কারিকুলামভিত্তিক পাঠ্যবইয়ে নৈতিক শিক্ষাকে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে যে নৈতিকতা মানেই ধর্মীয় অনুশাসনের অনুসরণ। ফলে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা সম্পর্কে একটি খণ্ডিত ধারণা নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করছে এবং সামাজিক কর্মজীবনে অনুরূপ নৈতিকতা প্রয়োগ করছে। সমাজ স্বাভাবিকভাবে মেনেও নিচ্ছে। অপরদিকে ধর্ম নৈতিকতা শিক্ষা দেয় মূলত পারলৌকিক ভয় ও পুরস্কারের লোভের মাধ্যমে। ধর্মীয় নৈতিকতার চর্চাও মৃত্যুপরবর্তী সুখশান্তির প্রত্যাশাকেন্দ্রিক। সভ্যতা বিকাশে এ নৈতিকতার গুরুত্ব ক্ষীণভাবে প্রকাশিত। ফলে সাধারণের পক্ষে নৈতিকতার বৈশ্বিক আচার, প্রকৃতি ও তার প্রায়োগিক বহু ধারার ধারণাগুলো জানা হয়ে উঠছে না; না ধর্মগ্রন্থ থেকে, না কারিকুলাম থেকে।
সমাজ বা গোষ্ঠীর নৈতিক মান, ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষাপদ্ধতি ও সংস্কৃতি গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ উপমহাদেশের জনগণ ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে রেখেছে। এ অঞ্চলে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমাজে ন্যায়, সমতা, মানবিকতা ও সহযোগিতার ভিত্তি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি তার নৈতিক চরিত্র গঠনের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। সংগত কারণেই ধর্ম, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও নৈতিকতার মধ্যে একটি মৌলিক সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। ধনাত্মক মানবিক গুণাবলির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতক্রমে সনদনির্ভর যে শিক্ষা, তা কেবল অনৈতিকতাই শেখায় না, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধকেও ভূলুণ্ঠিত করে। নীতিহীন শিক্ষা কেবল জ্ঞানকে আত্মস্বার্থে ব্যবহার করতে শেখায়। পৃথিবীর মৌলিক সৌন্দর্যে এর কোনো ভূমিকা নেই। অপরদিকে ধর্মবিহীন নৈতিকতাও নাজুক, নড়বড়ে। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই সৎ গুণাবলির নির্দেশনা সর্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে স্থান পেয়েছে। এই মূল্যবোধগুলো মানুষের চরিত্র গঠনে অপরিহার্য। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বটে। তবে শিক্ষার্থীরা এটিকে কেবল সনদ প্রাপ্তির সোপান হিসেবে দেখছে। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পেলেও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারছে খুবই কম। এ বিষয়ে কারিকুলাম পুনর্গঠন ও মূল্যায়নের দাবি ওঠে। খ্যাতনামা দার্শনিকরা নৈতিকতা ও শিক্ষার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন নানানভাবে। প্লেটো মনে করতেন, শিক্ষা হলো আত্মার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যম, যেখানে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের অনুসন্ধানই মূল উদ্দেশ্য। এরিস্টটল ‘অ্যাথিকস’ গ্রন্থে মানুষকে নৈতিক প্রাণী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে দাবি করেছেন যে শিক্ষা মানুষের এ নৈতিকতার বিকাশ ঘটায়। কনফুসিয়াস নৈতিক শিক্ষাকে দেখেছেন সমাজের শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে। আধুনিক দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট নৈতিক আইনকে মানুষের অন্তর্গত বিবেক থেকেই উদ্ভূত হয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। পাশাপাশি তিনি মানুষের বিবেক জাগ্রত করার দায়িত্বও দিয়েছেন শিক্ষাকে কারিকুলামনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ধর্মের মৌলিক জ্ঞান ধর্মীয় পাঠ্যবই থেকে অনুধাবনের সুযোগ পায় এবং এর ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, নীতি-আদর্শ সমাজে প্রয়োগ করে। এ ধরনের জ্ঞান জীবনে প্রয়োগ করার জন্য পরকালের শাস্তির ভয় এবং পুরস্কারকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পেলেও তা কান্টের মতবাদ অনুসারে ‘অন্তর্গত বিবেক’ থেকে উদ্ভূত হয় না। নৈতিক শিক্ষাকে শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সেতুবন্ধ করা প্রয়োজন। নৈতিক গুণাবলি মানুষের মগজে স্থায়ী রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থেকে যায় পরিবার ও সমাজের, যা ধর্ম ও কারিকুলামের ছকে আবদ্ধ নয়।
প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চরিত্র গঠন। বেদ, উপনিষদ এবং বৌদ্ধ ধর্মশিক্ষায় সততা, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও আত্মসংযমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হতো। একইভাবে প্রাচীন গ্রিক শিক্ষায়ও নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছিল। বাংলাদেশে প্রাচীন মক্তব ও টোল সংস্কৃতিতে শুধু জ্ঞান নয়, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা দেওয়া হতো। আবার ধর্মীয় নৈতিকতা শিক্ষার মূল মাধ্যম ব্যবহারিক পদ্ধতি, যেখানে ধর্মীয় নৈতিকতার সামাজিক প্রভাব, সভ্যতার পরিবর্তনে এর অবদান সম্পর্কে খুব সামান্যই জানার সুযোগ থাকে। ধর্মীয় নৈতিকতার এত প্রাচীন ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং ভোগবাদী প্রবণতা এ অঞ্চলে নৈতিকতার সংকট তৈরি করছে। সামাজিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, সহিংসতার মতো সমস্যাগুলোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে নৈতিক শিক্ষার সংকীর্ণতা ও প্রায়োগিক ব্যর্থতা।
ধর্ম মানুষের ভিতরে নৈতিক বোধ জাগ্রত করে মূলত সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। নিছক পুণ্য অর্জনের জন্য ‘সালাম’ বিনিময় করলে সালামের অন্তর্নিহিত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, শুভকামনাগুলো নিরুত্তাপ অর্থহীন থেকে যায়। আবার কারিকুলামভিত্তিক লোকদেখানো যান্ত্রিক ‘হাই-হ্যালো’ সমাজ বিনির্মাণে কোনো ভূমিকা রাখে না। নৈতিকতাকে উঠে আসতে হয় মানুষের হৃদয়ের গভীরতম মূল্যবোধের কেন্দ্রবিন্দু থেকে, যেখানে সামাজিক, ধর্মীয় ও কারিকুলামভিত্তিক নৈতিক শিক্ষার সুষম সংমিশ্রণ রয়েছে। কারিকুলামভিত্তিক শিক্ষা মানুষের বোধকে যুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে পরিশীলিত করে। মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শ সমাজ, যা উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ম ও নৈতিকতার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ ভিন্নভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জাপানে ‘moral education’ নামে একটি আলাদা পাঠ্যক্রম আছে, যেখানে সততা, সহযোগিতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার ওপর জোর দেওয়া হয়, ধর্মের ওপর নয়। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কেবল প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে না, বরং মানবিকতা ও সমতার বোধ জাগিয়ে তোলে। পাশ্চাত্যে ‘character education’ আন্দোলনের মাধ্যমে নৈতিকতাকে পুনরায় শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে, প্রাচ্যে যার সফলতা সংকীর্ণ। এটি অনস্বীকার্য যে পৃথিবী যতই সমৃদ্ধ হোক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই বাস্তবধর্মী হোক না কেন, নৈতিক শিক্ষার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্যই থেকে যাবে।
শিক্ষার প্রতিটি এককের এক বা একাধিক ফলাফল থাকে অথবা মানুষ কখনো কখনো নিজেই এ ফলাফল নির্ধারণ করে শিক্ষা অর্জন করে। নৈতিক শিক্ষা চর্চার মাধ্যমে কেউ যদি শুধু মৃত্যুপরবর্তী জীবনে সুখী হতে চায়, তাহলে নৈতিক শিক্ষার অনেক নিগূঢ় তথ্য ও তত্ত্ব অজানা থেকে যেতে পারে। একইভাবে বিদ্যা, সনদ, যশ ইত্যাদি অর্জনের নিমিত্তে অর্জিত নৈতিক শিক্ষা লোভ ও লাভের স্বার্থপরতায় অশুদ্ধ, অসম্পূর্ণ। ধর্মীয় এবং কারিকুলাম উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিক শিক্ষার পর্যায়টি এমনভাবে উন্নীতকরণ প্রয়োজন যেন এর প্রয়োগ সমাজে এমপ্যাথির জন্ম দেয়, সিমপ্যাথির নয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, কবি ও কলাম লেখক