শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জুলাই, ২০২০ ২১:৩৯

চিরদিনের উত্তম...

চিরদিনের উত্তম...

তিনি জানতেন, তিনিই উত্তম হবেন। তাই নামটা অরুণ কুমার থেকে নিজেই বদলে উত্তম কুমার রেখেছিলেন। এই মহানায়কের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। আর তার মহাপ্রয়াণ হয় ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের এই আয়োজন তৈরি করেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ

 

অভাব অনটনে বেড়ে ওঠা উত্তম

উত্তম কুমার ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ৫১ আহিরীটোলা স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন। দাদু আদর করে তাকে ডাকতেন উত্তম। আসল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়। মা চপলা দেবী। অভাব-অনটনের মধ্যে কাটে উত্তমের ছেলেবেলা। সংসারে অভাব থাকায় ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি দিনে পোর্ট কমিশনার্স অফিসের ক্যাশ বিভাগে চাকরি নেন। আর রাতে ভর্তি হন ডালহৌসির গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে। তিনি ১৯৪৫ সালে বিকম পাস করেন।

 

কেরানি থেকে নায়ক

অরুণ কুমার ছিলেন পোর্ট কমিশনারের কেরানি। হঠাৎ মাথায় ভূত চাপল সিনেমা করবেন। সুযোগ পেয়ে হলেন উত্তম কুমার। নীতিন বোসের ‘মায়াডোর’। কিন্তু ফ্লপ।

 

মুকুট নাটকে অভিনয়

সংস্কৃতিমনা উত্তমের বাবা-কাকারা পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘সুহৃদ সমাজ’। বিভিন্ন উৎসবে সুহৃদ সমাজ থেকে যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। যাত্রাপালায় অভিনয় দেখে উত্তমেরও অভিনয়ের ইচ্ছে জাগে। স্কুলে থাকতেই উত্তম কুমার তার মহল্লায় নাট্যসংগঠন লুনার ক্লাবে জড়িয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ নাটিকায় অভিনয় দিয়ে শুরু হয় মহানায়কের অভিনয় জীবন।

 

সিনেমার ভূত যখন মাথায়

উত্তমের মাথায় চেপে বসল সিনেমার ভূত। একদিন গেলেন ভারত লক্ষ্মী স্টুডিওতে। সেখানে ভোলানাথ আর্য্য ‘মায়াডোর’ নামে একটি হিন্দি ছবি প্রযোজনা করছেন। দারোয়ান ঢুকতে না দিলে পূর্ব পরিচিত নাট্যজন গণেশ বাবুর পরিচয় দিয়ে প্রযোজকের সামনে হাজির হলেন। প্রযোজক অনেক দেখেশুনে তাকে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিলেন। নতুন বরের মার খাওয়ার দৃশ্যে উত্তমের অভিনয় ছিল খুবই সাবলীল। এভাবে সহশিল্পীর মর্যাদা নিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমার চলচ্চিত্র অঙ্গনে পা রাখেন।

 

সম্মানি এক টাকা চার আনা

পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দৈনিক এক টাকা চার আনা সম্মানি পান। কিন্তু তার প্রথম অভিনীত ছবি আর পরবর্তী সময়ে মুক্তি পায়নি। ১৯৪৮ সালে মাত্র ২৭ টাকা পারিশ্রমিকে নীতিন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে উত্তম কুমার নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন। এটিই তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি।

 

উত্তম যুগের সূচনা

১৯৪৭ সালে দুটি ঘটনা ঘটল, ভারত স্বাধীন হলো আর উত্তম কুমার ‘মায়াডোর’ ছবিতে অভিনয় করলেন। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একের পর এক সিনেমা করেছেন। সবই ফ্লপ। ১৯৫৩ সালে এলো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। শুরু হলো উত্তম যুগ। তাকে বলা হয় ‘বাংলার রবার্ট ব্ররুস’।

 

উত্তমকে নিয়ে উপহাস

‘ওরে যাত্রী’ সিনেমার শুটিং চলছে। অভিনয়ে ব্যস্ত উত্তম কুমার। হঠাৎই ফ্লোর থেকে ভেসে এলো টিটকারি। চেহারা তো বটেই, অভিনয় নিয়েও কমপ্লিমেন্টের বাহারে টেকা দায়। কেউ বলেন নেক্সট দুর্গাদাস, কেউ আবার ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা টানেন। একের পর এক ফ্লপ সিনেমার হিরোর তখন অবস্থা নাকাল।

 

‘সাড়ে চুয়াত্তরে’ ঘুরে দাঁড়ানো

১৯৫৩ সাল। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’Ñএর অফার পেলেন উত্তম কুমার। নায়িকা নবাগতা সুচিত্রা সেন। ছবিটি সুপারহিট। ঘুরে দাঁড়ালেন উত্তম কুমার।

 

চলচ্চিত্রকার উত্তম

২০০’রও বেশি বাংলা আর বেশকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও সফলতা পান। মঞ্চেও কাজ করেছেন। উত্তম কুমার পরিচালনা করেন ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (১৯৮১), বনপলাশীর পদাবলী (১৯৭৩) ও শুধু একটি বছর (১৯৬৬)।

 

অর্জনের ঝুলি

১৯৬৭ সালে ‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৫৭ সালে অজয় কর পরিচালিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে অভিনয় করেন।  ‘হারানো সুর’ পেয়েছিল রাষ্ট্রপতি সার্টিফিকেট অব মেরিট। প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই।

 

হিন্দি ছবিতে উত্তম

উত্তম কুমার বহু সফল বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ১৫টি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম।

 

উত্তম-সুচিত্রা আজও সেরা

সুচিত্রা-উত্তম জুটির বিশেষত্ব হলো তাদের কথোপকথনের ধারা। একে বলা যায় ‘রোমান্স অন এ টি-পট’। সুচিত্রা সেনই উত্তমকে ম্যাটিনি আইডল করে তুলেছিলেন। আজও সেরা এই জুটি। উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন শুধু সেলুলয়েডে সীমিত ছিল না। বাস্তব জীবনেও তাদের প্রেমের খুনসুটি আমজনতা জেনে গিয়েছিলেন। তাদের মিলন না হওয়ায় আফসোস করে বলেছেন, ‘আহা তারা কেন একসঙ্গে ঘর বাঁধতে পারলেন না।’ আজও তারা তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে প্রেমের উপমা আর উৎসাহের প্রতীক হয়ে আছেন।

 

উত্তম-সুচিত্রা সফল জুটি

টালিগঞ্জের প্রথম সফল জুটি উত্তম-সুচিত্রা। তাদের উল্লেখযোগ্য ছবি হলোÑ হারানো সুর, পথে হলো দেরি, সপ্তপদী, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, জীবন তৃষ্ণা, সাগরিকা, প্রিয় বান্ধবী, হার মানা হার, আলো আমার আলো, নবরাগ, কমললতা, গৃহদাহ, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, চন্দ্রনাথ, সবার উপরে, গৃহপ্রবেশ, মরণের পরে ইত্যাদি।

 

উত্তম-গৌরী

১৯৪৮ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন বান্ধবী গৌরী দেবীকে। তিনি তখন আলিপুর ডকে চাকরি করতেন। গৌরীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা। অন্যত্র তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনে ঝোঁকের মাথায় হুট করেই পালিয়ে বিয়ে করেন তাকে। ১৯৫০ সালে তাদের একমাত্র সন্তান গৌতমের জন্ম হয়। গৌরী চাইতেন না উত্তম অভিনয় করুক। এ কারণেই তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়।

 

উত্তম-সুপ্রিয়া অধ্যায়

ভালোবাসার মানুষকে আপন করে নেওয়ার পথে সমাজ, সংসারের কোনো বাধাই মানেননি মহানায়ক। লোকনিন্দা, অপবাদ সবকিছু মাথা পেতে নিয়েও একসঙ্গেই বসবাস করে গেছেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। আইনত বিয়ে করতে পারেননি। বিবাহিত দম্পতির মতোই পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন তারা। ১৯৬৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। জীবনের বাকি ১৭টি বছর তিনি সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেই অতিবাহিত করেন।

