২০২৩ সালের জুনের দি¦তীয় সপ্তাহে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বৃহত্তম এই দলটি যে ইশতেহার প্রকাশ করে, তাতেও ৩১ দফার প্রতিফলন ছিল। সারা দেশে বিএনপির ৩১ দফা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দলীয় প্রধানসহ নেতারা সভা-সমাবেশে ৩১ দফার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছিলেন। বিঘোষিত ৩১ দফায়; পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিতরে জমে থাকা অচলায়তন সঠিকভাবেই শনাক্ত করা হয়েছিল। অচিরে বিএনপি ন্যায় ও গণতন্ত্রের পথে একটি উদার ও আপসহীন দল হিসেবে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ৩১ দফার প্রথমেই বলা হয়, ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এজন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।’
অন্যান্য দফায় সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার, রিকনসিলিয়েশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ন্যায়বিচার ইত্যাদি প্রশ্নে সুচিন্তিত দিগদর্শন তুলে ধরা হয়েছিল। সামগ্রিক বিচারে সেই দলিলে বাংলাদেশে বহুমত ও নানান ধর্মের সহাবস্থানের নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে একটি রেইন বো সোসাইটি গড়ে তোলার নিশানা দেওয়া হয়েছিল। আজকে বিএনপি যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায়, তখন তারা বিঘোষিত নীতিতে কতটা অবিচল রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হবে এবং হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার উল্টো পথে হাঁটতে চাইছে কি না, কারও কারও মনে সে সন্দেহেরও উদয় হতে শুরু করেছে। মনে রাখা দরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাইরেও বিবিধ মতাদর্শের মানুষ বাংলাদেশে আছেন। পার্লামেন্টে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, হয়তো সংগত কারণেই। কিন্তু নীতিগতভাবে সরকার নিজে প্রতিনিধিত্বহীন সেই জনগোষ্ঠীরও প্রতিনিধিত্ব করে। কাজেই রেইন বো সোসাইটি চাইলে সেই জনগোষ্ঠীর কথাও ভাবতে হবে, মাথায় রাখতে হবে। এ বিষয়ে আজ এ পর্যন্তই। বারান্তরে আলোচনার ইচ্ছা থাকল।
দুই. সব দিক থেকে একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হলে দক্ষ, যোগ্য ও জ্ঞানমুখী সত্যিকারের শিক্ষিত জনসমাজ প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শিক্ষাকে বর্তমান সরকার শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ বিবেচনা করে। এই কথাটি বলেন তিনি গত বুধবার পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে। তিনি জানান, সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করবে। বর্তমানে এই বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। যদিও ১৯৭৩ সালের বাজেটের তুলনায় ভলিউম বেড়েছে কয়েক শ গুণ। এটা যখন ৫ শতাংশে উন্নীত হবে, তখন তা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে আশা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, প্রাইমারি স্কুলের দুই লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। এখনই দেশজুড়ে এই কার্যক্রম চালু করা সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাকে প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আরও কিছু কর্মপরিকল্পনার কথা তিনি বলেন, যা শিক্ষা উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছার বার্তা বহন করে। বিনিয়োগ ও সদিচ্ছা তখনই সুফল বয়ে আনে যখন বাস্তবায়ন পর্যায়ে সবগুলো উপাদান ঠিকভাবে কাজ করে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের বিনা পয়সায় ইউনিফর্ম দেওয়া হলে স্কুলগুলোতে শিক্ষার একটা আনন্দময় পরিবেশ হয়তো তৈরি হবে। সীমিত আয়ের অভিভাবক; যাদের সন্তানের ইউনিফর্ম কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই, অল্প হলেও তাদের খরচ বাঁচবে। কিন্তু এতে সরকারি প্রাইমরি স্কুলের শিক্ষার মানোন্নয়ন কতখানি হবে, সে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
প্রাইমারি শিক্ষার্থীরা কতখানি তৈরি হলো তার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে ভবিষ্যতে তার মেধাবিকাশের মাত্রা। বাংলাদেশে ছেলেমেয়েরা প্রাইমারি লেভেলে সাধারণত ছয় বছর লেখাপড়া করে থাকে। এই ছয় বছরে কোনো বালক বা বালিকা বিদ্যাধর হয়ে না উঠলেও তার মধ্যে একটি অদম্য লার্নিং ট্যান্ডেসি তৈরি হওয়ার কথা। সে নতুন কিছু শিখতে চায়, জানতে চায়। শিশুমনে এই কৌতূহল সৃষ্টি করাই হওয়া উচিত প্রাইমারি শিক্ষার লক্ষ্য। তার আগ্রহই বলে দেবে ছেলে বা মেয়েটি কোন লাইনে ভালো করবে। প্রাথমিক স্তরে যদি এই লক্ষ্যটি অর্জিত না হয়, তাহলে বুঝতে হবে স্কুলে সে ঠিক শিক্ষাটি পায়নি। তার ঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যে যত্নশীলতা দরকার ছিল, সেটাও সে পায়নি। বাড়ন্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলে এই যত্নটা কে নেবে? সে রকম যত্নপরযোগ্য শিক্ষক তো চাই!
শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ছাত্র নেই। পক্ষান্তরে ব্যয়বহুল বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ধরনের স্কুলগুলো জায়গা দিতে পারে না। উপজেলা সদর, এমন কি কোনো কোনো বর্ধিষ্ণু গ্রামেও কমবেশি একই চিত্র। কেন? অনুসন্ধান প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পরের সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের অনেক প্রসার ঘটেছে। নজরকাড়া উন্নতি হয়েছে অবকাঠামোগত। টিনের নড়বড়ে স্কুলঘরগুলোর জায়গায় তিনতলা ভবন হয়েছে। যে গ্রাম-জনপদ সন্ধ্যা নামার সঙ্গে নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নিত, সেখানেও এখন স্কুল হয়েছে। প্রাইমারি ও হাইস্কুল দুই-ই হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কলেজও হয়েছে। অজপাড়াগাঁয়ের বহু কলেজে অনার্স কোর্সও চালু হয়েছে। গ্রামে থেকে গ্রামের কলেজে পড়ে অনার্স-মাস্টার্স করা একালে কোনো কঠিন কাজ নয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে গ্র্যাজুয়েটের হার ছিল ১ শতাংশেরও কম। এখন সেটা বেড়ে ১০-১২ শতাংশ হয়েছে। কমপক্ষে ১০ গুণ বেড়েছে।
অতীতে শিক্ষার মূল সমস্যা ছিল বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগের অভাব। তখন মানুষকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে পরিস্থিতি উল্টো। এখন অধিকাংশ মানুষ শিক্ষার আওতায় এসেছে, কিন্তু গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এখন পুরোপুরি মুখস্থনির্ভর। গাইড বই আর কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের নিজস্বতার জায়গা দখল করে নিয়েছে। সৃজনশীলতা ও দক্ষতা উন্নয়নে ঘাটতি প্রকট এবং কর্মবাজারের শিক্ষার সংযোগ দুর্বল। শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে অবিদ্যার বাহন হয়ে উঠেছে। জানাশোনার বিচারে নয় কেবল, শিক্ষিত লোকদের মধ্যেই অনাচারের প্রবণতা বেশি। সামাজিক ও বৈষয়িক অনাচারে অভ্যস্ত লোকদের বেশির ভাগই তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণিভুক্ত। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বও একটি বড় সমস্যা। এটি প্রমাণ করে যে শিক্ষা শুধু বিস্তৃত হলেই যথেষ্ট হয় তা নয়; তা হতে হবে চাহিদাভিত্তিক, দক্ষতানির্ভর এবং যুগোপযোগী।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত অবনমনের কারণগুলো কী? এক দুটি বাক্যে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে নেওয়া কঠিন। মনে রাখতে হবে শিক্ষা চ্যারিটি নয়, বেসাতিও নয়। শিক্ষা মানবজীবনের মৌলিক প্রয়োজন। একদল মানুষ এটাকে চ্যারিটি হিসেবে দেখে। আরেক দলের কাছে এটা বেসাতি। যারা চ্যারিটি ভাবেন, তারা বলেন বাজেট বাড়াও। যারা বাণিজ্য বিবেচনা করেন তাদের চাই গাইডবইয়ের ব্যবসা, কোচিং সেন্টারের পসার। তাদের দরকার যেমন করে হোক স্কুল-কলেজের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। নানান নামে তারা প্রাইভেট শিক্ষালয় খুলে চুটিয়ে ব্যবসা করেন। পরিণতিতে শিক্ষক খাঁটি শিক্ষক হয়ে উঠেছেন না। শিক্ষার্থী ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ নীতি পরিহার করে সার্টিফিকেট শিকারি হয়ে যাচ্ছে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রায় উদোম গায়ের পণ্ডিতের কথা মনে পড়ে। সেই পণ্ডিতের মনে অনেক খেদ ছিল, দুঃখ ছিল। তিনি অঙ্ক কষে দেখিয়ে ছিলেন স্কুল ইন্সপেক্টর ইংরেজ সাহেবের তিন পায়া কুকুরের এক ঠ্যাঙের সমান একজন পণ্ডিত। তিন পায়া সারমেয়র জন্য ইংরেজ সাহেবের মাসে খরচ ৭৫ টাকা। আর ওই পণ্ডিত মাসোহারা পেতেন ২৫ টাকা। কাজেই পণ্ডিতের অঙ্কে কোনো ভুল ছিল না। ঔপনিবেশিক আমলে আসলেই এরকম শোচনীয়ই ছিল শিক্ষকদের অবস্থা। কিন্তু সেই সময়ের শিক্ষকরা চাকরি নেওয়ার পরে থেকে ভালো শিক্ষক হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে দিতেন। ছাত্ররা যত না পড়ত তার চেয়ে বেশি বৈ কম পড়তেন না শিক্ষকরা। এখন টিচারদের পড়াশোনার সেই বালাই নেই। স্কুল-কলেজে লাইব্রেরিয়ান আছে, লাইব্রেরি নেই। থাকলেও নোট-গাইডবইয়ের কপিতে ঠাসা অথবা ধূলিধূসরিত। ছাত্ররা বই পড়ে না। গাইড পড়ে মাল্টিপল চয়েসের শুদ্ধ জবাবটি মুখস্থ করে। তারা শেখে পদ্মা নদীর মাঝির লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওটা কবিতা না উপন্যাস; তা জানে না। তারা টিকটক শিখছে, ফেসবুক শিখছে, বই পড়ে না। পত্রিকাও নয়। শিক্ষকরা দলাদলি করেন। ছাত্ররাও। শিক্ষক পেটাতে তাদের বাধে না। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর খুব নগ্নভাবে বোঝা গেছে যে ছাত্ররা কতটা অছাত্র হয়ে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হয়েছিল মব সন্ত্রাস।
এসবের পেছনে সক্রিয় শিক্ষকদের দলাদলি। বাইরের রাজনীতি। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদের অক্ষমতা ইত্যাদি। কোচিং সেন্টার ও গাইডবইগুলো শিক্ষা ও জ্ঞানবৃক্ষের মূলচ্ছেদন করে চলেছে। সমাজে প্রকৃত শিক্ষানুরাগীর সংকট তৈরি হয়েছে। যারা আছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জায়গা হয় না। কমিটির সভাপতি বানান এমপি মহোদয়। তিনি সভাপতির যোগ্যতা ও শিক্ষানুরাগ দেখেন না। তিনি দল দেখেন। সেই সভাপতি স্কুল-কলেজে যান টাকার ভাগ বসাতে। প্রতিষ্ঠান কেমন চলছে, পড়াশোনার মান এসব নিয়ে তার চিন্তা নেই। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য এই জায়গাগুলো মেরামত করতে হবে সবার আগে।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক