়, রাষ্ট্রের আচরণ কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং ধারণা, পরিচয় ও মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত হয়। এ তাত্ত্বিক বহুত্ব আমাদের শেখায় যে বিশ্ব রাজনীতি কেবল শক্তির খেলা নয়; এতে নৈতিকতা, বৈধতা ও বৈশ্বিক সম্মতিরও বিশেষ ভূমিকা আছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে শক্তির রাজনীতিই যেন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে, আর নীতি ও নৈতিকতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কূটনৈতিক ভাষণ, প্রেস ব্রিফিং ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অলংকারে। বাস্তবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যেন এক ‘মগের মুল্লুক’।
মার্কসবাদী ইতালীয় চিন্তক, ভাষাতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, শাসক শক্তি কেবল বলপ্রয়োগে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে আধিপত্য বজায় রাখে। পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমসহ বৈশ্বিক মিডিয়াব্যবস্থার একটি বড় অংশ সেই সম্মতি নির্মাণের কারিগর হিসেবে কাজ করে বলে সমালোচকরা মনে করেন। নির্দিষ্ট ঘটনাকে বিশেষ ভাষ্য ও কাঠামোয় উপস্থাপন, কোন তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে আর কোনটি আড়ালে থাকবে এসব কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমেই জনমত গঠনের প্রক্রিয়ায় নানাভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে একটি পূর্বনির্ধারিত নৈতিক অবস্থান তৈরি হয়, যা শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যকে ন্যায়সংগত বলে প্রতীয়মান করে। এ বাস্তবতায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর নৈতিক সংকটে উপনীত হয়েছে। যদি আইন ও মূল্যবোধ কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য হয় আর শক্তিধরদের জন্য ব্যতিক্রম তৈরি হয়, তবে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা আসলে অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড শক্তির প্রদর্শনে নয়, বরং ন্যায়ের প্রতি সমান আনুগত্যে প্রতিফলিত হয়, এ সত্য উপেক্ষিত হলে বিশ্বরাজনীতি আবারও আগ্রাসন ও প্রতিশোধের দুষ্টচক্রে আবর্তিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও সমর প্রযুক্তিতে যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথে এগিয়েছে, তা নিছক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; বরং চলমান বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রাজনৈতিক বার্তা যে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনই আধিপত্য মোকাবিলার কৌশল। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কোনো রাষ্ট্র যদি নিজস্ব মানবসম্পদ, গবেষণা অবকাঠামো ও কৌশলগত প্রযুক্তি উন্নয়নে সাফল্য দেখায়, তবে তা বিদ্যমান আধিপত্যবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে একধরনের বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্ভরতা তত্ত্ব (ডিপেন্ডেন্সি থিওরি) বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকবে। সেই নির্ভরতার শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী শক্তির অস্বস্তির কারণ হয়। পশ্চিমা শক্তিগুলোর উদ্বেগের পেছনে কেবল সামরিক হিসাব নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত। একটি রাষ্ট্র যখন নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তখন তা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে অর্থাৎ তার নীতিনির্ধারণে বাইরের চাপ কম কার্যকর হয়। ফলে প্রচার-প্রোপাগান্ডা, অর্থনৈতিক অবরোধ, আর্থিক লেনদেনে প্রতিবন্ধকতা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার দীর্ঘ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ‘জোরপূর্বক প্ররোচনা’র (কোরোসিভ পারসুয়েশান) চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত আচরণে বাধ্য করার কৌশল।
কিন্তু এসব পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ফল না দিলে কৌশল আরও আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে। সমালোচকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ জোটের অংশীদাররা এখন ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে অস্থিতিশীল বা ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাব্য পথ খুঁজছে, যাতে রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা (রেজিম চেঞ্জ) প্রায়ই আঞ্চলিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যার মূল্য পরিশোধ করতে হয় দেশটির সাধারণ জনগণকে। ফলে প্রশ্নটি কেবল ইরানের অগ্রগতির জন্য নয়; বরং একটি রাষ্ট্রের আত্মনির্ভরতার অধিকারকে আন্তর্জাতিক-ব্যবস্থায় কতটা স্বীকৃতি দেওয়া হবে, সেটিও এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। যদি আত্মনির্ভরতা ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনকেই ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ন্যায়সংগত চরিত্র নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে এবং আধিপত্যবাদ বনাম সার্বভৌমত্বের সংঘাতকে আরও প্রকট করে তোলে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পুতুল সরকারকে কবজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-বলয় সেখানে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এটা কোনো নতুন অভিযোগ নয়; পুরোনো ভূরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে কৌশলগত ঘাঁটি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার নামে যে সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি এ অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক জায়গায়ই গড়ে তোলা হয়েছে, তা অনেক বিশ্লেষকের চোখে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নয়, বরং আধিপত্যের অবকাঠামো। এ প্রেক্ষাপটে ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানে শাসক বদলানোর ‘রেজিম চেঞ্জ’ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচিত। এসব দেশে সামরিক শক্তির জোরে শাসক পরিবর্তন করা হলেও টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জঙ্গিবাদ ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিস্তার লাভ করেছে। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, সামাজিক ব্যবস্থায় আস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি
ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য