রাজধানী ঢাকা, একসময় যার পরিচয় ছিল প্রাণচঞ্চল নগরী হিসেবে, আজ তা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের জটে আটকে পড়া শহরে। বিশেষ করে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তার যেন স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দিয়েছে। এটি শুধু যানজটের সমস্যা নয়; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর গভীরে। ঢাকার সড়কগুলো মূলত পরিকল্পিত হয়েছে মোটরযান চলাচলের জন্য, যেখানে নির্দিষ্ট গতিতে যানবাহন চলবে এবং শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রিকশা ও অটোর দখলদারি এই কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। অসমগতির এই যানবাহনগুলো প্রধান সড়কে চলাচল করায় দ্রুতগতির বাস, কার ও অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে। জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অফিসগামী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, শিক্ষার্থীরা ক্লাস মিস করছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী যানজট উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যাটারিচালিত অটোর বিস্তার যত বাড়ছে, ততই বিদ্যুতের ওপর অদৃশ্য চাপ বাড়ছে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি পড়ছে, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক দুর্বল। অর্থাৎ একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থা পরোক্ষভাবে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ঢাকার যানজট শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি জ্বালানিরও বিশাল অপচয়ের কারণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন স্থির বা ধীরগতিতে চলায় পেট্রোল ও ডিজেল অকারণে পুড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাড়ছে। কারণ জ্বালানির একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ার ফলে বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ নগরের বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলছে। এতে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য রোগ বাড়ছে। একসময় ঢাকার মানুষ স্বল্প দূরত্বে হাঁটতে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু অটোর সহজলভ্যতা মানুষকে অলস করে তুলছে। এই পরিবর্তন শুধু অভ্যাসের নয়, এটি একটি সামাজিক রূপান্তর। মানুষ ধীরে ধীরে শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
এ ছাড়া বৃহৎসংখ্যক অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে অটোরিকশা পড়ায় ঝুঁকি মূলত মূর্তিমান ছুটছে রাজপথে। অটো চালানোর জন্য কোনো কঠোর প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা না থাকায় এটা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণহীন অটো এখন সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ মোড় নেওয়া বা উল্টো পথে চলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এই দুর্ঘটনাগুলো শুধু প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না, বরং বহু মানুষকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। অতএব অটো নিয়ন্ত্রণ না করলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে কতসংখ্যক অটো চলাচল করছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। এই তথ্যের অভাব নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করে দিচ্ছে। যেখানে একটি খাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার সঠিক তথ্য জানা জরুরি, সেখানে এই অজ্ঞতা পরিকল্পনাকে অকার্যকর করে তুলছে। ফলে সরকার কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে পারছে না এবং সমস্যা দিনদিন জটিল হচ্ছে। এর কারণে গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অটো চালানো আজ গ্রামবাংলার বহু মানুষের কাছে একটি সহজ ও দ্রুত আয়ের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জমি চাষের অনিশ্চয়তা, কৃষিতে লাভের ঘাটতি এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকট মানুষকে শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় অটো একটি বিকল্প জীবিকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। কিন্তু এই জনস্রোতের চাপ বহন করার মতো সক্ষমতা ঢাকার নেই। আবাসনসংকট, বস্তির বিস্তার, পানি ও পয়োনিষ্কাশন সমস্যার অবনতি সবকিছুই আরও তীব্র হচ্ছে। শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। এ ছাড়া এই অভিবাসনের ফলে গ্রাম তার কর্মক্ষম জনশক্তি হারাচ্ছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা জাতীয় উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এর ফলে কৃষিজমি হ্রাস ও খাদ্যঝুঁকি বাড়বে। গ্রাম থেকে মানুষ শহরে চলে আসার ফলে অনেক কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। যারা একসময় চাষাবাদ করত, তারা এখন শহরে এসে অটো চালানোর মতো পেশায় যুক্ত হচ্ছে। ফলে জমি পড়ে থাকছে কিংবা কম উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে শহর বিস্তারের কারণে কৃষিজমি ধীরে ধীরে বসতিতে পরিণত হচ্ছে। আবাসন প্রকল্প, অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ উর্বর জমিকে কংক্রিটে ঢেকে দিচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি। অটোর নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে প্রতিটি যানবাহন ও চালক সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। একটি ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করে কতসংখ্যক অটো চলছে, কোথায় চলছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ জরুরি। দ্বিতীয়ত নির্দিষ্ট রুট ও জোন নির্ধারণ করতে হবে। আবাসিক এলাকা বা ছোট সড়কে অটো চলতে পারলেও প্রধান সড়কগুলোতে তাদের প্রবেশ সীমিত করতে হবে। এতে ট্রাফিকব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তৃতীয়ত গণপরিবহনব্যবস্থা আধুনিক, নিরাপদ ও সহজলভ্য করতে হবে।
বাস সার্ভিস উন্নত করা, মেট্রোরেল ও অন্যান্য পরিবহন সম্প্রসারণ করা জরুরি, যাতে মানুষ বিকল্প পায় এবং অটোর ওপর নির্ভরতা কমে। চতুর্থত অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া কাউকে অটো চালাতে দেওয়া যাবে না। পঞ্চমত জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষকে হাঁটার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারার প্রতি উৎসাহিত করতে হবে।
♦ লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক