জনপ্রত্যাশার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। এটি গত ৫৫ বছরের মধ্যে ব্যতিক্রমী সংসদ হতে চলছে। এই সংসদে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন এক-এগারোর ঝাঁঝরা হওয়া, গুম থেকে মুক্তি পাওয়া এবং ফাঁসির রশি থেকে বেঁচে যাওয়া পোড় খাওয়া অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বরা। ফ্যাসিবাদের অনলে দগ্ধ হয়েও যাঁরা বেঁচে রয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতায় সিক্ত হবে এবারের সংসদ অধিবেশন। প্রাণবন্ত হওয়ার কথা ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতন্ত্রের জয়যাত্রায়। এটি বোধ করি একটি বিরল ঘটনা। যদিও সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তৃতা করবেন রাষ্ট্রপতি-যিনি সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের দিনগুলোর ধারাবাহিকতা। সে যা-ই হোক জাতি গভীর আগ্রহভরে অপেক্ষা করছে এই অধিবেশনের জন্য। কী হয় কোন দিকে যায় তা পর্যবেক্ষণের জন্য। কেন এই অপেক্ষা, সেটিই মূল বিষয়। এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক সরকারের অধীনে যেটি গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর। সেই নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু কথা শুরু হয়েছে। নির্বাচনে জনতার রায়ে বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের হক কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের কাছে পরিষ্কার। ভোটের ব্যবধানে যাদের হারানো হয়েছে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবেই হারানো হয়েছে। কথা উঠেছে সেই পুরোনো প্যাচাল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। তাঁর ও তাঁদের এই বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনে গোপন কিছু করা হয়নি। ইচ্ছা করলেও কেউ কিছু করতে পারেনি। জনতার রায় নিয়ে জামায়াতের আমিরের বক্তব্য শুনে পুরোনো একটি কথা মনে পড়ে গেল। ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার পর ফুটবল সেনাপতি দিয়াগো ম্যারাডোনা সে বছর বিশ্বকাপ ফুটবলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেন। এরপর ব্রিটিশ গণমাধ্যম থেকে জোর প্রচারণা চালানো হয় হাত দিয়ে গোল করা হয়েছে। এর জবাবে ম্যারাডোনা বলেছিলেন এ যদি হাত হয় সে হাত ঈশ্বরের। নির্বাচনের ফলাফলের পর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শুনে মনে হয় যদি হক কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকে তাহলে সে হক আল্লাহই কেড়ে নিয়েছেন। তবে বিষয়টি জটিল। কারণ বিরোধী দল মন্ত্রিপরিষদের শপথে যায়নি। এখন যখন সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়েছে তখন তিনি ওমরাহ পালন করতে গিয়েছেন। ওমরাহ এটি ধর্মীয় বিষয় হলেও নির্বাচনে তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পালন করা আমানত।
প্রথাগতভাবে এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হবে। ব্যতিক্রমের মধ্যে রয়েছে, গণ আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। আরও ব্যতিক্রম রয়েছে এবারে ভারসাম্য বিধানে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দলকে নেওয়ার যে বিষয় রয়েছে তাতে তারা এখনো ঐকমত্য করতে পারেনি। মূল কথা সেটি নয়। এবারের অধিবেশন শুরু হচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। নয়া অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে অতীতের সঙ্গে তাল মেলানো অতীব জরুরি। বাংলাদেশে প্রথম সংসদ টেকেনি বাকশাল গঠনের কারণে। এরপর থেকে সংসদীয় রাজনীতির টালমাটাল পর্যায় চলছিল। বাকশাল কায়েমের মধ্য দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির কবর রচনা করা হয়েছিল। এটি আবার ফিরে আসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে জনতার বিজয় হওয়ার মধ্য দিয়ে। আন্দোলনের মাঠে তিন দল সংসদীয় রাজনীতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে সংসদীয় পদ্ধতি ফিরিয়ে আনে। সে অবস্থাতেই চলছিল। বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিরোধী দলের গোঁয়ার্তুমির কারণে সংসদ তার মেয়াদকাল পূরণ করতে পারেনি। যখন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল তখন একমুহূর্তও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সংসদকে অকার্যকর করার এক আত্মঘাতী খেলায় মেতে উঠেছিল। পরিণতিতে দেখা যায়, এক-এগারো সরকার। এরপর একনাগাড়ে তিনটি সংসদ গঠিত হলো জণগণের ভোট ছাড়াই। এর বাইরে কথা হলো, স্বৈরাচার আমলে অনুগত বিরোধী দল হিসেবে কাজ করেছে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ সালে জাসদ আর বিগত তিনটি সংসদে অনুগত বিরোধী দল ছিল জাতীয় পার্টি। গণ অভ্যুত্থানে এদের সবাই বিদায় হয়েছে। বিএনপিও কখনো কখনো বিরোধী দলে ছিল। বাস্তবে বিএনপি কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি করেনি যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দল হচ্ছে সৌন্দর্য। তারা সরকারের সঠিক এবং ইতিবাচক সমালোচনা করে দেশ ও জনগণের পক্ষে কাজ করতে সহায়তা করবে, এটাই সাধারণ নিয়ম। বাস্তবে এটি খুব একটা হয়েছে সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। উপরন্তু গণতন্ত্র নস্যাৎ করতেই বিরাধী দলের ইন্ধনের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কেন ব্যাপারটি এমন হয়তো তা নিয়ে যত আলোচনাই হোক না কেন