দয়াল নবীজি (সা.)-এর হাতে রোপণ করা ইসলাম নামক বৃক্ষ বেড়ে উঠেছে হজরত আবু বকর (রা.), হজরত ওমর (রা.), হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.)-এর মতো ত্যাগী সাহাবিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। ইসলাম টিকে আছে ফোরাতের তীরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর রক্তের নজরানার কল্যাণে। ইসলাম বৃক্ষের একটি শক্তিশালী শিকড় হলেন বিশ্বাসীদের অভিভাবক, শেরে খোদা হজরত আলী (রা.)। রমজান এলেই আলীপ্রেমিকদের হৃদয়ের দরিয়ায় কান্নার ঢেউ ওঠে। এ মাসের ২১ তারিখে দুশমনের আঘাতে নির্মমভাবে শহীদ হন ‘জ্ঞাননগরীর দরজা’ হজরত আলী (রা.)। হজরত আলী (রা.) এমন বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী যে তিনিই একমাত্র শিশু যাঁর জন্ম হয়েছে কাবা শরিফের ভিতরে। নবুয়তের প্রায় ১০ বছর আগে, রজব মাসের ১৩ তারিখে তিনি মক্কার কাবাঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ৬০১ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন রসুলুল্লাহ (সা.)-এর আপন চাচাতো ভাই এবং খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতিমা (রা.)-এর
স্বামী। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বড় আলেম শাহ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘মাদারিজুন নবুয়ত’-এ কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখা যায় যে আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে কিছু রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। তবে তিনি সহিহ বুখারির একটি বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন যে মৃত্যুর আগপর্যন্ত আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। (সহিহ বুখারি, কিতাবুল জানায়েজ)।
প্রচলিত মত হলো, শিয়া মাজহাবের সূত্রমতে আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আর সুন্নি সূত্রমতে মৃত্যুর আগে তিনি জাহেলি ধর্মের ওপরই ছিলেন। তবে সুন্নি ও শিয়া সব ঐতিহাসিকই অকপটে স্বীকার করেছেন যে ইসলাম প্রচারে আবু তালিবের সহযোগিতা ও আত্মত্যাগ রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ছিল অনন্য মাইলফলক। কাফেররা বারবার মুহাম্মদ (সা.)-কে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছিল, কিন্তু আবু তালিব দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন : ‘আমার ভাতিজা কোনো অন্যায় করেনি। আমি বেঁচে থাকতে তার একটি পশমেরও ক্ষতি হতে দেব না।’ হজরত আলী (রা.)-এর মাকাম সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মাওলানা আবদুর রহমান জামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শাওয়াহিদুন নবুওয়ত’-এ বলেন : ‘আলীর ফজিলত ও প্রশংসায় এত বেশি হাদিস এসেছে যে কলম দিয়ে লিখে বা মুখে বলে তা শেষ করা সম্ভব নয়।’
আলীর মর্যাদা সম্পর্কে আল্লামা সাফুরী (রহ.) লিখেছেন : ‘একবার সিদ্দিকে আকবর হজরত আবু বকর (রা.) আলী (রা.)-কে দেখে মুচকি হাসলেন। আলী (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু বকর! কেন আমাকে দেখে হাসছেন?’ আবু বকর (রা.) বললেন, ‘অভিনন্দন গ্রহণ করুন! নবীজি (সা.) আমাকে বলেছেন, আলীর অনুমতি ছাড়া কেউ পুলসিরাত পার হতে পারবে না।’ (নুজহাতুল মাজালিস, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৬)। মক্কার বীরদের মধ্যে হজরত আলী (রা.) ছিলেন শ্রেষ্ঠ। ‘মোজেজায়ে আম্বিয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, আলীর বীরত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে একবার হজরত ইমাম হাসান (রা.) বলেন : ‘আমার পিতা জীবনে কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি। এর রহস্য হলো, যখনই আমার নানাজান রসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে কোনো যুদ্ধে পাঠাতেন, তখন তাঁর ডান পাশে থাকতেন ফেরেশতা জিবরাইল এবং বাঁ পাশে থাকতেন ফেরেশতা মিকাইল (আ.)।’ (শানে আহলে বাইত, পৃষ্ঠা ১২২)
হজরত আলী (রা.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী দাতাগঞ্জ বখশ হাজবেরি (রহ.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কাশফুল মাহজুব’-এ লিখেছেন : হিজরতের রাতে রসুলুল্লাহ (সা.) মাওলা আলীকে নিজের বিছানায় নিজের চাদর জড়িয়ে শুয়ে থাকতে বলেন। আলী (রা.) হাসিমুখে তাঁর এ নির্দেশ মেনে নেন। তিনি জানতেন, কাফের মুশরিকরা অতর্কিত আক্রমণে মুহাম্মদ (সা.) মনে করে তাঁকে হত্যা করতে পারে। তবু তিনি রসুল (সা.)-এর নিরাপত্তার জন্য খুশিমনে নিজের জীবন বিপন্ন করতে প্রস্তুত হন।
এ ঘটনা দেখে আসমানে রহমতের দরিয়ায় ঢেউ ওঠে। আল্লাহতায়ালা জিবরাইল ও মিকাইল, এই দুই প্রধান ফেরেশতাকে ডেকে বলেন : ‘আমি তোমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববন্ধন স্থাপন করলাম। এখন তোমরা একে অপরের ভাই। তোমরা কি একজন আরেকজনের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারবে?’ জবাবে তাঁরা নীরব থাকেন। তখন আল্লাহ বলেন : ‘আমি আলীকে আমার বন্ধুর সঙ্গে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করেছি। ভাইয়ের জন্য সে নিজের জীবন বিপন্ন করে হাসিমুখে মৃত্যুকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়েছে। যাও, তোমরা তাকে নিরাপত্তা দাও।’ অতঃপর দুই ফেরেশতা জমিনে এসে আলীর নিরাপত্তায় পাহারা দিতে থাকেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, শেষ রাতে যখন কাফেররা ঘরে ঢুকে চাদর সরিয়ে দেখে বিছানায় মুহাম্মদ (সা.) নন, বরং আলী (রা.) শুয়ে আছেন, তখন তারা আশ্চর্য হয়ে তাঁকে হত্যা না করেই ফিরে যায়। (কাশফুল মাহজুব, পৃষ্ঠা ১৯৮)।
♦ লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