শিক্ষা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এটি শুধু একটি প্রচলিত কোনো কথা নয় বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষাও। ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান বা এলমে কেবল পার্থিব উন্নতির মাধ্যম নয় বরং এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অন্যতম প্রধান উপায়। তাই ইসলাম জ্ঞান শিক্ষাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে এবং এটিকে মানবজীবনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল ‘ইকরা’ বা ‘পড়’। সুরা আলাকের প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (সুরা আলাকম, আয়াত ১)।’ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই নির্দেশনার মাধ্যমেই মানবসভ্যতার জ্ঞানযাত্রার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলি সমাজ অল্প সময়ের মধ্যে একটি আলোকিত, সভ্য ও নেতৃত্বদানকারী জাতিতে পরিণত হয়েছিল। যা ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে সুশিক্ষা একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না-তারা কি সমান? (সুরা জুমার, আয়াত ৯)।’ অর্থাৎ জানলেওয়ালা আর জানে না এমন ব্যক্তি, পড়নেওয়ালা আর পড়ে না এমন ব্যক্তি, আলেম আর এলেম নেই এমন ব্যক্তি কখনোই সমান হতে পারে না। তাদের দুজনের পার্থক্য আকাশ আর পাতালের মতো। একটি হাদিসে এমনটি বর্ণিত হয়েছে, রসুল (সা.) দুটি মজলিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটি জিকিরের মজলিস। অন্যটি এলেম চর্চার মজলিস। নবীজি (সা.) বলেন, ‘দুটি মজলিসই ভালো। তবে আমি এলেম চর্চার মজলিসের দলে।’ এই বলে তিনি জ্ঞান চর্চার মজলিসে বসে পড়লেন। এলেমের মর্যাদা এত বেশি কেন এ প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং কোরআন দিয়েছে। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে তারাই ভয় করে, যারা জ্ঞানী।’ (সুরা ফাতির, আয়াত ২৮) অর্থাৎ যার ভিতর জ্ঞানের আলো আছে, সে খোদাকে চিনতে পারে। সৃষ্টিরাজ্যের প্রতি পরতে পরতে সে খোদার নিপুণ সৌন্দর্য ও রবুবিয়াতের অপার মহিমার প্রমাণ পায়।
কোরআনের এসব আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে প্রকৃত জ্ঞান শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী করে, তার অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে এবং তাকে দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৪।)’ অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথ অনুসরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯)।’ নবীজি (সা.)-এর এসব বাণী থেকে বোঝা যায়, শিক্ষা গ্রহণ কোনো বিলাসিতা কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়; এটি প্রতিটি মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব। বদর যুদ্ধের বন্দিদের শিক্ষাদানের বিনিময়ে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাও ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ। বিষয়টি এমন যে মুসলমানদের হাতে কাফেররা বন্দি হয়। নবীজি (সা.) কাফের বন্দিদের বললেন, তোমরা মোটা মুক্তিপণের বিনিময় বন্দিত্বের জীবন থেকে আজাদির জীবনের স্বাদ নিতে পারবে। অথবা তোমাদের মধ্যে যারা লেখাপড়া জানো, তোমরা যদি আমার একজন সাহাবিকে জ্ঞানের আলো দিতে পার, তাহলে তোমরা বিনা পণে মুক্তি পেয়ে যাবে। (সিরাতে ইবনে হিশাম) এ ঘটনা থেকে এটাও বোঝা যায়, জ্ঞান অর্জনের জন্য ধর্মবর্ণ-মাজহাব-গোত্র কোনো বাধা হতে পারে না। যার কাছেই জ্ঞানের সম্পদ আছে, তার থেকেই তা অর্জন করতে হবে।
সুশিক্ষা মানুষের জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং তাকে সঠিক-ভুলের পার্থক্য নির্ণয়ে সক্ষম করে। এই সুশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে পরিবার, বিশেষ করে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর (সুরা তাহরিম, আয়াত ৬)।’ এই আয়াত আমাদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহার, নৈতিক অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতির প্রভাবে অনেক তরুণ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে, যা আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাই কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং উত্তম চরিত্র গঠনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। ইসলাম শুধু দীনি শিক্ষার ওপরই জোর দেয় না; বরং মানুষের কল্যাণে উপকারী সব জ্ঞান অর্জনকে উৎসাহিত করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন (সুরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৪)।’ এই দোয়া থেকেই বোঝা যায়, জ্ঞান বৃদ্ধির কোনো সীমা নেই এবং এটি একজন মুমিনের অব্যাহত সাধনা। পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে সুশিক্ষা হলো মানুষ গড়ার মূল ভিত্তি এবং একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান হাতিয়ার।
♦ লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, ভবেরচর, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