মূল বিষয় হচ্ছে গণতান্ত্রিক মানসিকতার অভাব। তাল গাছ নিজের ভাগে না পেলে সালিশ না মানার অসহিষ্ণু যে প্রবণতা সেটাই কার্যকর। এই প্রবণতার মূলে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না গোটা জাতি গত সতেরো বছরে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে তা-ও মূলত এই অসহনশীলতা থেকেই জন্ম হয়েছে। ক্ষমতার লোভ কেন? গোটা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে কেবল গণতন্ত্রও মানুষের মুক্তির কথা বলার কারণে কীভাবে বেগম খালেদা জিয়া নিগৃহীত লার্ঞ্ছিত হয়েছেন। তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভয়াবহ প্রতিহিংসা থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে গোটা জাতির প্রত্যাশা ছিল একটি গ্রহণযোগ নির্বাচনের। ব্যাপরটি কোনো কঠিন বিষয় ছিল না।
অথচ কায়েমি স্বার্থবাদিতা এমন একপর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যে কারণে মানুষের অধিকারকে পদদলিত করে ব্যক্তি স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এসব কাজে কার্যত মহান সংসদকে ব্যবহার করা হয়েছিল। হাস্যকর ভাবে বলা হতো সময় রক্ষার নির্বাচন। আরও কত কী? ভাবখান এমন যে সময় রক্ষা করা না গেলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। সংসদকে এড়িয়ে জনগণের দাবিকে পায়ে দলে কীভাবে একটি দেশকে জনগণকে পদানত করা হয়েছে তার জ্বলন্ত উদাহরণ অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকার। এসব জঞ্জাল চলতি সংসদে কতটা দূর করা যাবে বলা কষ্টকর, তবে এসব উহ্য রেখেও চলা সম্ভব নয়। পেছনে ফ্যাসিবাদ। সামনে গণতন্ত্র। যাঁরা নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন, তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে ফ্যাসিবাদের আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। আসলে এই ঘৃণ্য ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করার বিপরীতে যদি নয়া ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া স্থান করে নেয়, সেটি হবে নয়া বিপদ। যেভাবেই বলা যাক না কেন লক্ষণ খুব সুবিধার নয়। শুরু থেকেই যদি নির্বাচিত বিরোধী দল মনে করে তাদের স্বপ্ন হক কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে কে নিল? তারা কারা? খুব ছোট করে বলি, যদি তারা নির্দলীয় সরকারের কথা বলেন তাহলে তো বলতেই হবে এটি গঠন করেছিলেন আপনারাই। নির্দলীয় সরকারের উপদেষ্টাদের তো আপনারাই মনোনয়ন দিয়েছেন। তখন যা যা বলেছেন তার রেকর্ড পুনরায় শুনে নিন। নির্বাচনের সময়ও যা যা বলেছেন তার পুনঃ শুনানি হতে পারে। এমন কোনো শব্দ ও ভাষা নেই, যা নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। আসলে যে কথাটা আপনারাও বলেছেন অর্জন অনেক আছে। এবারেও নিজেরা জোট করেছেন। কথা বলেছেন ভোটের বাজারেও গিয়েছেন দামদস্তুর করেছেন, যা পাবার তাই পেয়েছেন। এটা কিন্তু একটা ব্যারোমিটার সমর্থনের। কতটা কাছে গিয়েছেন এবং কেন যেতে পারেননি। আসলে জনগণ কী আপনাদের কথায় বিশ্বাস করেছে না আতঙ্কিত হয়েছে নাকি সঠিক ভাবেনি সে কথাও দেখার এবং ভাববার বিষয়। ভোট তো আসলে গোপন ব্যাপার। জনমতের নানা বিবরণ দিয়েছেন ক্ষমতার মসনদে, যাবার জন্য যতটা আওতায় আসে তার সবটাই ব্যবহার করেছেন। হাজার হাজার জনতা আপনাদের কথা শুনেছে। অবশেষে তারা তাদের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সেটি যদি হক কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে গণতন্ত্রের বড় কথা জনতার রায় মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হবে কী? প্রশ্নটা সবার জন্য। অতীতে যারা জনগণের রায় মানেনি, মানতে চায়নি, মানতে পারেনি, তার ফলাফল হলো দুপুরের খাবার সামনে নিয়ে খেতে পারেনি। বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাষায় তাঁর কাছে আসতে চেয়েও পারেনি। হুকুম তামিল করার কাউকে পাওয়া যায়নি। এটি হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক প্রবণতা ও অগণতান্ত্রিকতার মধ্যকার পার্থক্য। গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী বেগম জিয়া যেমনি বলেছিলেন এ দেশ ছাড়া আমার কোনো ঠিকানা নেই, তেমনি দেশের মানুষ মহাসম্মানের সঙ্গে তাঁকে সমাহিত করেছে। এটিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার এক মহা সৌন্দর্য।
একজন সম্পাদক তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন মৃত্যুর চেয়েও খারাপ বিষয় রয়েছে। আসলে এবার যে সংসদ শুরু হচ্ছে তার মূল সুর যদি ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা হয় তাহলে এক কথা। যদি অন্য কোনো সুর থাকে তাহলে বুঝতে হবে আগামী দিনগুলোতে ভয়াবহ বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। ফ্যাসিবাদের আঁতাত নেই জনগণের আঁতাত হচ্ছে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সরকার ও বিরোধী দলের প্রাণবন্ত অলোচনায় জাতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাক এটি সবার প্রত্যাশা। এর বিপরীতে যদি সংসদের আন্দোলন রাজপথকে উত্তপ্ত করে এবং সেই আগুনে পুনরায় গণতন্ত্র ভস্মীভূত হয় তার দায় থেকে সংশ্লিষ্টরা মুক্ত হতে পারবেন না। সংসদকে প্রাণবন্ত করতে সরকার ও বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক শক্তির শুভযাত্রার সংসদ শুরু হতে যাচ্ছে, তা জনপ্রত্যাশার অনুবর্তী হোক, হতে পারুক এটাই কাম্য।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক