বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকা। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক-সব ক্ষেত্রেই তাদের আধিপত্য। বলতে গেলে, গোটা পৃথিবীটাই তারা শাসন করছে। এত ক্ষমতা, এত সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের রয়েছে আরও চাওয়া এবং পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা। ভেনেজুয়েলা করায়ত্ব করতে যতটা সহজ ছিল ইরানে সশস্ত্র হামলা তার চেয়ে যে অনেক কঠিন এবং জটিল তা তারা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছে।
২. ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে তিনি বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। যুদ্ধ, মহামারি বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী ভূমিকা রাখছেন, সমগ্র বিশ্বে তার অপরিসীম প্রভাব পড়ে। তাই তো ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনার জন্যই আজ বিশ্বজুড়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
৩. ২০১৬ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগানের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি প্রচারে বড় চমক দেখান ট্রাম্প। পপুলার ভোট কম পেলেও প্রয়োজনীয় ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নিশ্চিত করে হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করেন এবং ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময় তার এ অভূতপূর্ব সফলতা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছিল।
৪. ট্রাম্প কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জনগণের কাছে নতুন বিকল্প হিসেবে হাজির হন। সাধারণ ভোটারদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইলেকটোরাল কলেজ ভোট, যেখানে তিনি প্রয়োজনীয় ২৭০টি ভোটের বেশি নিশ্চিত করেন। তিনি সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ, বিশাল জনসভা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকর ব্যবহার করেন। অবৈধ অভিবাসন রোধ, বাণিজ্যনীতি এবং আমেরিকান কর্মসংস্থানের মতো সাধারণ মানুষের আবেগের বিষয়গুলোতে ফোকাস করেন, যা তার প্রচারকে অনন্য করে তুলেছিল। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২৪ সালে পুনরায় ইলেকটোরাল কলেজের ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো, ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
৫. ট্রাম্পের বর্ণিল জীবন। ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন নিউইয়র্কের আবাসন ব্যবসায়ী। ট্রাম্প ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত প্রকৃতির। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে মার্কিন সমাজে একজন ধনকুবের হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটে ব্যবসাবাণিজ্য ও শোবিজ নিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনবার বিয়ে করেন। পাঁচ সন্তানের জনক। আগের দুজনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তৃতীয় বিয়ে করেন। সেই স্ত্রী মডেল মেলানিয়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি।
৬. অভিবাসী, নারী, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তীব্রভাবে সমালোচিত ও বিতর্কিত হন ট্রাম্প। তার বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ ও যৌন হয়রানি, এমনকি ধর্ষণের অভিযোগও ওঠে। এত কিছুর পরও দ্বিতীয়বারের মতো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
৭. যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যে কতটা দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, তা আমেরিকায় সোনালি এক্সচেঞ্জে কাজ করার সুবাদে বুঝতে পারি। ইলেকটোরাল কলেজ ভোট বা পপুলার ভোট কী এবং কীভাবে গুরুত্ব বহন করে বা ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ কাকে বলে, এসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
৮. প্রতি চার বছর পরপর আমেরিকায় নির্বাচন হয়ে থাকে। নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পর যে মঙ্গলবার, সেদিনই ভোট গ্রহণ হয়। সব সময় এভাবেই নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়ে আসছে। সেই হিসাবে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের ৫ তারিখ ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে দেশটির সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হতে পারেন না। সেই হিসাবে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৮ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে।
৯. যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে, এর ফলাফল কী হবে তা নিয়ে সারা বিশ্বে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে, বিশ্ববাসীর উৎকণ্ঠা যেন ততই বেড়ে যায়। প্রার্থীরা মূল ভোটের অনেক আগে থেকেই তহবিল সংগ্রহ, দলীয় সমর্থন নিশ্চিত করা এবং জনমত জরিপে এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় নামেন যা দীর্ঘ প্রচারণার মূল কারণ।
১০. যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এখানে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রভাবশালী দল মাত্র দুটি-রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট। সাধারণত এই দুটি দলের যেকোনো একটি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসেন। অবশ্য ছোট ছোট কিছু রাজনৈতিক দল যেমন লিবার্টারিয়ান, ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি, তারাও কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী মনোনয়ন করে। রিপাবলিকান পার্টি একটি রক্ষণশীল দল হিসেবে পরিচিত। এ দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্রাহাম লিংকন ও জর্জ ডব্লিউ বুশ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট দল তুলনামূলকভাবে একটি উদার রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। উল্লেখযোগ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন জন এফ কেনেডি, বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা।
১১. আমেরিকা গোটা বিশ্বের কাছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃত। গণতন্ত্রের পুরোধা, ঐতিহ্যের প্রতীক, গর্বিত মুরুব্বি আর উপদেশদাতা। আর সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দেশটির নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। তিনি নির্বাচিত হন ইলেকটোরদের ভোটে। সাধারণ নাগরিকরা ইলেকটোরদের নির্বাচন করেন।
১২. যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের মোট আসনসংখ্যা ৫৩৮টি। এ নির্বাচনে বিজয়ী হতে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেকটোরাল আসন অর্জন করতে হয়। প্রতিটি রাজ্যের জন্য ইলেকটোরাল আসনসংখ্যা রাজ্যটির জন্য বরাদ্দ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসনসংখ্যার সমান। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট গণনাপদ্ধতি দুটি। একটি হলো মাথাপিছু ভোট, যাকে বলে পপুলার ভোট। অন্যটি হলো রাজ্যভিত্তিক ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, মার্কিন গণতন্ত্রে পপুলার ভোটের চেয়ে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সর্বাধিক পপুলার ভোট অর্জন করলেও, তা তাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট (২৭০) অর্জন করতে সক্ষম হলেই প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চিত।
১৩. উল্লেখ ২০০০ সালে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী আল-গোর ওই সময়ে সর্বাধিক পপুলার ভোট পেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে পারেননি। কারণ তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের জর্জ বুশ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়েছিলেন ২৭১টি। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১টি বেশি। আর এতেই তিনি আল-গোরকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। ২০১৬ সালেও যা হয়েছিল, হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের চেয়ে ৩০ লাখ পপুলার ভোট বেশি পেলেও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ট্রাম্প মোট ৩০৪টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পান, যা ছিল হিলারি ক্লিনটনের পাওয়া ২২৭টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের চেয়ে অনেক বেশি।
১৪. যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত ভাষা দুটি। একটি ইংরেজি অন্যটি স্প্যানিশ। বহু ভাষা, বহু জাতি, বহু ধর্ম এবং বহু বর্ণের সংমিশ্রণে যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি। এত ভাষাভাষীর দেশ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তাই একে ‘ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্ট’ বলা হয়। বিশ্বের এই বহুজাতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই এই বিশেষ পদ্ধতি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের অন্তর্ভুক্তি।
১৫. প্রেসিডেন্ট ৪ বছর, সিনেটর ৬ বছর এবং কংগ্রেসম্যান ২ বছর মেয়াদে নির্বাচিত হন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে দুটি করে মোট ১০০টি সিনেটর পদ। সিনেটর পদ নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু কংগ্রেসম্যান পদ জনসংখ্যাভিত্তিক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে আনুপাতিক হারে কংগ্রেসম্যান বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে গোটা আমেরিকায় ৪৩৫টি কংগ্রেসম্যান পদ এবং ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে। এই ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট মানেই ১০০ সিনেটর এবং ৪৩৫ জন কংগ্রেসম্যান। উল্লেখ্য, ৩টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট ওয়াশিংটন ডিসি থেকে নির্ধারিত হয়।
১৬. পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিশ্বের সব দেশের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নির্বাচনের ফল পরবর্তী চার বছর বিশ্বের সব দেশেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কমবেশি প্রভাব ফেলে। তবু আমেরিকার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে। আজকের আমেরিকার উন্নয়নে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সব অভিবাসীরই বিন্দু বিন্দু শ্রম, ঘাম ও যথেষ্ট ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে-এ কথা অনস্বীকার্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুধু নিজের দেশের নয় গোটা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তার গতিশীল নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নিরবচ্ছিন্ন শান্তি কামনা করে বিশ্ববাসী।
♦ লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক