আম মধুর ব্যবসা করেই জীবন চালান এবং সেই জীবনটাই উপভোগ করেন বলে জানিয়েছেন আমজনতা দলের সদস্যসচিব মো. তারেক রহমান। সোমবার রাত দেড়টার দিকে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, আগে পেশায় একজন আইটি ব্যবসায়ী ছিলেন। বাবা মা চাইতেন সরকারি চাকরি করতে। সেই স্বপ্ন নিয়েই বারবার ভাইভা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান লেখেন, একসময় শিক্ষক নিয়োগে ৮৪ শতাংশ কোটা, রেলওয়েতে ৪০ শতাংশ পোষ্য বা পারিবারিক কোটা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোটা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে হতাশ হয়েই তিনি কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
তার ভাষ্য, কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। শেখ হাসিনার সরকার এটিকে রাজাকারদের আন্দোলন বলেও আখ্যা দেয়। তখন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নারী, প্রতিবন্ধী ও পাহাড়ি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য মিলিয়ে ১৫ শতাংশ কোটার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার জিদের কারণে পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। এতে অনগ্রসর এলাকার মানুষ আরও পিছিয়ে পড়ে। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাটের মানুষের দারিদ্র্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি জেলা ভিত্তিক বরাদ্দ রাখার পক্ষে মত দেন।
তারেক রহমান জানান, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি, এসআই নিয়োগ, কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েও শেষ মুহূর্তে বাদ পড়েছেন। কৃষি ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষায় জালিয়াতি ঠেকাতে গিয়ে হামলার শিকার হন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম বন্ধ করতে গিয়ে দুই ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনও করা হয়।
এসব আন্দোলন করতে করতেই চাকরিতে ঢোকার সুযোগ হারান তিনি। এরপর ক্ষুধা আর দারিদ্র থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেন আমের ব্যবসা। পলাশী, আগারগাঁওয়ে দোকান ভাঙচুরের অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। শেষ পর্যন্ত অনলাইনে আম বিক্রি আর শীতে মধু বিক্রিই হয়ে ওঠে তার মূল আয়ের উৎস।
তারেক রহমান বলেন, আম মধুর ব্যবসা থেকে শুধু পরিবারই চলে না, রাজনীতির খরচও এখান থেকেই চালান। দুই দিন আগে নির্বাচনে ডাব্বা মারলেও তার বা পরিবারের কারও খারাপ লাগেনি। তার ভাষায়, আল্লাহ তাকে সংসদের জন্য যোগ্য মনে করেননি। নেতৃত্ব আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।
তিনি আরও বলেন, তার জীবনে কোনো আক্ষেপ নেই। সংসদে যেতে না পারলেও বর্তমান জীবনটাই উপভোগ করছেন। সবকিছুর ভরসা আল্লাহ।
নীচে তাঁর ফেসবুক পোস্ট হুবুহু তুলে ধরা হলো
''আমি তারেক, পেশায় একজন আইটি ব্যাবসায়ী ছিলাম। আমার বাবা মা সেই ব্যাবসা করতে দেন নাই। তারা চান আমি সরকারি চাকরি করি। সেখান থেকে সরকারি চাকরির চেষ্টা করে বার বার ভাইবা দিয়েও ব্যার্থ হচ্ছিলাম। একদিন সবাই স্মৃতিতে স্মরণ করবে, শিক্ষক নিয়োগে ৮৪% কোটা, রেলওয়েতে ৪০% পৌষ্য বা পারিবারিক কোটা, আর ১ম ও ২য় শ্রেনীতে কোটা ছিল।
ব্যাক্তিগত জায়গায় বার বার আশাহত হয়েই এই ব্যাবস্থা হতে মুক্তির জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম কোটা সংস্কারের। আমরা কোটা সংস্কারের লড়াই করলেও, অনেকে এটাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে শত্রুতা পর্যায়ে নিয়ে যায়। শেখ হাসিনার সরকারও এই আন্দোলনকে রাজাকারদের আন্দোলন বলে বলতে থাকে। বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য আমরা কিছুটা কোটা রেখেই, নারীদের জন্য কিছুটা, প্রতিবন্ধী, ও পাহাড়ের অনগ্রসর বন্ধুদের জন্য মিলায়ে ১৫% কোটার প্রস্তাব করেছিলাম।
আমাদের লড়াই ছিল, ন্যায় বিচারের জন্য। সেখান হতে কোটা পুরোটায় বাতিল হয়ে যায়। এখানে শেখ হাসিনার জিদ একটা বড় ক্ষতি করে। পুরো কোটা সিস্টেম ফল করে। আমি এখনো মনে করি, অনগ্রসর জেলার জন্য এগিয়ে নিতে জেলা ভিত্তিক বরাদ্দ রাখতেই হবে। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাটে আমি অনেকবার গিয়েছি, সেখানে মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে জীবন যাপন করে। তাদেরকে কিছুটা এগিয়ে তো দিতেই হবে। এগিয়ে না দিলেও জনসংখ্যার অনুপাত হিসাবে তারা তাদের অঞ্চলের রিক্রুটমেন্ট এর একটা অধিকার রাখে।
কোটার বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক বিন্যাসের মাধ্যমে সমাজের অনগ্রসর এলাকা ও গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ রাখতেই হবে। প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা পুরপুরি বাতিল আমরা কখনই চাই নি। এখানে গ্রাম গঞ্জের মেধাবী বোনদের একটা অগ্রাধিকার থাকাই উচিত। কিন্তু সেই কোটা কি ৬০% নারী কোটা আর ২০% পৌষ্য কোটা?
