পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গার বুকে যেখানে ব্যারাজটি দাঁড়িয়ে আছে, সেই স্থানটির নাম ফারাক্কা। বাংলা ভাষায় ‘ফারাক’ শব্দের অর্থ পার্থক্য বা ব্যবধান; ‘ফারাক্কা’ শব্দের মূলেও রয়েছে পারাপারের ঘাট বা নদী পেরোনোর স্থানের ধারণা। ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, যে নামের মধ্যে পারাপারের ঐতিহ্য লুকিয়ে, সেই স্থানেই আজ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে তৈরি হয়েছে এক বিশাল বাধা। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ২,২৪৫ মিটার দীর্ঘ এবং ১০৯টি গেটবিশিষ্ট ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই স্থাপনা গঙ্গার মূল প্রবাহ থেকে শুষ্ক মৌসুমে ৪০,০০০ কিউসেক (১,১৩৩ ঘনমিটার/সেকেন্ড) পানি ৩৮.৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে দেয়।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে। নব্বই বছরের অধিক বয়সি একজন শীর্ণকায় কিন্তু অটল মানুষ রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে লক্ষাধিক মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মজলুম জননেতা। যাঁর রাজনৈতিক জীবন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। শরীরে অসুস্থতা, তবু তাঁর আহ্বানে রাজশাহী থেকে কানসাট পর্যন্ত শতাধিক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটেছিল লাখো মানুষ। লংমার্চের সমাপনী ভাষণে ভাসানী বলেছিলেন, ‘একটি নদীর নিজস্ব অধিকার আছে। তাকে সমুদ্রে মিলিত হতে না দিলে পৃথিবী মরুময় হয়ে যাবে।’ মার্চের আগে তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লিখিত পত্রও পাঠিয়েছিলেন। এই লংমার্চ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ট্রান্সবাউন্ডারি নদী অধিকার নিয়ে প্রথম বৃহৎ গণ আন্দোলন। এর প্রত্যক্ষ ফলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের ৩১তম সাধারণ অধিবেশনে ফারাক্কা প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং ভারতের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও একটি প্রস্তাব ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়।
ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পেছনে ভারতের নিজস্ব যুক্তি বাস্তবসম্মত ছিল কি না তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। হুগলি নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে যাওয়ায় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নদীর গভীরতা ৭-৮ মিটার থেকে ষাট দশকে ৪ মিটারেরও নিচে নেমে আসে। কলকাতা বন্দর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক মেরুদণ্ড অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। বার্ষিক ২ কোটি টনের বেশি পণ্য পরিচালনা করা এই বন্দর এবং পশ্চিমবঙ্গের লক্ষাধিক শ্রমিকের জীবিকা রক্ষার জন্য ভারতীয় সরকার ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণকে অপরিহার্য মনে করেছিল। ১৯৬১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর প্রশাসনের অধীনে। তবে আইনি ও নৈতিক সংকট ছিল স্পষ্ট, একটি আন্তর্জাতিক নদীতে ভাটির দেশের সম্মতি ছাড়াই একতরফা পানি প্রত্যাহারের কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কার প্রভাব পরিমাপ করা হয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড গবেষণায়। Springer Nature-প্রকাশিত গবেষণায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ১৯৩৫-২০১৫ সালের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে ফারাক্কা চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পদ্মার শুষ্ক মৌসুমের গড় প্রবাহ ফারাক্কা-পূর্ব যুগের তুলনায় নেতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। গোরাই নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাওয়ায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদি বিপদে ফেলছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় মরূকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে এবং ইলিশসহ মৎস্যসম্পদের প্রজননচক্র বিঘ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে বহুবার দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তির আওতায় যৌথ নদী কমিশন (JRC) গঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করা। ১৯৭৩ সালের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়া ফারাক্কা পরিচালিত হবে না, কিন্তু ১৯৭৫ সালে একতরফাভাবে ব্যারাজ চালু হয়। ভাসানীর লংমার্চ ও আন্তর্জাতিক চাপের ফলে ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, প্রবাহ নির্ধারিত মাত্রার ৮০ শতাংশের নিচে নামলে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৮০ শতাংশ পাবে। ১৯৮২ সালে দুটি সমঝোতা স্মারক এবং ১৯৮৫ সালে আরও একটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯৬ সালের চুক্তির বিধান অনুযায়ী, ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম হলে উভয় দেশ সমান ভাগ পাবে; প্রবাহ ৭০,০০০-৭৫,০০০ কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ কিউসেক; আর ১১ মার্চ থেকে ১০ মে সময়কালে প্রতিটি দেশ পর্যায়ক্রমে ৩৫,০০০ কিউসেক গ্যারান্টি পাবে। বরাদ্দ নির্ধারিত হয়েছে ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক প্রবাহ গড়ের ভিত্তিতে। তবে বাস্তবে চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি নিয়মিতভাবে। The Diplomat-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে (এপ্রিল ২০২৫) উল্লেখ আছে, ১৯৯৭-২০১৬ সালের মধ্যে ৩০০টি ১০ দিনের পর্যায়ের মধ্যে ৯৪ বারই বাংলাদেশ হার্ডিঞ্জ ব্রিজে চুক্তির চেয়ে কম পানি পেয়েছে এবং ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ শুষ্ক পর্যায়ের মধ্যে ৩৯ বারই নির্ধারিত বরাদ্দ পায়নি। ২০০৮-২০১১ সালে এই ব্যর্থতা সবচেয়ে ঘন ঘন ছিল।
ভারতের অভ্যন্তরেও ফারাক্কা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যারাজ অপসারণের দাবি জানান এবং ২০১৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় এ দাবি উত্থাপন করেন। ভূগোলবিদ কল্যাণ রুদ্রের গবেষণায় দেখা গেছে, ফারাক্কার কারণে প্রায় ৩২ কোটি ৮০ লাখ টন পলি ব্যারাজের উজানে আটকে পড়ে নদীর তলদেশ উঁচু করে বিহার ও উত্তর প্রদেশে বন্যার মাত্রা তীব্র করেছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলায় ৩ হাজারেরও বেশি হেক্টর জমি নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ম্যাগসেসে পুরস্কারজয়ী পরিবেশবিদ রাজেন্দ্র সিং ২০১৭ সালে পাটনায় ‘নিরন্তর গঙ্গা’ সেমিনারে বলেছিলেন, ‘ফারাক্কা বিহারের জন্য অশুভ।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৩ সালে ২০২৬-পরবর্তী চুক্তি নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় পরামর্শক কমিটিতে প্রতিনিধি পাঠায় এবং ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল শিল্প ও পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নিজস্ব অবস্থান লিখিতভাবে জানায়। অর্থাৎ ভারতের নিজস্ব রাজ্যগুলোর মধ্যেও ফারাক্কা নিয়ে ঐকমত্য নেই, এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আন্তর্জাতিক গবেষক ও সংস্থাগুলো ফারাক্কা সমস্যাকে ট্রান্সবাউন্ডারি জল ব্যবস্থাপনার একটি জটিল নীতিনির্ধারণী কেস হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানেটারি হেলথ গবেষকরা বলেছেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তি কেবল আয়তনভিত্তিক বণ্টনে সীমাবদ্ধ, নদীর বাস্তুতান্ত্রিক স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন আমলে নেওয়া হয়নি। গবেষক ফিওনা ম্যাকনাব উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের প্রবাহ গড়ের ওপর নির্মিত বর্তমান চুক্তি ক্রমবর্ধমান উজানের ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
সমাধানের পথ কঠিন কিন্তু অস্পষ্ট নয়। প্রথমত, ২০২৬ সালের আগেই একটি নতুন জলবায়ু-সহনশীল চুক্তি তৈরি করতে হবে যেখানে প্রবাহের ঐতিহাসিক গড়ের পাশাপাশি বাস্তুতান্ত্রিক ন্যূনতম প্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রক্ষেপণ এবং উজানের সামগ্রিক ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজে রিয়েলটাইম হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিনিময়ের একটি স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, নেপালের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি ত্রিদেশীয় গঙ্গা অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। চতুর্থত, ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশনের ‘নো হার্ম’ নীতি ভবিষ্যৎ চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা উচিত। পঞ্চমত, যৌথ নদী কমিশনকে আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা দিতে হবে।
গঙ্গার পানি বণ্টনে উজানের দেশ ভারতের সদিচ্ছার বিকল্প নেই। এজন্য দরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ। ২০২৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সমাপ্তি একটি সংকট নয়, বরং পুরোনো কাঠামো পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বাংলাদেশকে এ মুহূর্তে কেবল অভিযোগের নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি, আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা ও কূটনৈতিক দৃঢ়তার ভাষায় আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে, প্রতিবেশীর ক্ষতি করে গড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, এ সত্য ভারতের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরাও স্বীকার করছেন। মওলানা ভাসানী যে পথ দেখিয়েছিলেন, সেই পথের পরিণতি হোক কূটনৈতিক সাফল্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি নিরাপত্তা এবং দুই প্রতিবেশী জাতির দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের স্বার্থে এটি এখন আর বিকল্প নয়, অপরিহার্য।
♦ লেখক : মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক ডেমোক্রেসি (উইদাউট বর্ডার্স) প্যারিস, ফ্রান্স