বাজার, সভা-সমাবেশ বা পরিবহনে থাকাকালে যা দেখবে, যা শুনবে তা নিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা করার ওপর জোর দিতেন আমার কর্মগুরু আব্দুল আওয়াল খান। বলতেন, দেখবে আর দেখবে। শুনবে আর শুনবে। তবেই তো দুনিয়াকে আর নিজেকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে।
গুরুবাক্য শিরোধার্য করে আছি। সেজন্যই দিন-সাতেক আগে প্রাক-ইফতারি সময়ে মেট্রোরেল স্টেশনের সিঁড়ির কাছে মানুষের জটলার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। দেখি, বিশ কি বাইশ বছরের এক যুবক কান ধরে উঠছে আর বসছে। তিন যুবক ওর সাজা কার্যকর করছে। কেন সাজা?
ঘটনার দুদিন আগে টিসিবির মাল কেনার জন্য ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড়ানো সত্তর বছর বয়সি ব্যক্তি ‘শরীর খারাপ। দাঁড়াতে পারছি না। মাথা ঘুরছে। আমাকে সবার আগে নিতে দাও।’ বললে তাঁর সামনে থাকা পাঁচজনের মধ্যে চারজনই জায়গা ছেড়ে দেয়। আপত্তি জানায় কানধরা ওই যুবক। সে শুধু আপত্তিই জানায়নি, বৃদ্ধ ব্যক্তিকে ধাক্কা মেরে ফেলেও দেয়। লাইনে দাঁড়ানো অন্যদের তাড়া খেয়ে সে পালাতে বাধ্য হয়।
ওই লাইনে দাঁড়ানো প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ‘সেই বেয়াদপ পোলা’কে আজ হাতের কাছে পেয়ে ইনসাফের বন্দোবস্ত করেছে। বিচারে দেড় শবার কান ধরে ওঠবসের রায় হয়েছে। আমি যখন দেখছিলাম ততক্ষণে আটষট্টিবার ওঠবস করা হয়ে গেছে। জটলার মধ্যে যাঁরা একটু বয়স্ক, তাঁদের বলাবলিতে জানা গেল, শিগগিরই কেয়ামত হবে। কেয়ামত দ্রুত এগিয়ে আসার যেসব আলামত পাওয়া যায় তার অন্যতম হলো, নাক টিপলে দুধ বেরোয় বয়সি ছোকরার হাতে তার দাদার বয়সি দুর্বলদেহী ব্যক্তির হেনস্তা হওয়া।
কৈশোরে গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শুনেছি, ‘শোন যত মুসলমানো/করি আমি নিবেদনো/এ দুনিয়া ফানা হবে/কিছুই রবে না’। রোজ কেয়ামতে সব সৃষ্টির বিনাশ ঘটবে। তারপর মৃত ব্যক্তিদের সবাইকে কবর থেকে তুলে বিচার করা হবে। কেউ যাবে দোজখে কেউ যাবে জান্নাতে। আমাদের এলাকার মাওলানা বেলায়েত হোসেন জাহেদী, যাকে গুণমুগ্ধরা বলতেন ‘জাহেদী হুজুর’ মিলাদ মাহফিলে তাঁর ভাষণে বলতেন, ‘দুনিয়ার সুখ কয়দিন রে ভাই? হায়াত এক্কেরে বেশি যদি হয় আশি বা পঁচাশি বছর। তারপরে তো শরীর ছাইড়া টুক্্কুর কইয়া চইলা যাবে রুহ্্। তয় কেন আমরা য়্যাত্তো করতেছি খাই খাই?’
