সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের মনে রাখা দরকার যে ‘মানুষ’ শব্দটির ভিতরেই একধরনের অসম্পূর্ণতার স্বীকারোক্তি নিহিত আছে। সীমাবদ্ধতার এই শব্দগত ও অর্থগত প্রকাশ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক সত্য নয়; বরং এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিজাতও বটে। তবু আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতার একটি মৌলিক সংকট হলো, আমরা মানুষকে তার স্বাভাবিক মানবিক পরিমণ্ডলে দেখতে অনাগ্রহী। নিজেদের প্রয়োজনে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দেবতা কিংবা অন্তত ফেরেশতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত দেখতে অথবা প্রতিষ্ঠা করতে চাই আমরা। এই অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অবাস্তব প্রত্যাশা পরবর্তী সময়ে অনিবার্যভাবে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম দেয় হতাশা, বিভ্রান্তি এবং একধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ চরিত্রহননের প্রবণতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ‘আদর্শায়ন-অবমূল্যায়ন চক্র’ (আইডিয়েলাইজেশন-ডিভেলুয়েশ সাইকেল)-এর একটি সামাজিক রূপ যেখানে কাউকে অস্বাভাবিক উচ্চতায় তুলে ধরার পরই তাকে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে তীব্রভাবে নিচে নামিয়ে আনার প্রবণতা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ তার সীমাবদ্ধতা, দোষত্রুটি এবং অভ্যন্তরীণ মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব নিয়েই জন্মায়, বেড়ে ওঠে এবং একসময় অনন্তে বিলীন হয়। ফলে একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ত্রুটিহীনতার ভ্রান্ত ধারণায় নয়; বরং ব্যক্তি হিসেবে তার মনুষ্যত্বে তথা মানবিকতা, নৈতিক সংবেদন এবং যাপিত জীবনের বাস্তব প্রেক্ষাপটে আদর্শিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সক্ষমতায় নির্ধারিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে বিচার করতে হলে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীবদ্ধ আবেগ নয় বরং বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির আলোকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বিচার-বিশ্লেষণ করাটা জরুরি। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৫ সালের কোনো এক সময়ে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে যাওয়ার এবং তাঁকে ব্যক্তি হিসেবে খুবই কাছ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একদিকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশের সুযোগ হয়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রের সম্প্রসারণের কাজে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষকে দূর থেকে দেখা এবং ঘনিষ্ঠভাবে জানার অভিজ্ঞতা এক নয়; নৈকট্য মানুষের চরিত্রের জটিলতাকে অনুবীক্ষণিক মাপকাঠিতে গবেষকের দৃষ্টিতে উন্মোচন করে। খুব কাছ থেকে একজন মানুষকে দেখলে তার মানবিক দুর্বলতা যেমন অতিসহজেই স্পষ্ট ধরা পড়ে, তেমনি তার শক্তি, সক্ষমতা, স্বাতন্ত্র্য এবং অন্তর্নিহিত বৌদ্ধিক জগতও উন্মোচিত হয়। জীবন-পাঠশালার একজন জীবনভর শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক না হলেও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাগুরু। তাঁকে কেবল ভক্ত বা অনুরক্ত হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানীয় উন্মেষের আন্দোলনে একধরনের সহযোদ্ধা হিসেবে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতাগুলো কখনো আমার কাছে বিস্ময়ের কারণ হয়ে ওঠেনি; বরং তাঁর চিন্তার গভীরতা, মানবিকবোধের বিশ্লেষণী শক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং তাঁর প্রতি আমার মনের গভীরে এক বৌদ্ধিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছে।
আমার নিজের বেড়ে ওঠার পরিমণ্ডল, বিশেষত পারিবারিক পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক সামাজিক বাস্তবতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক আবহ আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। বিশেষ করে আমাকে সুযোগ দিয়েছিল স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, প্রশ্ন তোলা এবং ভিন্নতাকে ধারণ করার মতো উদারনৈতিক চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ ও লালন করার সক্ষমতা অর্জনের। এই শিক্ষার মৌলিক ভিত্তির পেছনে যেমন পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের ভূমিকা ছিল, তেমনি কিছু অনন্য শিক্ষকের সান্নিধ্য তথা তাঁদের চরিত্রের মানবিকতা, নৈতিকতা, উদারতাসহ শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রতি স্নেহাশীষ ছিল অনস্বীকার্য। তাঁরা আমাকে জীবনের নানা দিক চিনতে, বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছেন, কিন্তু কখনোই তাঁদের পথ অনুসরণ করতে বাধ্য করেননি যা একধরনের গভীর শিক্ষাদর্শের পরিচায়ক, যেখানে অনুকরণ নয়, বরং আত্ম-অন্বেষণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। দর্শনের ভাষায়, এটি হলো ‘বৌদ্ধিক স্বায়ত্তশাসন’ (ইন্টালেকচুয়াল অটোনমি)-এর বিকাশ। এই স্বাধীনতাকে মনেপ্রাণে-বিশ্বাসে ধারণ করতে পেরেই আমি জীবনভর নিজের মতো করে একটি বিবর্তনশীল মানস গঠনের পথে এগোতে পেরেছি। ফলে জীবন চলার পথে কারও সঙ্গে চেতনা, বিশ্বাস কিংবা আচরণগত ভিন্নতা কখনো বিরূপতার তথা বিরক্তি, বিদ্বেষ কিংবা অশ্রদ্ধার জন্ম দেয়নি; বরং সেটা আমার মাঝে সহনশীলতা বৃদ্ধি ও বহুত্ববাদের চর্চাকে আরও দৃঢ় করেছে। এই পটভূমিই আমাকে ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পরিবেশে বিচরণ করার সাহস, ধৈর্য, ঐকান্তিকতা ও অভিযোজনক্ষমতা প্রদান করেছে যেখানে ব্যক্তিত্ব, জীবনদর্শন, বিশ্বাস, মতামত ও যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যের মধ্যেও শ্রদ্ধাশীল বৌদ্ধিক।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, একজন ব্যক্তি মানুষ কোনো একক সূত্রে নির্মিত সত্তা নয়; বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির দীর্ঘ এক জটিল প্রবাহের সঙ্গে তার জৈবিক উত্তরাধিকার, আবেগিক অভিজ্ঞতা এবং সময়গত (টেম্পোরাল) বাস্তবতার বহুমাত্রিক মিথস্ক্রিয়ায় তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। ফলে মানুষের চরিত্র কখনোই সরলরৈখিক নয়; এটি জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং প্রায়শই পরস্পরবিরোধী মনোজাগতিক টানাপড়েনের ভিতর দিয়েই বিকশিত হয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, নিজের ভিতরে নিজের সঙ্গে নিজের এই দ্বন্দ্ব এবং মনোজাগতিক আলোড়নই ব্যক্তিসত্তাকে স্থবিরতা থেকে মুক্ত রেখে ক্রমাগত অগ্রগতির দিকে ঠেলে দেয় যেখানে ‘সাফল্য’ কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং ‘অগ্রসর হওয়া’ই মূল বিষয় এবং বেঁচে থাকার প্রেরণা। সেটাকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দার্শনিকতামণ্ডিত করেছেন, ‘গতিতে জীবন মম, স্থিতিতে মরণ’ বলে। এই ক্রমবিকাশমান বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির সংবেদনশীলতায় পৌঁছানোর পর আমি উপলব্ধি করেছি যে আমার ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এমনকি ‘জিন’ নামক জৈবিক উত্তরাধিকারের মধ্যেও একটি বহু বর্ণিল জীবনবোধের অন্তঃসলিলা প্রবাহিত। এই উপলব্ধিই আমাকে ‘খোলা চোখে জগৎ দেখার’ অভ্যাসে অভ্যস্ত করেছে। ফলে আমি কখনো কারও অন্ধ অনুসারী বা পদলেহনে অভ্যস্ত ভক্তে কিংবা অনুরক্তে পরিণত হইনি। আবার সমসাময়িক বাস্তবতার চলমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো নির্বিকার দর্শকও হয়ে উঠিনি। বরং জীবন চলার পথে দূরত্ব ও সম্পৃক্ততার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যেও নিজের অবস্থান নির্মাণের চেষ্টা করেছি।
এই ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক যাত্রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা, সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাববলয় থেকে অনুসন্ধিৎসু সমালোচনামূলক পর্যালোচনায় বিশেষ দূরত্ব তৈরি করার ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নির্মেদ ও প্রখর লেখাটি আমার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আর বোধ-বুদ্ধি-উপলব্ধির এই অবস্থান্তরটাই আমার বৌদ্ধিক উত্তরণে বিশেষ সহায়ক হয়েছে। এখানে ‘উত্তরণ’ বলতে প্রভাবমুক্ত হয়ে যাওয়া নয়, বরং প্রভাবকে সচেতনভাবে আত্মস্থ ও পুনর্মূল্যায়নের ক্ষমতা অর্জন করা যা যেকোনো মুক্ত বৌদ্ধিক চর্চার মৌলিক পূর্বশর্ত। প্রাকযৌবনের সুফি দর্শনের প্রভাবও এখানে চেতনাগত উন্মেষে সহায়ক হয়েছিল। নৌকা যেমন পানিতে ভেসে থাকে কিন্তু পানির সঙ্গে একীভূত হয় না, তেমনি একধরনের ‘মধ্যবর্তী অবস্থান’ (নোম্যান্স ল্যান্ড) থেকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের চিন্তার জগতের প্রভাববলয়ে ভিতরে ও বাইরে থেকে আমি আমার নিজস্ব বৌদ্ধিক পথচলাকে এগিয়ে নিয়েছি, আমি আমার নিজস্ব পথ নির্মাণের চেষ্টা করেছি। সেটা ছিল অনেকটা লাটিমের মতোই নিজ অক্ষে প্রাগ্রসরমান অনির্ধারিত কক্ষপথে বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির নিত্যনতুন জাগরণকে আলিঙ্গন করে। সমাজতাত্ত্বিক ভাষায়, এটিকে বলা যায় ‘সমালোচনামূলক নৈকট্য’ (ক্রিটিক্যাল প্রোক্সিমিটি) যেখানে নৈকট্য ও দূরত্ব একে অপরকে বাতিল না করে বরং সমর্থন করে, তথা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই ভারসাম্যই আমাকে তাঁকে একজন মানুষ হিসেবে, তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের নানা জটিলতা, সীমাবদ্ধতা, দ্বন্দ্ব, সম্ভাবনা ও শক্তির সম্মিলিত আলোকে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে।
ক্ষুদ্র পরিসরের যাপিত জীবনের আলোকে সব কথা এখানে বলা সম্ভব নয়; তবে একটি বিষয় এখানে অনিবার্যভাবে বলা যায় যে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো সূক্ষ্ম বিষকণা যেমন মানুষের ফুসফুসে অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করে, তেমনি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অবিরাম বিষোদ্গারও একটি জাতির সামষ্টিক মনস্তত্ত্বকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিচরিত্রের প্রকৃতি, কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কের নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; বরং একটি সমাজের বৌদ্ধিক স্বাস্থ্য ও নৈতিক পরিমণ্ডলের ওপরও আঘাত। সুতরাং আমাদের সময়কার একজন শক্তিমান মানবিক ব্যক্তিত্বকে চলমান রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা কেবল ব্যক্তিপ্রীতি বা আনুগত্যের প্রশ্ন নয়; এটি একধরনের বৌদ্ধিক, মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা।
♦ লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য