‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি যেন প্রকৃতির এক বহুবর্ণ কাব্য। সমুদ্রের প্রাসঙ্গিক গর্জন, অরণ্যের নীরবতা, পাহাড়ের স্থিরতা, নদীর প্রবাহ এবং মানুষের জীবনযাপন এবং জীবন-উদ্যাপনের জীবন্ত সংস্কৃতি মিলিয়ে এক অনন্য পর্যটন সম্ভার। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় ভূখন্ড এখনো বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে দৃশ্যমান হতে পারেনি-এটাই বাস্তবতা। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি এবং প্রতি ১০ জনে একজনের কর্মসংস্থান এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো-বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কা-পরিকল্পিত বিনিয়োগ, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাতে পরিণত করেছে।
সেই প্রেক্ষাপটে, সম্ভাবনার দিক থেকে ‘সকল দেশের রানি’ হয়েও বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে থাকা এক প্রজা। সম্ভাবনা ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মেধাহীন পরিকল্পনা আর বেলুন-ফিতে মোড়ানো আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের কারণে পর্যটনশিল্প অশিল্পে পরিণত হয়েছে। সম্ভাবনার পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশনে লেটারসহ ফেল।
বাংলাদেশে পর্যটন খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অন্যতম। আন্তর্জাতিক মানের যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা-এই মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অনেক পর্যটনকেন্দ্রে নিশ্চিত হয়নি। বিমানবন্দরসেবা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ এবং পর্যটন স্পটগুলোর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অভিজ্ঞতা নয়, বরং লস প্রজেক্টের এক ফ্লপ সিনেমার গল্প হয়ে দাঁড়ায়।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এই শিল্পের বুকে চাপা এক ভারী পাথর। নীতি প্রণয়ন আর বাস্তবায়নের মাঝে এমন দূরত্ব, যেন কাগজে দেশ এগোয়-মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘসূত্রতা আর সমন্বয়হীনতা উন্নয়নকে এগোয় না, বরং আটকে রাখে।
প্রকল্প নেওয়া হয়, ‘ঘোষণার ফাঁপড়’-কিন্তু বাস্তবায়নে গতি নেই, জবাবদিহি নেই।
এর সঙ্গে যখন দুর্নীতি যোগ হয়, তখন উন্নয়ন ব্যয় ফুলে ওঠে তেলপিঠার মতো, আর সেবার মান শুকিয়ে শক্ত চাপড়িতে পরিণত হয়। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানের সেবার অভাব এই শিল্পের আরেকটি স্পষ্ট দুর্বলতা। পর্যটকরা শুধু সৌন্দর্য দেখতে আসে না-তারা খোঁজে নিরাপত্তা, সহজতা ও পেশাদারি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তারা পায় অনিশ্চয়তা, ভোগান্তি আর অপেশাদার আচরণ। যেখানে আস্থা তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে প্রশ্ন তৈরি হয়-আর যেখানে মান নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে এখনো ‘প্রস্তুতির’ কথাই বলা হচ্ছে। তবে সম্ভাবনার দিকটি অত্যন্ত শক্তিশালী-এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্য ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি সৌন্দর্য, সিলেটের বিস্তীর্ণ চা-বাগান, হাওড়-বাঁওড়ের জলজ জীবন, আর মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতির মতো ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন-সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক বিরল সমন্বয়। এর সঙ্গে রয়েছে সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় উৎসব, আতিথেয়তাপূর্ণ মানুষ এবং স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি-যা একজন পর্যটকের জন্য অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর ও স্মরণীয় করে তুলতে পারে। নদীমাতৃক এই দেশের নৌ-পর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন, এমনকি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটনেরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানও বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে ওঠার বাস্তব সুযোগ রাখে। এক সমুদ্র রক্তের দাম দিয়ে কেনা এই বাংলাদেশ শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়-এটি পূর্ণাঙ্গ, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার দেশ। স্পষ্ট করে বললে, একটি প্রকৃত ‘সঁষঃর-ফরসবহংরড়হধষ ঃড়ঁৎরংস ফবংঃরহধঃরড়হ’ হয়ে ওঠার সব উপাদান আমাদের আছে-শুধু সঠিক ব্যবহারের অভাব। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-এই সম্ভাবনায় আমরা কতটা মূল্য সংযোজন করতে পেরেছি?
এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু পরিকল্পনা নয়, পরিকল্পনার ভাষা বদলাতে হবে। প্রথমেই অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিমানবন্দর হবে গেটওয়ে, সড়ক হবে সংযোগ, আর পর্যটন স্পট হবে অভিজ্ঞতার কেন্দ্র। উন্নয়ন যেন কাগজে নয়, মাটিতে দৃশ্যমান হয়-এই নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদ-যাকে আরও প্রাসঙ্গিকভাবে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বলা যায়-এই খাতের প্রকৃত চালিকাশক্তি। প্রশিক্ষিত, বহুভাষিক ও পেশাদার গাইড এবং সেবা প্রদানকারী তৈরি ছাড়া পর্যটন কখনই আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছবে না। আতিথেয়তা হতে হবে দক্ষতার-দক্ষতাশূন্য, রেডিমেড সৌজন্যের নয়। তাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, কনটেন্ট মার্কেটিং এবং ডিজিটাল উপস্থিতি-এই তিনকে একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করতে হবে। ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ সেøাগান নয়-একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ডে পরিণত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (চচচ) এই খাতে গতি আনতে পারে, যদি তা প্রকৃত অংশীদারি হয়-শুধু ফাইলের নয়, মাঠের। একই সঙ্গে টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন নয়, প্রকৃতি বাঁচিয়েই পর্যটন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত না করলে এই শিল্প টেকসই হবে না; বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
পর্যটন শুধু অর্থনীতির খাত নয়-এটি একটি দেশের মুখ, একটি জাতির পরিচয়, একটি রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার। এখানে ব্যর্থতা মানে শুধু আয় কমা নয়-এটি ভাবমূর্তির ক্ষয়। পর্যটন মানে বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বলভাবে পোর্ট্রেই করা-ইমেজের মানচিত্রকে এক্সট্রা-ওয়াইড ফ্রেমে লক করা। বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনা আর বাস্তবতার ফাঁকে আটকে থাকা এক বাস্তবতা। একদিকে সম্ভাবনার দীপ্তি, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার অন্ধকার-এই বৈপরীত্যই আমাদের পর্যটন খাতের প্রকৃত চিত্র। সম্ভাবনাকে আর গল্পে রেখে দেওয়ার সময় নেই-এখনই তাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার সময়। নতুন সরকার, নতুন মন্ত্রী-প্রত্যাশাও নতুন।
কথার নয়-এবার কাজের সময়।
♦ লেখক : পর্যটক