শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার লোভে নিজেকে যোগ্য প্রমাণের জন্য শান্তি স্থাপনের নানা কৃত্রিম অভিনয়ের পরও যখন কাক্সিক্ষত পুরস্কার (১০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ঘোষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার) মিলল না, তখন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে স্বরূপে হাজির হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী দেশ ভেনিজুয়েলার তেলক্ষেত্রের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গত ৩ জানুয়ারি তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গভীর রাতে তাঁর রাষ্ট্রীয় বাসভবন থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসেন। এর পর পরই প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে ভেনেজুয়েলায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই অপহরণের মূল উদ্দেশ্য। মাদুরোকে রাতের অন্ধকারে এভাবে উড়িয়ে নিয়ে আসাটা
ছিল একধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং তা দেখে তখনই আশঙ্কা করা গিয়েছিল যে ট্রাম্পের এ দুঃশাসনের কালে পৃথিবীর তেলসমৃদ্ধ অন্য অনেক দেশই হয়তো সহসাই এভাবে নানা আঙ্গিক ও মাত্রায় সন্ত্রাস ও দস্যুতার শিকার হবে। বস্তুত সে ধারাবাহিকতাতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে দ্বিতীয় দফায় বর্বর আক্রমণের শিকার হলো ইরান। ধারণা করা চলে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি হয়তো আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে এবং ইরানের পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ অন্য আরও অনেক নতুন দেশই হয়তো নতুন করে আক্রমণের শিকার হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে; এবং আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ক্রমান্বয়ে তা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও সম্প্রসারিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এ আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলসহ বহু পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা চরমভাবে বিঘিœত হতে পারে; এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ২০০৭-০৮-কালীন অর্থনৈতিক মন্দা-পরবর্তী গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ প্রভৃতি সবার ভিতরেই কিছু না কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিতে শুরু করেছে, যা খুবই স্বাভাবিক। উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধকে অসিলা হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার কিছু সুবিধাবাদী মানুষ-এ থেকে ফায়দা লুটতে শুরু করেছে, যা অতীতেও বহুবার দেখা গেছে।
দেশে বা দেশের বাইরে অন্যত্র যখনই যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষের মতো বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা দেয়, অমনি সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের কিছু সুবিধাবাদী মানুষের লোভাতুর মুখ বিকৃত আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এটি সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০০০ সালের করোনা মহামারি, তেতাল্লিশের মন্বন্তর কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদি সব সময়েই দেখা গেছে। এসব প্রতিটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু চালাকচতুর লোক কখনো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে আবার কখনোবা বুদ্ধি খাটিয়ে ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এমন একচ্ছত্র ও অন্যায় মাত্রার মুনাফা অর্জন করেছে যে এটিকে লুটতরাজ বললেও কম বলা হয়। তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণকে কেন্দ্র করে লুটতরাজের সেই মোক্ষম সুযোগটি এখন ওই সব চতুর লোকজনের একেবারে হাতের মুঠোয়। তারা এখন চাইলেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নানাভাবে তাদের মুনাফা ও অন্যান্য সুবিধাদি অর্জনের কাজকে সর্বগ্রাসী করে তুলতে পারেন; এবং ধারণা করা যে সেটি তারা করবেনও। আর সে ক্ষেত্রে তারা কী কী করতে পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার লক্ষ্যে এতদসংক্রান্ত সম্ভাব্য অপতৎপরতাগুলোকে নি¤ন্ডেœাক্তভাবে চিহ্নিতকরণের চেষ্টা করা হলো।
এক. যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজার থেকে অধিক মূল্যে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে বাধ্য হবেন। তবে যতটুকু বেশি মূল্যে তারা এসব কিনবেন, ধারণা করা যায় যে তাদের মধ্যকার একটি অংশ এ নিয়ে হাঁকডাক ছাড়বেন তার চেয়ে অনেক বেশি এবং বিক্রির সময় মূল্য হাঁকবেন তার চেয়েও অধিক হারে, যা সাধারণ মানুষের কষ্টময় জীবনকে আরও কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবে। আর যুদ্ধ যত ব্যাপক ও দীর্ঘায়িত হবে, ভিতরে ভিতরে ওই ধূর্ত লোকেরা ততোটাই খুশি হবেন এবং সেই সুবাদে তাদের মুনাফার অঙ্কও ক্রমেই স্ফীত থেকে স্ফীততর হতে থাকবে। ফলে যেভাবেই হোক এ যুদ্ধকালে এসব অসৎ ব্যবসায়ীর অপতৎপরতা থেকে বাজার তথা জনগণকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
দুই. যুদ্ধের কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য স্বভাবতই নানা ঝুঁকি ও আশঙ্কার মধ্যে পড়বে। এ অবস্থায় অতীতের রীতি অনুযায়ী রপ্তানিকারকদের অনেকেই বাড়তি নগদ ভর্তুকি ও অন্যান্য প্রণোদনা দাবি করবেন। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির বিবেচনায় যা দেওয়ার সম্পদ-সামর্থ্য রাষ্ট্রের নেই, তা ছাড়া নৈতিকভাবেও এটি গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে চড়া মূল্যের কারণে আমদানিকারকরা চাইবেন শুল্ক ও কর অব্যাহতি। কিন্তু রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে যেভাবে বড় মাত্রার ঘাটতিতে ভুগছে, তাতে করে শুল্ক-কর রেয়াত বা অব্যাহতি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।
তিন. গত দেড় বছর দেশে যেহেতু কোনো অনুকূল বিনিয়োগ পরিস্থিতি ছিল না, সেহেতু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক উদোক্তাই এখন নতুন করে নিজেদের শিল্প ও ব্যবসায়কে চাঙা করে তোলার চেষ্টা করবেন, যে ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে যে উপসাগরীয় যুদ্ধকে অসিলা বানিয়ে অনেক অসৎ-ধূর্ত উদ্যোক্তাই হয়তো ব্যাংকগুলোতে গিয়ে সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করার, ঋণ ও ঋণের সুদ মওকুফ চাওয়ার এবং অপর্যাপ্ত শর্তে নতুন বা বাড়তি ঋণ প্রাপ্তির দাবি তুলবেন। বিষয়টি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পক্ষেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তদুপরি এটি ব্যাংক থেকে নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির সম্ভাবনাকেও বহুলাংশে সংকুচিত করবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও সুখবর নয়। ফলে যুদ্ধের অসিলায় ব্যাংক খাতের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টাকারী ওই সব অসৎ উদ্যোক্তাকে যেভাবেই হোক ঠেকাতে হবে।
চার. যুদ্ধের কারণে ব্যবসাবাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না এমন দাবি করে নানা ধরনের কর অব্যাহতির দাবিও একদল উদ্যোক্তা ওঠাবেন। যুদ্ধপরিস্থিতে ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দাবস্থা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু অতীতে লক্ষ্য করা গেছে যে এ ধরনের দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের চেয়ে সুবিধাবাদী অসৎ উদ্যোক্তারাই অধিক এগিয়ে থাকেন এবং যুদ্ধের নাম করে রাষ্ট্রীয় সুবিধা তারাই অধিক ভোগ করেছেন। ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করার স্বার্থে শেষোক্ত ওই অসৎ উদ্যোক্তাদের অবশ্যই এ ধরনের তৎপরতা থেকে বিরত রাখতে হবে।
পাঁচ. মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সে অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সেখানে টিকে থাকা এবং সেসব দেশে নতুন করে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি এখন প্রচ-ভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হবে জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে বিকল্প বাজার অনুসন্ধান করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাজটি কতটুকু এগোবে, তা স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এটুকু প্রায় নিশ্চিত করেই বলা য়ায় যে সেখানেও নতুন করে নতুন ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট তৈরি হবে। রাষ্ট্রের উচিত হবে সম্ভাব্য সিন্ডিকেটকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিহত করা এবং বিকল্প অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানি-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে হয়রানিমুক্ত ও কম ব্যয়বহুল করে তোলার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।
যুদ্ধের অসিলায় সম্ভাব্য অপতৎপরতার যে বিবরণ ওপরে দেওয়া হলো, এর বাইরেও আরও বহু আশঙ্কার বিষয় রয়েছে, যেগুলো হয়তো ক্রমান্বয়ে আরও স্পষ্ট হতে থাকবে। সুতরাং উপরে উল্লিখিত এবং এখানে উল্লেখ করা হয়নি এরূপ সব আশঙ্কার বিষয়েই সরকার সতর্ক থাকবে, সেটাই প্রত্যাশা।
♦ লেখক : অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায়, প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়