খাই খাই হাহাকার সব জমানায় থাকে। জাহেদী হুজুর জানান, বিংশ শতাব্দীতে খাই খাই হয়ে গেছে সর্বগ্রাসী। তাঁর মতে, কেয়ামত যখন খুব ঘনিয়ে আসে তখনই মানুষের লোভলালসা বিষয়সম্পত্তি ভোগের নেশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি চমৎকার সুর করে বলতেন, ‘অতিলোভী ভাইগো আমার, অতিলোভী বইনগো আমার, সময় থাকতে আইসা পড়েন জান্নাতের পথে। যদি না আসেন তাইলে কেয়ামতের আগুনে পুড়তে
পুড়তে কী যে যন্ত্রণায়...।’
২. কেয়ামতের দিন সৃষ্টির সেরা মানুষ যেসব ভয়ংকর অবস্থার মুখোমুখি হবে তার বিশদ বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন শীতকালীন এক ওয়াজ মাহফিলে। শ্রোতারা তন্ময় হয়ে শুনেছিলেন। আর মাঝেমধ্যে ‘আল্লাহু আকবর’ আওয়াজ দিচ্ছেলেন। জাহেদী হুজুর জানান, কেয়ামতের সময় মাথার এক হাত ওপরে চলে আসবে সূর্য। সেদিন সূর্যতাপে মাথার খুলি ফেটে যাবে, বেরিয়ে আসা মগজ গড়িয়ে পড়বে মাটিতে। আবার সেই মগজ খুলিতে ঢুকিয়ে দিয়ে মাথার স্বাভাবিক আকৃতি দেওয়া হবে। প্রচণ্ড গরমে আবার খুলি ফাটবে। বারংবার ফেটে যাওয়া আর স্বাভাবিক আকার হওয়া চলতে থাকবে।
শিউরে উঠেছিলাম আমি আর আমার তিন বন্ধু মিন্টু, হারুন আর ফারুক। মাথার বিপদ এতটা কঠিন হতেই হবে? হওয়ার যুক্তি অবশ্য আছে। যত রকম ভ্রষ্টাচার, অনাচার, অত্যাচার, সেগুলোর বুদ্ধি তো মাথা থেকেই আসে। আবার এটাও তো সত্য যে শোভন সুন্দর কল্যাণকর কাজের ইপ্সাও তৈরি হয় মাথায়। কাজেই ভালো মাথাগুলো আগুনসম সূর্যতাপের কোপ থেকে রক্ষা পাওয়াটা ইতিবাচকই হবে। কিন্তু সে বিষয়ে জাহেদী হুজুর খোলাসা করে কিছু বললেন না। কেন বললেন না, তাঁকে যে প্রশ্ন করব সে উপায়ও নেই। হুজুর ইন্তেকাল করেছেন ১৯৮৯ সালে।
বেঁচে থাকলে জাহেদী হুজুরকে আরও একটা প্রশ্ন করতাম। কেয়ামতের দিন মানুষের মাথার এক হাত ওপরে সূর্যের অবস্থান বলবৎ করার পদ্ধতিটা কী? আমার সহকর্মী শামসুল হক রাসেল দৈর্ঘ্যে ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। তিনি আমার চেয়ে প্রায় ৯ ইঞ্চি বেশি লম্বা। এমতাবস্থায় কোনো বস্তু দুই জনেরই মাথার এক হাত ওপরে বসে কীভাবে কর্তব্য পালন করবে?
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যে রীতি অবলম্বন করতেন বেলায়েত হোসেন জাহেদী তাতে ধারণা করা যায়, হুজুর ফিক করে হেসে দাঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কীভাবে কোন কাজটা করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার হিম্মত আমাদের মতো গুনাহগারদের না থাকাই উচিত গো আমার আব্বাজানেরা। পুত্র বয়সিদের ‘আব্বা’ সম্বোধনের জন্য সুখ্যাত এই ধর্মপণ্ডিত বলতেন, মানুষ হাবিয়া দোজখের ভয়ে ভালো কাজ করবে আর জান্নাতুল ফেরদৌসের লোভে কুকাজ থেকে বিরত থাকবে, এটা কোনো নীতি হতে পারে না। মানুষ শুধু ভালো কাজই করবে। কারণ সে মানুষ। কারণ সে পশু নয়।
বন্ধু হারুন জানতে চেয়েছিল, কেয়ামত হবে কখন? জাহেদী হুজুর বলেন, কেয়ামত মানে পাপ-পুণ্যের বিচার শেষে আল্লাহ কী রায় দেন তা জানবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা। ওভাবে দাঁড়াবার জন্য তাঁর নির্দেশে ফেরেশতা ইস্রাফিল তাঁর সিঙ্গায় (বাঁশি) ফুঁ দেবেন। সেই বাঁশি কখন বেজে উঠবে, তা বলার সাধ্য কি মানুষের আছে?
৩. বাঁশি কখন বাজবে সেটা গভীর গোপন করে রেখেছেন সর্বস্রষ্টা প্রভু। অনুমান গবেষণা তবু চলছেই। ষষ্ঠদশ শতকের ফরাসি জ্যোতিষী নস্ত্রাদামাস তাঁর মৃত্যুর বহু আগে বলেছেন, দুনিয়া ফানা হয়ে যাবে ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে। সে বছর বিভিন্ন দেশের মানুষ কৌতূহল-আতঙ্ক নিয়ে দিনাতিপাত করতে করতে দেখল, জুলাই গিয়ে আগস্ট এসেছে। না, দুনিয়া আছে দুনিয়াতেই।
