বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজকর্মী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন, ‘নারীদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ দেশ গড়তে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশের নারীরা সফলতার ছাপ রাখবে বিশ্বের দরবারে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নারী কবিতায় বলেছিলেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার রচিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। কিন্তু কবির এ কথার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে আমরা বলতে পারি না-এ বিশ্বের যা কিছু সম্পদ, অর্ধেক তার পেয়েছে নারী অর্ধেক তার নর। তার কারণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারী সব সময়ই পৃথক, নির্ভরশীল অধস্তন শ্রেণি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। যার ব্যতিক্রম আমরা পৃথিবীর সব প্রান্তের সমাজব্যবস্থায় খুব কম খুঁজে পাই। নারীসমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পৃথিবীর জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগই নারী। এক-তৃতীয়ংশ সরকারি শ্রমশক্তি নারী, কাজের সময়ের দুই-তৃতীয়াংশই নারীরা করে থাকেন। এরপরও পৃথিবীর আয়ের মাত্র এক-দশমাংশ তাঁরা অর্জন করেন এবং এক শতাংশের কম পৃথিবীর সম্পত্তির মালিক তাঁরা। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীরাই কৃষিকাজের সিংহভাগ করে থাকেন। এশীয় দেশগুলোতে নারীরা প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করেন। তবু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের কাজ অর্থনৈতিক দিক থেকে মূল্যহীন বলে ধরে নেওয়া হয়। একটি পরিবারে নারীর দান অপরিসীম সে অর্থনৈতিক দিক থেকেই হোক আর পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার দিক থেকে হোক। বর্তমানে অনেক মহিলা উপার্জন করেন শুধু পরিবারের আর্থিক উন্নতির জন্য। তবু তাঁরা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মর্যাদা পান না, যা তাঁদের নিম্ন মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে।
মহিলাদের অর্থনৈতিক অবস্থানের অবনতির মূল কারণ সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানায় এখনো পুরুষ-আধিপত্যই বেশি। আমাদের এ অঞ্চলে সাধারণত নারীর মর্যাদার পরিমাপ করা হয় তার স^ামী, ছেলে এবং ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে। পরিবারে তাদের আর্থিক সাহায্য পুরুষের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় ভাবা হয় এবং কৃষিকাজে স^ামীকে সাহায্য করা স্ত্রীর কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়। একদল সমাজবিজ্ঞানী ১৯৭৪ সালে নারীর মর্যাদার ওপর এক প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে দেখানো হয়েছে যে স^াধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিল্প উদ্যোগ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক পরিসরে নারীর যোগদান বৃদ্ধির পরিবর্তে হ্রাস পেয়েছে। তার কারণ (১) শিল্পের আধুনিকীকরণ ও (২) কাজের পরিসর সব সময় পুরুষদের কথা মাথায় রেখে তৈরি।
এ সমাজবিজ্ঞানীর দল আরও বলেছে যে এ দেশের শতকরা ৯৪ ভাগ শ্রমজীবী মহিলা অসংগঠিত অর্থনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। মহিলাদের বহির্জগতের কর্মক্ষেত্রে যোগদান কম হওয়ার আরও কারণ হলো অত্যধিক গৃহকাজ, অশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার অভাব। এসব কারণেই নারী উন্নতির প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। এ দেশে মহিলাদের কাজের অর্ধেক অবৈতনিক এবং বাকি অর্ধেক কাজের জন্য অল্প বেতন বা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। কারণ তাঁদের সব সময় পুরুষ কর্মীদের থেকে গৌণ বলে ধরা হয়। নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই শোষিত হন অতিরিক্ত কাজ, মজুরি বেতনের বৈষম্যের মাধ্যমে। এগুলোর মূল কারণ মহিলাদের কাজের বেসরকারীকরণ ও মহিলাদের সহকারী কর্মী বলে ধরে নেওয়া। আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান আর এ কৃষিকাজে নারীর যোগদান মহৎ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষিকাজের আধুনিকীকরণ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের তুলনায় মহিলারা অধিক সময় কাজ করেন, পরিবারে খাদ্য বণ্টনের সময় পুরুষরাই সিংহভাগ ভোগ করেন এবং পরিবারের আয় পুরুষদের অধীনে থাকে।
আবার এ-ও দেখা গেছে যেসব মহিলা শিল্প-উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত তাঁরা কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপযুক্ত পরিশ্রমিক পান না। দেশের বিভিন্ন বস্ত্র ও গার্মেন্টসশিল্পে লিঙ্গের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। চা-শিল্প একটি শ্রমিকভিত্তিক উদ্যোগ, যেখানে মুখ্য কাজগুলো মহিলা শ্রমিকরাই করে থাকেন। যদিও বর্তমানে তাঁরা পুরুষদের সমান মজুরি পান, তবু শতকরা ৯৮ জন মহিলারই নিজের উপার্জনের ওপর তাঁদের কোনো অধিকার থাকে না। চাকরির ক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদান ইদানীং অবশ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আদমশুমারি মতে শিক্ষকতা, ডাক্তারি, নার্সিং ইত্যাদি কাজে মেয়েদের যোগদান বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে মেয়েদের অগ্রসর না হওয়ার ইঙ্গিত করে। তুলনামূলকভাবে গ্রামীণ মহিলারা শহুরে মহিলাদের থেকে অধিক কাজে যোগদান করেন। সম শিক্ষিত একজন পুরুষ ও একজন মহিলার মধ্যে মহিলাদের তুলনায় পুরুষের কর্মপরিসর বৃহত্তর।
লেখক : প্রাবন্ধিক