বিশ্বজুড়ে ক্যানসারের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। একসময় এ সংক্রামক রোগটি ছিল মানুষের প্রধান শত্রু। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে এখন চিত্র বদলে গেছে। হৃদরোগের পর বর্তমানে ক্যানসার মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে-কেন এই বৃদ্ধি? শুধু কি জীবনযাত্রার পরিবর্তনই দায়ী, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ কাজ করছে? দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা ক্যানসারের জন্য বেশ কিছু সুপরিচিত কারণকে দায়ী করে আসছেন। যেমন তামাক সেবন, বায়ু ও পরিবেশদূষণ, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা এবং মানসিক চাপ। এগুলো নিঃসন্দেহে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে প্রাকৃতিক নির্বাচনের পরিবর্তিত ভূমিকা। মানব ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে প্রাকৃতিক নির্বাচন একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা দুর্বল বৈশিষ্ট্য বা ক্ষতিকর জিনগুলো ধীরে ধীরে জনসংখ্যা থেকে বাদ পড়ে যায়। সহজভাবে বললে, এটি ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকা’ নিশ্চিত করে। কিন্তু আধুনিক সমাজে এ প্রক্রিয়াটি আগের মতো কার্যকর নেই।
গত দেড় শ বছরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার, টিকাদান কর্মসূচি, উন্নত সার্জারি এবং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির ফলে শিশুমৃত্যুহার কমেছে এবং মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক দেশে জন্মহার কমে গেছে। ফলে জনসংখ্যার গঠনে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে-মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকে। এ দীর্ঘায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি। কারণ ক্যানসার মূলত একটি বয়সভিত্তিক রোগ। যত বেশি সময় একজন মানুষ বেঁচে থাকে, তত বেশি সময় ধরে তার কোষ বিভাজন ঘটে এবং তত বেশি সুযোগ তৈরি হয় জিনগত ত্রুটি বা মিউটেশন সঞ্চিত হওয়ার। এই মিউটেশনগুলোর কিছু ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি নবজাতকের শরীরে গড়ে ৫০ থেকে ১০০টির মতো নতুন মিউটেশন থাকতে পারে। এগুলোর বেশির ভাগই ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু মিউটেশন ভবিষ্যতে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যেসব জিন কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোর পরিবর্তন হলে ক্যানসারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এখানেই আসে প্রাকৃতিক নির্বাচনের দুর্বলতার বিষয়টি। অতীতে যেসব জিনগত ত্রুটি মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমিয়ে দিত, সেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কমে যেত। কিন্তু এখন উন্নত চিকিৎসার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই ত্রুটিযুক্ত জিন বহনকারী ব্যক্তিরাও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন এবং সন্তান জন্ম দেন। ফলে এই জিনগুলো জনসংখ্যায় থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। এ ধারণাকে বলা হয় শিখিল প্রাকৃতিক নির্বাচন। এটি বোঝায় যে আধুনিক সমাজে প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ কমে গেছে। এর ফলে ক্ষতিকর জিনগুলো সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব হিসেবে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা একটি আকর্ষণীয় প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। যেসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত, আয়ু বেশি এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী সেসব দেশে ক্যানসারের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রথমে এটি বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে যুক্তি রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে, ফলে ক্যানসার হওয়ার সুযোগও বেশি থাকে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব কম থাকায় জিনগত ঝুঁকিও কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, ক্যানসার একটি বহুমাত্রিক রোগ। শুধু জিনগত পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী নয়, পরিবেশগত কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সব শেষে বলা যায়, ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান হার শুধু আধুনিক জীবনযাত্রার ফল নয়, এর সঙ্গে মানব বিবর্তনের সূক্ষ্ম পরিবর্তনও গভীরভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক নির্বাচনের দুর্বলতা, দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি এবং জিনগত মিউটেশনের সঞ্চয়-সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল চিত্র তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনাও অত্যন্ত জরুরি। মানুষ যেমন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে, তেমনি ক্যানসারের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথও আমাদেরই তৈরি করতে হবে-জ্ঞান, সচেতনতা এবং বিজ্ঞানের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে।
♦ লেখক : প্রাবন্ধিক