মনে আছে, সে বছর ১২ জুলাই সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। আমাদের সামনের-পেছনের টেবিলগুলোয় কেয়ামতবিষয়ক সংলাপ বিনিময় চলছে। পেছনের টেবিলের খাদ্য গ্রাহকদের কেউ একজন বলেন: নস্ত্রাদামাস ছিল নামজাদা ডাক্তার। ব্যাডা তুই কইবি রোগী নিয়া কথা, মাগার কইয়া দিলি দুনিয়ার এন্তেকালের কথা। যার যেইটা কাম না, সে সেইটা নিয়া মাথা ঘামাইলে ঝামেলা তো লাগবই। দিলি তো তুই বাঙালিরে পাগল কইরা।
‘শুধু বাঙালি না। দুনিয়ার সবখানেই নস্ত্রাদামাসের ঢোল বেজেছে তাক-দুমা-দুম-দুম।’ বলেন আলতাফ। পেছনের টেবিলের চিন্তক বলেন, ‘দারুণ কয়েছেন ভাইসাব। কেয়ামতের ডরে সবখানেই পাবলিকের গায়ে কমবেশি কম্পজ্বর উঠেছে। হুদাহুদি আমরা বাঙালিরে গাইলাইতেছি।’
দুনিয়া একদিন ফানা হয়ে যাবে, এটা হিন্দু বিশ্বাসেও আছে। তবে তাদের বিশ্বাস প্রকরণ একটু আলাদা। তারা মনে করে প্রলয় মানে বিশ্ববিনাশ শুরু হবে সাগর থেকে। মেঘে মেঘে ছেয়ে যাবে আকাশ, সাগর উগরে দেবে বাষ্প আর আগুন, যা গ্রাস করবে পৃথিবীকে। পানিতে তলিয়ে যাবে পৃথিবী, সব সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর জন্ম নেবে নয়া জীবন। সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ চক্র চলতে থাকবে বারবার।
কেয়ামতের পরোয়া না করা বেশ কিছু লোক ‘এই দুুনিয়া মিছারে দোস্ত/পরের দুনিয়া খাঁটি’ ভঙ্গি দিয়ে মানুষকে ঘোল খাইয়েছে দেখেছি। পাকিস্তানি জমানার শেষ প্রান্তে একবার গুজব ছড়ানো হয়; অমুক শুক্রবারে ফানা হবে দুনিয়া। লিফলেট বের করা হয়-‘হারাম রোজগারের সম্পদ দান করে দাও ভালো কাজে/আল্লাহ তোমায় সাজাবে বেহেশতি সাজে।’ বেহেশতি সাজে সাজতে চায় না, এমন কজন আছেন ধরাধামে?
মজিরউল্লাহ নামক এক হারামখোর আবগারি অফিসার লিফলেট পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার গ্রামের মসজিদকে ত্রিশ হাজার টাকা দেয়। কথিত শুক্রবার পার হয়ে যাওয়ার পর মসজিদ কমিটি হারামির দান প্রত্যাখ্যান করে। রটনা আছে, মজিরউল্লাহ পরে সেই টাকা পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘কেয়ামত হয় নাই কী হইছে! অন্তত এই নোটগুলোর কেয়ামত হয়া যাক।’
৪. তুরস্কের বিখ্যাত রসিক নাসিরুদ্দিন হোজ্জার জীবদ্দশায়ও ‘কেয়ামত অত্যাসন্ন’ আওয়াজ উঠেছিল। সেই সুযোগে তাঁর বন্ধুরা তাঁর ছাগল খাসির মাংস সহযোগে খানাপিনার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তাঁরা বললেন, ‘দোস্ত কদিন পরেই তো কেয়ামত। এসো, দুনিয়াবি সব মায়া বর্জন কর। প্রথমেই তোমার খাসির মোহ ত্যাগ করা ভালো। ওকে জবাই করে আমাদের খাওয়াও।’
‘খাওয়াও। খাওয়াও’ শুনে শুনে বিরক্ত হোজ্জা তাঁর লোভী বন্ধুদের বলেন, ‘ঠিক আছে জীবনের শেষ ভোজন উৎসবে তোমরা আমার বাড়িতে খাসির গোশত খাবে। ধোপদুরস্ত চকমকে পোশাকে সেজে আমরা উৎসবে অংশ নেব। আর তো এমন সুযোগ পাওয়া যাবে না।’
রাতে মেহমানদের ভরপেট খাওয়ানো হলো। স্বাদু খাসির গোশত দিয়ে পোলাউ খেয়ে সবাই তৃপ্ত। ফুর্তি আমোদে মধ্যরাত পর্যন্ত সবাই মেতে থাকল। ক্লান্ত চোখে ঘুম নামছিল। হোজ্জার বন্ধুরা বিলাসী পোশাক বদলে ঘুমের পোশাক পরে মেঝেতে শুয়ে পড়েন। এ সময় হোজ্জা এসে বন্ধুদের দামি পোশাকগুলো ঘরের বাইরে আঙিনায় এনে জড়ো করলেন। তারপর দিলেন আগুন।
পরদিন ঘুম ভাঙলে বন্ধুরা তাঁদের দামি পোশাকগুলো খুঁজতে থাকেন। কাপড়গুলো কোথায় গেল? হোজ্জা বলেন, ‘ওগুলো চুরি হয়নি। আগুনে পুড়িয়ে ওগুলো ছাই করে দিয়েছি।’ বন্ধুদের প্রশ্ন, কেন? হোজ্জা বলেন, ভোজনের কারণে আনন্দের সমবণ্টন করেছি আমরা। আনন্দ বাবদ আমার যে লোকসান হয় তারও সমবণ্টন করে দিলাম।
‘কেয়ামত অত্যাসন্ন, তাই ছাগলটারে নাই করে দিয়েছি’ বলেন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, ‘কেয়ামত খুবই কাছে, এখন দামি পোশাক রেখে দিয়ে কী লাভ! আমার যে উপকার তোমরা করলে, তার কি কোনো মূল্য নেই আমার কাছে?’
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন