সংসদ শুরু, পরীক্ষাও শুরু
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক সময় সরলরেখায় চলে না। এখানে ইতিহাস মাঝে মাঝে বৃত্তাকারে ঘোরে-ঘটনা বদলায়, চরিত্র বদলায়, কিন্তু প্রশ্নগুলো প্রায় একই থাকে। ১২ মার্চ যখন বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলো, তখন অনেকের মনেই হয়তো এই অনুভূতিটাই কাজ করেছে-নতুন অধ্যায়ের সূচনা, কিন্তু সেই অধ্যায়ের ভিতরেও যেন পুরোনো ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। এই সংসদের জন্মও হয়েছে এক অস্থির সময়ের পর। ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ২০ মাস পর গঠিত হয়েছে নতুন সংসদ। এই সময়ের মধ্যে দেশ দেখেছে অন্তর্বর্তী শাসন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং রাষ্ট্র পরিচালনার এক অদ্ভুত অন্তর্বর্তী বাস্তবতা। একটি রাষ্ট্র যখন নির্বাচিত সরকার, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা, জন-আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশোধের রাজনীতি, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার মাঝখানে আটকে যায়, তখন সংসদ শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পুরো জাতির রাজনৈতিক মানসিকতার পরীক্ষাগার। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রায়ই বলেন, সংসদ হলো একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়না। সেখানে যে আচরণ দেখা যায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত সমাজের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংসদ সব সময় কেবল আইন তৈরির জায়গা ছিল না। এটি অনেক সময় হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনার মঞ্চ, আবার কখনো কখনো হয়েছে জাতির আত্মসমালোচনার জায়গা। ফলে নতুন সংসদ শুরু হলেই প্রশ্ন ওঠে-এই সংসদ কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে চলবে, নাকি যুক্তির শক্তিতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
১. নতুন সংসদ : প্রত্যাশা ও বাস্তবতার শুরু
১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন ছিল প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ আসনের কায়সার কামাল সর্বসম্মতিক্রমে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। তবে অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ১২তম জাতীয় সংসদের স্পিকার কার্যত অনুপস্থিত হয়ে পড়েছিলেন, আর ডেপুটি স্পিকার তখন কারাগারে। এর ফলে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু করতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই দৃশ্য খুব সাধারণ নয়। বরং এটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিষ্ঠান কাগজে যত শক্তিশালীই দেখাক, মানুষ ও রাজনৈতিক আচরণ দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানও হঠাৎ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সংসদীয় কাঠামো তখন থাকে, কিন্তু সংসদীয় আত্মা অনিশ্চয়তায় ঝুলে যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে সংসদকে জনগণের প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বিরোধী দলকে কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে গঠনমূলক বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সংসদের ভিতরেই আবার দেখা গেছে অন্য দৃশ্য। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। রাষ্ট্রপতিকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়েছে এবং প্রতীকীভাবে ‘রেড কার্ড’ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এই দৃশ্য নতুন নয়। সংসদ অনেক সময় যুক্তির চেয়ে প্রতীকের মঞ্চ হয়ে ওঠে। কেউ বক্তৃতা দেয়, কেউ ওয়াকআউট করে, কেউ প্রতিবাদ করে-সব মিলিয়ে এটি অনেকটা রাজনৈতিক নাটকের মতো। তবে সেই নাটকের মাঝেই গণতন্ত্রের একটি মৌলিক সত্য লুকিয়ে থাকে, বিরোধিতা থাকলেই গণতন্ত্র দুর্বল হয় না; বরং অনেক সময় সেটিই তার প্রাণচিহ্ন।
২. ১৩৩টি অধ্যাদেশ : অন্তর্বর্তী সময়ের আইনি স্মারক
এই অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ২০ মাস রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। সেই সময় জারি করা এই অধ্যাদেশগুলো মূলত প্রশাসনিক ও আইনি প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এগুলো সংসদে পেশ করেছেন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হলেও এগুলোর ওপর এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী পরে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এক অর্থে এগুলো একটি অন্তর্বর্তী সময়ের প্রশাসনিক স্মারক। রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়, তখন আইন অনেক সময় সেতুর মতো কাজ করে, এক সময় থেকে আরেক সময়ের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। আবার এটাও সত্য, সব সেতু স্থায়ী হয় না; কিছু সেতু পার হওয়ার জন্যই বানানো হয়। এখন দেখার বিষয়, এই অধ্যাদেশের কোনগুলো স্থায়ী আইন হয়ে থাকবে, আর কোনগুলো কেবল একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের কাগুজে চিহ্ন হয়ে ইতিহাসে জমা পড়বে। ইংরেজ চিন্তাবিদ এডমন্ড বার্ক একবার বলেছিলেন, ‘আইন অনেক সময় ইতিহাসের চেয়েও বেশি কথা বলে।’ এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ হয়তো সেই ইতিহাসেরই দলিল হয়ে থাকবে।
৩. গণতন্ত্র : নির্বাচনই শেষ কথা নয়
বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা প্রায়ই নির্বাচনের প্রশ্নে এসে থেমে যায়। নির্বাচন অবশ্যই গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন জবাবদিহি, স্বাধীন বিচার বিভাগ, আইনের শাসন এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক সমস্যা হলো আমাদের রাজনৈতিক স্মৃতি খুবই ভঙ্গুর। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও বদলে যায়। পাঠ্যপুস্তক পুনর্লিখন হয়, রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর মূল্যায়ন পাল্টে যায়। ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠে না।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক একবার মজা করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ইতিহাসও অনেক সময় ‘কোয়ালিশন সরকার’ দিয়ে চলে। আজ যে ব্যাখ্যা সত্য, কাল অন্য ব্যাখ্যা এসে সেটিকে সরিয়ে দেয়। এই প্রবণতা থেকে বের হওয়া জরুরি। কারণ একটি জাতির রাজনৈতিক স্মৃতি যদি বারবার মুছে ফেলা হয়, তাহলে সেই জাতি একই ভুল বারবার করে। আমরা তখন নতুন পতাকা হাতে পুরোনো অভ্যাস নিয়ে হাঁটি, নতুন স্লোগান দিই কিন্তু পুরোনো রাগ-ক্ষোভ বয়ে বেড়াই। ফলে নির্বাচন বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র খুব বেশি বদলায় না।
৪. ক্ষমতা, নৈতিকতা এবং নীরবতার রাজনীতি
আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো, এটি মূলত একটি নৈরাজ্যবাদী ব্যবস্থা। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় বিশ্ব সরকার নেই। ফলে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শক্তির ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকে। এই বাস্তবতার মধ্যে নৈতিকতার প্রশ্নটি সব সময়ই জটিল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ নৈতিকতাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। কেউ আবার রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচনা করেন। আবার কেউ কেউ ব্যক্তির অধিকারকে রাষ্ট্রের সীমানার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। বাস্তব রাজনীতিতে এই তিনটি ধারণারই ব্যবহার দেখা যায়।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুকিডাইডিস বলেছিলেন, ‘শক্তিশালীরা যা করতে পারে তাই করে, দুর্বলরা যা সহ্য করতে বাধ্য তাই সহ্য করে।’ এই কথাটি আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে, নীরবতা। সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না। সব সমালোচনার জবাবও দিতে হয় না। কারণ অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ওঠে। যে রাষ্ট্র, যে রাজনীতিক, যে দল, যে ব্যক্তি প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত, সে আসলে আত্মবিশ্বাসের নয়, অস্থিরতার লক্ষণও দেখায়। অনেক সময় মাইক্রোফোনের চেয়েও বিরতি বেশি কথা বলে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক সময় এমন দৃশ্য তৈরি করে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য যেমন গবেষণার বিষয়, সাধারণ মানুষের জন্য তেমনি বিস্ময়েরও কারণ। একটি সংসদের কথা ভাবুন, যেখানে আগের সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করেননি, কিন্তু কার্যত অনুপস্থিত হয়ে গেছেন; ডেপুটি স্পিকার কারাগারে; আর নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু করতে হয়েছে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এমন দৃশ্য খুব ঘনঘন দেখা যায় না। এই বাস্তবতাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্র শুধু সংবিধানের ধারা নয়, শুধু নির্বাচনের ফলাফলও নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সংসদ ভবন তৈরি করা সহজ। কিন্তু সংসদীয় সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।
১৩তম জাতীয় সংসদ তাই কেবল একটি নতুন রাজনৈতিক পর্ব নয়, বরং একটি বড় পরীক্ষাও। এখানে আইন হবে, বিতর্ক হবে, রাজনৈতিক সংঘাতও হবে-এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটি জিনিস দরকার, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি। যে রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেয় না, সে বারবার একই গর্তে পড়ে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে সংসদ শুরু হয় বড় প্রত্যাশা নিয়ে, কিন্তু কিছুদিন পর তা আবার ক্ষমতার হিসাবনিকাশের জায়গায় পরিণত হয়। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি দেখায়, কেউ প্রতিবাদের রাজনীতি করে, কেউ আবার পুরো ব্যবস্থাকেই অবিশ্বাসের চোখে দেখে। ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য তোকভিল একবার বলেছিলেন, গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটের বাক্সে নয়; বরং নাগরিকদের অভ্যাসে। বাংলাদেশের নতুন সংসদের সামনে তাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, একটি নতুন অভ্যাস তৈরি করা। বিতর্কের অভ্যাস। সহনশীলতার অভ্যাস। প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মানের অভ্যাস। কারণ সংসদ ভবনের দেয়াল দিয়ে গণতন্ত্র তৈরি হয় না; সেটি তৈরি হয় সংসদের ভিতরের আচরণ দিয়ে।
আজ যে সংসদ শুরু হয়েছে, সেটি হয়তো কয়েক বছর পরে আবার ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে। কিন্তু সেই ইতিহাস লিখবে কেবল আইন নয়, সংসদের চরিত্র। আর ইতিহাস খুবই ধৈর্যশীল। সে সবকিছুই দেখে, মনে রাখে এবং একদিন নীরবে বিচার করে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