বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও জনসংস্কৃতির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কোন সরকারের আমলে? এরকম একটি নেতিবাচক ও বেয়াড়া প্রশ্ন করা হলে দেশের বেশির ভাগ মানুষ আমতা আমতা করবে। সত্য কথা বলার মতো লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। মোটা দাগে দেশের জনমত সোজা দুভাগে বিভক্ত। নিরপেক্ষতার ভান করা সুশীলরাও চূড়ান্ত বিচারে নিদারুণভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। এনজিওবেইজড সুশীলদের প্রায় সবাই রাজনীতি ও গণতন্ত্রের কৌশলগত প্রতিপক্ষ। এদের মুখোশ নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে। তারা সংস্কারের নামে বিরাজনীতিকরণের রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিল। সংস্কারের সস্তা সেøাগান দিয়েছিল। রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটানোর নাম করে হাজির করা হয়েছিল মাইনাস টু ফর্মুলা। রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রহননের জন্য নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল। ধরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের অডিও-ভিডিও নিজেরাই সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়ে প্রচার-প্রকাশের হুকুম জারি হতো, যাতে ভয়ে রাজনৈতিক সমাজের বেশির ভাগই ট্রমাটাইজড হয়ে নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশ ধারণ করে রাতারাতি হয়ে ওঠেন বিরাট সংস্কারবাদী। টেলিভিশনের টক শোগুলো সেই সময়ে এনজিওসংশ্লিষ্ট সুশীলদের চারণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিদেশি ডোনারদের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন থিংকট্যাংকের মোড়ল, একই রঙের পালকশোভিত একশ্রেণির সম্পাদক-সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী। এদের বলা যায়, বার্ডস অব সেইম ফক। এরা অবিলম্বে হয়ে ওঠেন সেলিব্রেটি টকার ও কলাম লেখক। চিহ্নিত একটি পত্রিকাগোষ্ঠী ওই শ্রেণিটিকে কলামিস্ট রূপে এমনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করে যে ওদের অপিনিয়ন ছাড়া যেন বা পৃথিবী অচল। পত্রিকার সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে ঠুনকো কাচের মতো। পেশাদার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লেখক সাংবাদিক শ্রেণিটি হয়ে পড়ে অপাঙ্ক্তেয় ও অচ্ছুত; এরা কিছুই জানে না। পক্ষান্তরে ননপ্রফেশনাল সুশীলরা হয়ে ওঠেন একেকটি গগনস্পর্শী জ্ঞানবৃক্ষ; জ্ঞানের ওয়ার্কশপ। অনেকে রগড় করে বলেন ডেভিলস্ ওয়ার্কশপ। ফলে সংবাদপত্রের বিকাশপর্বটি মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে নতুন করে আর আবুল মনসুর আহমদ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মুজিবুর রহমান খাঁ, রণেশ দাশগুপ্ত, জহুর হোসেন চৌধুরী, খন্দকার আবদুল হামিদ, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ গওহর, ভারতের খুশবন্ত সিং, কুলদীপ নায়ার বা এম জে আকবরের মতো সাহসী সম্পাদক-কলামিস্ট তৈরি হয়নি।
এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির। তবে সেই সময়ে একটি ভালো কাজও হয়েছে। সেটি হলো এনআইডি কার্ড প্রকল্পের বাস্তবায়ন। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে মনে করেন ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই। ভারতীয় গণমাধ্যমেও তখন সেরকম ধারণা প্রচার করা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ ভারত সফরে যান। সেই সফরের সময় ভারতের সেনাপ্রধান দীপক কাপুর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘সৌহার্দের নিদর্শন’ হিসেবে ছয়টি ঘোড়া উপহার দেন।
ঘোড়াগুলোর মধ্যে ছিল দুটি স্ট্যালিয়ন (পুরুষ প্রজনন ঘোড়া) ও চারটি মাদি ঘোড়া। তবে ঘটনাটি শুধু ‘উপহার’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এটি ব্যাপক আলোচিত হয়। কারণ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থার পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি ছিল সেনাসমর্থিত। সেই সময় ভারত ও বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এই উপহার দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক জোরদার ও সহযোগিতা বাড়ানোর কূটনৈতিক প্রয়াসের অংশ। পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ‘ভারতের দেওয়া ছয় ঘোড়া’ একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। সমালোচকরা এটিকে তৎকালীন সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
ওয়ান-ইলেভেনের ১৮ বছর পর ভিন্নরূপে ২০২৪ সালের আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেন। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নীতি গ্রহণ করেছিল বলে পর্যবেক্ষক মহল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তার সারকামস্টেনশিয়াল অনেক প্রমাণও রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সরকার বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে বাংলাদেশকে রাজনীতি ও গণতন্ত্রবিহীন একটি বন্ধ্যা দেশে পরিণত করতে চেয়েছিল।
ইউনূস সরকারের মিশনও ছিল অভিন্ন, যদিও পথ আলাদা। ড. ইউনূসের ইন্টেরিম সরকার ও তাঁর সহযোগী রাজনৈতিক শক্তির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ ও অর্থহীন প্রমাণিত করা। সত্য বটে, স্বাধীনতা-উত্তর সব সরকারের আমলেই বাংলাদেশের অন্তর্মূলে কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে ওয়ান-ইলেভেন ও ইন্টেরিমের করা ক্ষতির সঙ্গে সেগুলোর পার্থক্য রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেন ও ’২৪ সালের ক্ষতির মতো অন্য কোনো সরকারের সাধিত ক্ষতি পরিকল্পিত ছিল না। দেশের ক্ষতি যা হয়েছে, তা ওই সব সরকারের কৌশলগত ভ্রান্তির কারণে হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির কারণে নেওয়া সরকারের কৌশল আখেরে দেশের ক্ষতি ডেকে এনেছে। ১৯৭২ সালের শাসনতন্ত্রে যে চারটি মূলমন্ত্র গ্রহণ করা হয় তার দুটি হলো গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ শাসন গণতান্ত্রিক হলেও অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক। শেখ মুজিবের মনে চিন্তাটি দানা পাকিয়েছিল ১৯৫৭ সালে তিনি যখন নয়াচীন সফরে গিয়েছিলেন। চীনের যৌথ খামারের উৎপাদনব্যবস্থা, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃৃঙ্খলা দেখে তিনি খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সে দেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের তরুণ নেতাকে হতাশ করেছিল। তিনি ভেবেছিলেন এহেন উৎপাদনব্যবস্থা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে গণতন্ত্র থাকলে কতই না ভালো হতো। এই কথাগুলো তিনি তাঁর নিজের ভাষায় ব্যক্ত করেন, আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থে। সম্ভবত সেই চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল বাংলাদেশের সংবিধানে। কিন্তু বাস্তবে তিনি সেটা করে দেখাতে পারেননি। সব দল নিষিদ্ধ করে এবং চারটি বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি গণতন্ত্র রক্ষা করা সোনার পাথরবাটির মতো অসম্ভব ছিল। পরিণতি কী হয়েছিল তা সবারই জানা। গণতন্ত্রের মসৃণ পথটি হয়ে উঠেছিল বন্ধুর-দুর্গম।
পঁচাত্তর-পরবর্তী জিয়াউর রহমানের আমলে পিপিআরের অধীনে পুরোনো দলগুলো পুনর্জন্ম লাভ করে। বিএনপি গঠনের সময় হয়তো রিকনসিলেয়েশনের কথা মাথায় রেখে একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন তাদের অনেককে কাছে টেনে নেওয়া হয়। সেই নীতিকৌশলে দেশের কতখানি ক্ষতি-লাভ হয়েছে তা বিচারবিশ্লেষণের বিষয়। এরশাদ জমানায় যোগাযোগব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। গুচ্ছগ্রাম করে এরশাদ বাস্তুহারাদের আবাসন সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছিলেন। তাঁর সময়েই উপজেলাব্যবস্থা চালু হয়, যা এখনো টিকে আছে। কিন্তু মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির। ডিগবাজি ও তেলমারা রাজনীতি তখন শিল্পের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল থেকে হঠাৎ দৌড় দিয়ে পুলিশের গাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার মতো নাটকও তখন মঞ্চস্থ হয়েছিল। ওই দিন মিছিল থেকে পালিয়ে যাওয়া লোকটি এরশাদ সরকারের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরশাদ জমানায় যেসব জনসভায় ্এরশাদ নিজে উপস্থিত থাকতেন, কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার ভুল করেও সভায় উপস্থিত জনগণের দিকে তাকাতেন না। মঞ্চে প্রেসিডেন্টের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতেন। এরশাদও খুব এনজয় করতেন। একবার এরশাদের দলের এক নেতা নাকি বলেছিলেন, দেশের সব বাঁশ কেটে কলম বানিয়ে নদীর জলকে কালি বানিয়ে লিখলেও আপনার সাফল্য ও গুণের কথা লিখে শেষ করা যাবে না হে মহান পল্লিবন্ধু। শুনে এরশাদ নাকি মুচকি হেসেছিলেন।-এগুলো বানানো জোকসও হতে পারে। বানানো হলেও বোঝা যায়, সেই এরকম একটা কালচারাল অবক্ষয় দেশে ঠিকই নেমে এসেছিল। তেলমারা কালচারটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটা বিপজ্জনক ব্যাধি। এরশাদ আমলে এই রোগ বেড়ে গিয়েছিল, শেখ হাসিনার আমলেও দারুণভাবে ছিল। এখনো আছে। এসবে সমাজ-রাজনীতির যে ক্ষতি হয়, তা সামান্য নয়। রাজা কেনিউটের নামে প্রচলিত গল্পটি মনে পড়ে। রাজার পারিষদের একজন একদিন বললেন, মহারাজ! অসীম আপনার ক্ষমতা। আপনার অঙ্গুলি নির্দেশে সমুদ্রের বিশাল ঢেউ পর্যন্ত ফিরে যায়।
রাজা হেসে বললেন, তাই! তাহলে কালই রাজসভা স্থানান্তরিত হোক সমুদ্রসৈকতে। যেই কথা সেই কাজ। রাজসভা বসেছে সৈকতে। সমুদ্রের উঁচু ঢেউ আসছে। রাজা অঙ্গুলি নির্দেশ করে হুংকার দিয়ে উঠলেন, খামোশ। কিন্তু ঢেউ ফিরে গেল না। রাজার সভা ভাসিয়ে নেওয়ার উপক্রম হলো। রাজা তখন সেই সভাসদকে ডেকে বললেন, অকারণে স্তাবকতা কর না। রাজার নির্দেশে ঢেউ ফিরে যায় না। দেখলে তো! শিক্ষা গ্রহণ কর। সত্যবাদী হও। দেশের মঙ্গল হবে। স্তাবকতা পরিহার কর। কেনিউটের মতো জ্ঞানী রাজার বড় বেশি আকাল এই দেশে।
আসল কথায় আসা যাক। লাভ ও ক্ষতি সব আমলেই হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সতেরো মাসে সমাজ-সংস্কৃতি ও মানবিকতার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ইউনূসের শাসনামলে ঘৃণা ও অশ্লীলতাকে জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেয়াদব তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। মবোক্র্যাসি চর্চা উসকে দেওয়া হয়েছে। অপরাজনীতির পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে খাদের কিনারে টেনে নেওয়া হয়েছে। হামের টিকা না দেওয়ায় চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর ইউনূসের শাগরেদরা এখনো ব্যস্ত রয়েছে জুলাই সনদ নিয়ে, যাকে সংসদে অন্তহীন প্রতারণার দলিল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক