বিএনপিকে বলা হয় গণমানুষের দল। এই গণমানুষের মধ্যে বেশির ভাগই শ্রমিক শ্রেণি। খুব সম্ভবত বিএনপিই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যার প্রতিষ্ঠাতা একজন উর্দি পরা জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ দলটিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের রাজনৈতিক মুক্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করে। যাত্রা শুরুর পর থেকেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেসব উদ্যোগ, কর্মসূচি নিয়েছেন তার সবই ছিল গণমুখী। সমাজের অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া মানুষকে সামনে এগিয়ে নিতে তাঁর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ছিল। তাঁর অল্প সময়ের শাসনামলে শ্রমিক কল্যাণে যেসব কর্মসূচি নেওয়া হয়, তা ছিল সত্যিই অভাবনীয়।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ১৯৮০ সালে ঢাকায় বিশাল পরিসরে শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। যেই সমাবেশে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজেকে একজন শ্রমিক হিসেবে ঘোষণা করেন। সামরিক ব্যারাকে দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন সৈনিক দেশের প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি মূলত মানুষের সেবক, এ কথা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। ওই সমাবেশে তাঁর ভাষণ শ্রমিকদের নতুন করে উজ্জীবিত করেছিল দেশপ্রেমে। তাঁরা বুঝতে পারেন শ্রমিক কোনো অবহেলিত জনগোষ্ঠী নয়, বরং তাঁরা দেশ গড়ার অংশীজন। তাঁদের শ্রমে-ঘামেই একটি দেশ এগিয়ে যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। শ্রমিক সমাবেশে দেওয়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাষণের মূল সুর ছিল উৎপাদন বৃদ্ধি, কঠোর পরিশ্রম এবং জাতীয়তাবাদ। তিনি শ্রমিকদের ‘উৎপাদনমুখী’ হওয়ার এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন কর্মে। ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদানকে তিনি যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ শ্রমিক। তাঁদের পিছিয়ে রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই। বাস্তবে কখনোই সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি তাঁদের উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একীভূত করেছিলেন। তিনি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতেন। তিনি শ্রমিকদের বলতেন, ‘খাল কেটে পানি আনো, উৎপাদন বাড়াও’। তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘কর্মমুখর জাতি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং শ্রমিকদের অলসতা পরিহার করে উৎপাদনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর কাছে কাজই হলো স্বনির্ভরতার চাবিকাঠি। আর স্বনির্ভর কোনো জাতি কারও গোলামি পছন্দ করে না। তাদের ভিতর দেশপ্রেমের তেজ থাকে। তারা হয় স্বাধীনচেতা। প্রেসিডেন্ট জিয়া খুব ভালো করেই জানতেন, শ্রমিক হলো মালিক শ্রেণির উন্নয়ন সহযোগী। এই দুয়ের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক কখনোই ভালো ফল দেবে না। তাই তিনি শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিল্প ক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। কলকারখানায় শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি তিনি মালিকপক্ষের জন্য ব্যবসার অনুকূল পরিবেশও বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর দীর্ঘ ভাষণে শ্রমিকদের জন্য বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের ভিতরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন বোঝানোর চেষ্টা ছিল। কেননা তিনি মনে করতেন, শ্রমিকদের ভিতর যদি সত্যিকারের দেশপ্রেম না থাকে, তাহলে দেশের উন্নয়ন-উৎপাদন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাবে না।
একইভাবে তিনি ওই বছরের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক মুক্তি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তাঁর এই সময়কার ভাষণগুলো মূলত দেশের উন্নয়ন, উৎপাদন এবং শ্রমিকদের অধিকার ও দায়িত্বের ওপর আলোকপাত করত। শহীদ জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, তাঁদের অবস্থার উন্নতি এবং শ্রমিক-মালিকের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদতের পর বিএনপি দুটি পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। এই সময় তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া দেশের হাল ধরেন। শ্রমিক সুরক্ষায় তাঁর