 

সংগীতশিল্পী উত্তম

রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার হরিণ চাই’, ‘অনেক কথা বলেছিলেম’, ‘তুমি ধন্য ধন্য হে’ এবং ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ গানগুলো রেকর্ড করেছিলেন। নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বেশ কয়েকজন সংগীতগুরুর কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন। দেবকীকুমার বসুর ‘নবজন্ম’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে ছয়টি গান গেয়েছেন। সেসব পরে অ্যালবাম আকারে প্রকাশও হয়েছিল। গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজে সংগীত পরিচালনা করেছেন ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষে মেগাফোন থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রসংগীতের চার সিডির অ্যালবাম ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু’র শেষ দুটি গানের শিল্পী স্বয়ং উত্তম কুমার। প্রযোজনা সংস্থাটির ‘অপ্রকাশিত রেকর্ডিং’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে উত্তম কুমারের কণ্ঠে ‘আমার সোনার হরিণ চাই’ ও ‘অনেক কথা বলেছিলেম’ গান দুটি। অন্যদিকে ‘পেরিনিয়াল রেকর্ডস’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে উত্তম কুমারের গাওয়া আরও দুটি রবীন্দ্রসংগীত ‘তুমি ধন্য ধন্য হে’ এবং ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’। সংগীতপ্রেমী উত্তম কাল তুমি আলেয়া ছবির সব গানের সুরারোপ করেন। ছবিটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়। অভিনেতা, প্রযোজক এবং পরিচালকÑ সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সফল।

 

মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন

মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন হল কলকাতা মেট্রোর একটি স্টেশন। স্টেশনটির আগেকার নাম টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন। স্টেশনটি বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা উত্তম কুমারের নামে নামাঙ্কিত। স্টেশনটি আগে কলকাতা মেট্রোর দক্ষিণ টার্মিনাল ছিল। এই স্টেশনের পাশে মেট্রোর একটি কারশেড আছে। স্টেশনের পশ্চিমে টালিগঞ্জ গল্ফ ক্লাব, পূর্বে রয়্যাল ক্যালকাটা গল্ফ ক্লাব এবং দক্ষিণে দেশপ্রাণ শাসমল রোড ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোডের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমি।

 

উত্তমের ব্যক্তি জীবন

মা-বাবার তিন সন্তানের মধ্যে উত্তম কুমার ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাই তরুণ কুমার একজন শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন। তারা একসঙ্গে বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। উত্তম কুমার গৌরী দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায় মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান। গৌরব চট্টোপাধ্যায় উত্তম কুমারের একমাত্র নাতি। বর্তমানে টালিগঞ্জের জনপ্রিয় ব্যস্ত অভিনেতা। উত্তম ও গৌরীর একমাত্র ছেলে গৌতমের জন্ম ১৯৫১ সালে। ১৯৬৩ সালে উত্তম কুমার তার পরিবার ছেড়ে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বসবাস করেন।

 

যেভাবে না ফেরার দেশে

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলার এ মহানায়ক। ছবিতে অভিনয় করতে করতেই চলে গেলেন তিনি। টালিগঞ্জের স্টুডিওতে রাত ১০টা পর্যন্ত ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র শুটিং করলেন। বাসায় ফিরে টের পেলেন বুকের বাম পাশটায় একটা ব্যথা লতিয়ে উঠছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। ক্ষণজন্মা কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমার চলচ্চিত্র শিল্পকে দিয়েছেন ব্যস্ততম ৩২টি বছর। বড় অসময়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেও তার কীর্তি তাকে আজীবন অমর করে রাখবে এই ভুবনে। বারে বারে গেয়ে উঠবেন তিনি ‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো...’।


আপনার মন্তব্য