আবার বলুনত একটা খাতে ৬০% নারী কোটা ছিল, সেখানে এক ধাক্কায় ০% করা কি উচিত হয়েছে?
আন্দোলনে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পায় নাই, সেই সুযোগ দেয়া হয় নাই। আন্দোলনের হাত থেকে বাঁচতে, রাগে ক্ষোভে সব কোটা বাতিল করা হয়েছে।
২০১৮ এর কোটা আন্দোলনের পর, বাখরাবাদ গ্যাস কম্পানিতে ভাইবা দেই, আমাকে নিয়োগ দেয়া হয় না।
দুইবার ভাইবা দেই এস আই নিয়োগে, ৩ বার ভ্যারিফিকেশনের পর বাদ দেয়া হয়। এভাবে কত গুলো পরীক্ষায় শেষ সময়ে বাতিল হয়েছি মনেও নাই। কৃষি ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষায় জালিয়াতি থামাতে গিয়ে মারাত্মক হামলার শিকার হয়েছিলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধ করতে গিয়ে পুরো ২ ঘন্টা আটকে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিকিউরিটি আমাকে নির্যাতন করেছিল। এই পরীক্ষা গুলো পুনরায় নিতে বাধ্য আমি করেছিলাম।
এসব একটিভিজম করতে করতে আর চাকরিতে ঢুকার সুযোগ পেলাম না। আর ক্ষুধা আর দারিদ্র হতে মুক্তি পেতে তখন হতেই শুরু করি আম ব্যাবসা। পেটের ক্ষুধা যে কি, আমরা হারে হারে টের পেয়েছি। খর কুটার মত অনেক ব্যাবসা আঁকড়ে ধরেছি, সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেয়া হয় নি। পলাশীতে আমার দোকান ছিল, তখন দুবার আমার দোকান ভাংচুর করল।
আগারগাঁও পাকা মার্কেটে দীর্ঘ দিন ব্যাবসা করেছি। প্রশাসনের লোক দিয়ে পর্যন্ত আমার দোনাক মাটির সাথে মিশে দেয়া হয়েছে।
এসব কারনে অনলাইনে আম বিক্রিই আমার ভার্চুয়াল ব্যাবসার কেন্দ্র হয়ে উঠে। গ্রীষ্মের আম, আর শীতের মধু।
এই মিলে আমার আম মধুর ব্যাবসা।
আমার জীবনে কোন কিছুর জন্য কোন আক্ষেপ নাই। খুব স্বাদ ছিল হাজার ৪০ এর মত বেতন পেলে কোন ভাবে জীবনটা চালিয়ে নেব।
আলহামদুলিল্লাহ, আম মধুর ব্যাবসায় শুধু পরিবার চলে না, আমার রাজনীতিতেও ব্যায় হয় এই টাকা।
২ দিন আগে নির্বচানে ডাব্বা মারলাম। জানেন, আমার বা আমার পরিবারের একটু খারাপও লাগে নাই। আল্লাহ আমাকে ঐ জায়গার জন্য যোগ্য মনে করেন নাই, আমি ভাল করি নাই। নেতৃত্ব আল্লাহ হতে আসেন, ২০১৮ থেকে আল্লাহ আমাকে যেখানে যেখানে উপযুক্ত মনে করেছেন, আমি নেতৃত্ব দিয়েছি। হয়ত আমি সংসদের উপযুক্ত নই, তাই সেখানে আমার যাওয়া হল না।
আমি আমার এই জীবনটাই উপভোগ করি, আল্লাহ ভরসা।''
বিডি প্রতিদিন/আশিক