আমলে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আসে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ২০০৬ সালে সমন্বিত ‘বাংলাদেশ লেবার কোড’ প্রণয়ন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন, পোশাকশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ ছিল অন্যতম। এ ছাড়া শিল্প খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়ার পাশাপাশি নারীশ্রমিকদের ক্ষমতায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় খালেদা জিয়ার সরকার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি ও শিক্ষার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে নারীশ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। বর্তমান বাংলাদেশে নারীদের যে অগ্রগতি, তার ভিত তখনই গঠিত হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১২ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার। তাঁদের মধ্যে শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার। মোট শ্রমশক্তির ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। যার সংখ্যা ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার। অর্থাৎ এ বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় না। শ্রমিক হিসেবে তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। কোনো রকম আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নেই। কর্মস্থলের পরিচয়পত্র নেই। কাজের ক্ষেত্রে অন্যায়ের শিকার হলে তাঁদের শ্রম আদালতে মামলা করার সুযোগও নেই। স্বাধীনতার সুদীর্ঘকাল পরে এসে দেশের শ্রমিকদের জীবনমানের এই চিত্র সত্যিই আমাদের আশাহত করে। যাঁদের শ্রমে-ঘামে একটি দেশ টিকে থাকে, তাঁদের বঞ্চনার এমন কালশিটে রেকর্ড আমাদের জন্য লজ্জার। বিএনপি তার রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার মধ্যে শ্রমিকের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ১৬ নম্বর দফায় বিএনপি বলছে, ‘মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। শিশুশ্রম বন্ধ করে তাদের জীবন বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা হবে। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন, মর্যাদা ও কর্মের নিরাপত্তা এবং দেশে বিমানবন্দরসহ সব ক্ষেত্রে হয়রানিমুক্ত সেবাপ্রাপ্তি ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে। চা-বাগান, বস্তি, চরাঞ্চল, হাওড়-বাঁওড়, মঙ্গাপীড়িত ও উপকূলীয় অঞ্চলের বৈষম্য দূরীকরণ ও সুষম উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
উৎপাদন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর উৎপাদনের মূল হাতিয়ার হলো শ্রমজীবী মানুষ। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, হাসিনার দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে এ দেশের শ্রমিক শ্রেণি কীভাবে নিষ্পেষিত হয়েছে। কৃষি থেকে শিল্প-সবখানেই শ্রমিকরা ছিলেন নিগৃহীত। তাঁদের শ্রম আছে কিন্তু সম্মান নেই। তাঁদের ঘামে দেশ এগিয়ে যায় কিন্তু তাঁরা থাকেন পিছিয়ে। এমন বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অতিষ্ঠ শ্রমিকরাও ছিলেন সেই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁদের অকুতোভয় হুংকার সেদিন গণহত্যাকারী হাসিনাশাহির পতন ঘটিয়েছে। রাজপথে অসংখ্য শ্রমজীবী জীবন দিয়েছেন। হাজার হাজার শ্রমজীবী এখনো পঙ্গু-কর্মহীন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শ্রমজীবী মানুষের বিপুল সমর্থন ছিল। কেননা তাঁরা মনে করেন, বিএনপিই সত্যিকারভাবে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার দল। তাই দেশ ও দশের ভাগ্যের পরিবর্তনের দুর্বার আকাক্সক্ষা নিয়ে তাঁরা বিএনপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছেন। বিএনপি শ্রমজীবী মানুষের এই সমর্থনকে সম্মান জানায়। তাঁরা যে আকাক্সক্ষা নিয়ে দলটিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করেছেন, আঙুলে ভোটের চিহ্ন মোচনের আগেই সেই আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ শুরু করেছে সরকার। দেশব্যাপী খাল খনন ও সংস্কার থেকে শুরু করে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। এসবই মূলত শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। যদিও আরও চমক সামনে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে তার সবই এখন প্রকাশ্যে না এলেও সামনের দিনগুলোতে আসবে-এটা জাতি বিশ্বাস করে। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরাধিকার তারেক রহমান সরকারের কাছে জনগণের এই প্রত্যাশা অমূলক কিছু নয়, বরং একেবারেই যৌক্তিক।
♦ লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়