আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার লক্ষ্য সারা দুনিয়াকে তার দেশের গোলাম বানানো। সাংবিধানিকভাবে আমেরিকা প্রজাতান্ত্রিক দেশ। যেখানে কারও রাজা বা সম্রাট সাজার সুযোগ নেই। প্রজাতন্ত্রে প্রজারাই সব ক্ষমতার অধিকারী। তারাই দেশের মালিক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গানের মতো-‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজত্বে...’। আমেরিকানদের দুর্ভাগ্য, তারা যাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছেন, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসেও সন্তুষ্ট নন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে রাজা বা সম্রাট হওয়ার মনোবাসনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। মুখে না বললেও কাজকর্মে স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। যা ইচ্ছা তাই করাকে তিনি নিজের কর্তব্য বলে ভাবছেন। চেঙ্গিস, হালাকু খান, তৈমুর লংয়ের মতো পাষণ্ড শাসকদের দলে নিজের নাম লেখাতে তিনি উন্মাদ হয়ে উঠেছেন। ওই শাসকরা একেক দেশকে পদানত করার আগে অপমানজনক শর্তে আত্মসমর্পণের হুকুম জারি করতেন। অন্যথা হলে রক্তের গঙ্গা বইয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থের চেষ্টা চালাতেন।
বিশ্বের সবচেয়ে জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডিকে রাতের আঁধারে ট্রাম্প যেভাবে অপহরণ করে নিজের দেশে নিয়ে গেছেন, যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থায় অকল্পনীয়। পাশের ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশ কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে সাড়ে ছয় দশক ধরে। চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও সে দেশটি নিজেদের স্বাধীন সত্তা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিউবার উঁচু মাথা নিচু করতে তাদের ভাতে মারার চেষ্টাও চলছে। প্রতিবেশী কানাডাকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার নির্লজ্জ প্রস্তাব দিতেও ট্রাম্প সাহেবের এতটুকু বাধেনি। আরেক প্রতিবেশী মেক্সিকোর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের আচরণ আর যাই হোক সৎ মনোভাবের পরিচয় নয়। গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।
দুই. ভিয়েতনাম যুদ্ধকালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের একজন তাঁবেদার প্রেসিডেন্ট আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমেরিকা যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন হয় না। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের জন্যও এক মহাসত্য। অনেকেরই জানা, রাশিয়া ও ইউক্রেন ছিল একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ। জাতিগতভাবেও দুই দেশের মানুষ স্লাভ জাতিগোষ্ঠীভুক্ত। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১৫টি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে। সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে স্লাভ জাতিগোষ্ঠীভুক্ত রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশ আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও তাদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বজায় ছিল। ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থি সরকারের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে গণ অভ্যুত্থান ঘটে আমেরিকার প্ররোচনায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো অলেক্সিয়িভিচ পোরাশেঙ্কা সে অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান। এর ফলে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাশিয়া ইউক্রেনের রুশভাষী ক্রিমিয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের উসকে দেয়। তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহীরা ক্রিমিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। একপর্যায়ে গণভোটেরও আয়োজন হয় ক্রিমিয়ায়। সে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার রাশিয়ার সঙ্গে ওই অঞ্চলের সংযুক্তির পক্ষে রায় দেয়। রাশিয়াও এই সুযোগে ক্রিমিয়াকে সাংবিধানিকভাবে তাদের দেশের অংশ ঘোষণা দেয়।
স্বীকার করতেই হবে, ক্রিমিয়া নিয়ে রাশিয়ার আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। তবে একই সঙ্গে বিবেচ্য যে ক্রিমিয়া ছিল ঐতিহ্যগতভাবে রাশিয়ার অংশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের পরও এলাকাটি রাশিয়ার অংশ বলে বিবেচিত হতো এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও ছিল না। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনের আমলে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে তখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দেয়নি। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়া ক্রিমিয়ায় তাদের দখলস্বত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়নি। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে আমেরিকাপন্থি অভ্যুত্থানের পর রাশিয়া ক্রিমিয়া নিয়ে খেলা শুরু করে। ইউক্রেনে ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নির্বাচিত হন সিনেমার কৌতুক অভিনেতা জেলেনস্কি। তিনি তার দেশকে ন্যাটোর সদস্য করার চেষ্টা করতেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চরমে পৌঁছায়। যা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর জন্য নিঃসন্দেহে দায়ী মস্কো। তবে এর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আমেরিকার কারসাজি। ইউরোপ শুধু নয়, বিশ্বশান্তির জন্যও এ যুদ্ধের অবসান সময়ের দাবি। বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ-সংঘাত বাধানোর মার্কিন অপকৌশলও বন্ধের বিষয়টি সমভাবে জরুরি।
ইউক্রেন সংকটের শুরু ২০১৪ সালে। সে দেশের সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার নেপথ্য ভূমিকায়। নিজেদের গণতন্ত্র ও মুক্ত বিশ্বের প্রবক্তা দাবি করে ওয়াশিংটন বিশ্বের নানা প্রান্তের অবাধ্য দেশের সরকার পরিবর্তনে কলকাঠি নাড়ছে। অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সেসব দেশের মীরজাফরদের পেছনে অর্থ ব্যয় করছে। ইউক্রেনকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়ে সাহায্যের নামে শত শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সে দেশে পাঠানো হয়েছে। যুদ্ধে ইতোমধ্যে ইউক্রেন ১ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা হারিয়েছে। তবে যুদ্ধের জন্য সাহায্য হিসেবে দেওয়া অস্ত্রের দাম উশুলে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে আমেরিকা। সোজা কথায় মীরজাফরদের ব্যবহার করে বাইডেন ও ট্রাম্প সাহেবরা ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেনকে পথে বসিয়েছে। আমেরিকার বিদায়ি প্রেসিডেন্ট বাইডেন বাংলাদেশেও সাজিয়েছিলেন একই ধরনের নাটক। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনে তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন ২৯ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের টাকায় যে অর্থের পরিমাণ ৩৬০ কোটি টাকারও বেশি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি ফাঁস করেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটদের বন্ধু হিসেবে বিবেচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তিনি যে দুই চোখে দেখতে পারেন না, তা অনেকের জানা। তাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প বাংলাদেশের সরকার পতনে বাইডেনের অপকর্ম ফাঁস করে বুঝিয়ে দেন ইউনূসের পেছনে তার সমর্থন নেই। বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্প সাহেব যে বাণিজ্য চুক্তি চাপিয়ে দেন, তার ধকল বছরের পর বছর ধরে অনুভূত হবে। দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে আর কোনো সরকার এমন জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়নি। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু চুক্তির পাপ বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। এ পাপমোচনের পথও রুদ্ধ। কারণ বাংলাদেশের কোনো সরকার চুক্তি বাতিল করলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে দৃশ্যত আপত্তি করবে না। কিন্তু এর বদলা নিতে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি বন্ধ করলে বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। কোনো সরকারের পক্ষে সে ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হবে কি না, তাও একটি প্রশ্ন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন ২০১৬ সালে। সস্তা স্লোগান ও জনসন্তুষ্টিবাদের ওপর ভর করে। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বারাক ওবামা। যিনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ। তার বাবা বারাক ওবামা সিনিয়র কেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন পড়াশোনা করতে। যিনি শুধু কৃষ্ণাঙ্গ নন, ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে একজন মুসলিম। আমেরিকার হাওয়াই রাজ্যের রাজধানী হনুলুলুতে পড়াশোনার সময় শ্বেতাঙ্গ সহপাঠী অ্যান ডানহামের সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়ান। বারাক ওবামার জন্মের ছয় মাস আগে প্রেমিক যুগল বিয়েতে আবদ্ধ হন। ভিন দেশের, ভিন ধর্মের, ভিন বর্ণের দুই নারী-পুরুষের এ বিয়ে শেষ পর্যন্ত টেকেনি। তিন বছর পর তাদের ছাড়াছাড়ি হয়। বারাক ওবামার শিশুকাল কাটে নানা-নানির কাছে। ওবামার মা পরবর্তী সময়ে এক ইন্দোনেশিয়ান সহপাঠী লোলো সোয়েটোরের প্রেমে পড়েন। বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হন তারা। সৎবাবার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায়ও কেটেছে ওবামার শৈশব। সে দেশের স্কুলে ছয় থেকে দশ বছর পর্যন্ত ইন্দোনেশীয় ভাষায় পড়াশোনাও করেছেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার স্কুলে তিনি ইন্দোনেশীয় সৎবাবার পরিচয়ে ভর্তি হন। সেখানে তার নাম ছিল ব্যারি সোয়েটোরো। স্কুলের খাতায় তার ধর্মীয় পরিচয় ছিল মুসলিম। শৈশবে বারাক ওবামা তার সৎবাবার কাছ থেকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার শিক্ষা অর্জন করেন।
বারাক ওবামা দুই মেয়াদে আট বছর অর্থাৎ ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম পিতার ঔরসে জন্ম নেওয়া ওবামার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়াকে মেনে নিতে পারেনি বর্ণবাদীরা। তারা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানমর্যাদা বিসর্জনের ঘটনা হিসেবে প্রচার চালায়। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সেরা জাতি হিসেবে টিকিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখিয়ে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ২০১৬ সালের নির্বাচনে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। হিলারি অভিজ্ঞ ও সুযোগ্য প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও জনসন্তুষ্টিবাদের সস্তা সেøাগানে ট্রাম্প জয়ী হন চমক দেখিয়ে। প্রথমবার ট্রাম্প মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি যা ইচ্ছা তাই করাকে কর্তব্য বলে ভাবছেন। ইরানের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করার পরও তার সাধ মেটেনি। তিনি এমন এক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যে যুদ্ধে কোনো পক্ষের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
পাদটীকা : চুরিচোট্টামি নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছোটবেলার অভ্যাস। এ মহাপুরুষ নিজেও তা অকপটে স্বীকার করেছেন। যে ক্ষুদ্রঋণের জাল ছড়িয়ে তিনি লাখ লাখ প্রান্তিক নারীকে শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছেন, সেই ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তাও তিনি নন। গোটা বিষয়টা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প। যা পরবর্তী সময়ে নিজের বলে চালিয়ে দেন। ড. ইউনূস জুলাই গণহত্যার ব্যাপারে সোচ্চার। সে সময়ের সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়াই উচিত। ইউনূস ক্ষমতায় থাকতে শিশুদের হামসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার অবহেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটিকে ফৌজদারি অবহেলা বলে উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সব উপদেষ্টার বিচার এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছেন এক আইনজীবী। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি ও শিশু হত্যার জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]