শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জানুয়ারি, ২০২১ ২২:০৪

নির্মাতা ও সমিতির কাছে এফডিসির পাওনা ২৩ কোটি টাকা

আলাউদ্দীন মাজিদ

নির্মাতা ও সমিতির কাছে এফডিসির পাওনা ২৩ কোটি টাকা

পর্যাপ্ত আয় নেই। চরম অর্থ সংকটে পড়েছে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি)। গত বছরের মে মাস থেকে সরকারি অনুদানের টাকায় চলছে সংস্থাটি। অথচ এই সংস্থাটি বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা ও চলচ্চিত্র সমিতির কাছ থেকে বকেয়া হিসেবে পাবে আনুমানিক ২৩ কোটি টাকা। সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এই অর্থ যদি পাওনাদারদের কাছ থেকে পাওয়া যেত তাহলে এফডিসি অর্থ সংকটের কবল থেকে অনেকটাই পরিত্রাণ পেত। পরিশোধ করা যেত অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্র্যাচুয়িটির টাকাসহ মাসিক বেতন এবং অন্যান্য নিয়মিত খরচ। এফডিসি সূত্রে জানা গেছে, এফডিসিতে অবস্থিত চলচ্চিত্রের সাতটি সমিতির কাছে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘর প্রযোজক ও প্রদর্শক সমিতির কাছে পাওনা আনুমানিক ১৬ লাখ টাকারও বেশি, পরিচালক সমিতির কাছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা, শিল্পী সমিতির কাছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা, চিত্রগ্রাহক সমিতির কাছে প্রায় ৯ লাখ টাকা, সিডাবের কাছে প্রায় ৮ লাখ টাকা, এডিটরস গিল্ডের কাছে প্রায় ৬ লাখ টাকা এবং ব্যবস্থাপক সমিতির কাছে আনুমানিক ৩ লাখ টাকা পাওনা আছে এফডিসির। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বকেয়া পরিশোধ করছে না সমিতিগুলো। অথচ সমিতির অন্যান্য কর্মকান্ড যেমন পিকনিক, ইফতার পার্টিসহ নানা আয়োজন নিয়মিত চলছে, এমনকি প্রতি বছর সদস্যপদ প্রদান করে সমিতিগুলো বড় অঙ্কের আয় করে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ এফডিসি কর্তৃপক্ষের। কয়েকটি সমিতির কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে তাঁরা জানান, চলচ্চিত্রের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো সমিতিই আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। সমিতিগুলোর ফান্ডও প্রায় শূন্য। সদস্যরা বিপদে পড়লে তাঁদের উদ্ধার করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। আর পিকনিক, ইফতার পার্টিসহ নানা আয়োজন যা না করলেই নয় তা চলে স্পন্সর জোগাড়ের মাধ্যমে। যখন চলচ্চিত্রের কাজ রমরমা ছিল তখন কখনো এমন বকেয়া রাখা হতো না। এদিকে প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার কাছে ১৯৮৪ সাল থেকে বকেয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণের সুবিধা ও পি ফিল্ম প্রথায় চলচ্চিত্র নির্মাণ বাবদ এফডিসির পাওনা রয়েছে আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা। এফডিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, বার বার বকেয়া পরিশোধের নোটিস পাঠিয়েও নির্মাতাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। এফডিসিতে নিবন্ধন করা বেশির ভাগ নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় গিয়ে তাঁদের বাড়ি বা অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। টেলিফোন নম্বরও বন্ধ। যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে তাঁরা চলচ্চিত্রের ব্যবসা মন্দ এই অজুহাত দেখিয়ে শুধুই সময় নিচ্ছে। অথচ বকেয়া পরিশোধের কোনো লক্ষণ নেই।

এদিকে, পর্যাপ্ত আয় হারিয়ে এফডিসি এখন সরকারি অনুদাননির্ভর হয়ে পড়েছে। সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন মেলে না সরকারি অনুদান ছাড়া। গত ৩ জানুয়ারি সরকার দ্বিতীয় দফায় ৭ কোটি টাকা অনুদান দেয় এফডিসিকে। তা দিয়ে পরিশোধ করা হয় বেতন ও অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আংশিক গ্র্যাচুয়িটি। এর আগে গত মে মাসে অনুদান হিসেবে এফডিসিকে সরকার দিয়েছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এফডিসি প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির ২৫১ জন কর্মকর্তার মাসিক বেতনের পরিমাণ প্রায় ৯৮ লাখ টাকা। সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানির বিল, উন্নয়ন কাজ, দৈনন্দিন খরচসহ মাসিক খরচ ১ কোটি টাকারও বেশি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া ছাড়াও পরিশোধ করা যাচ্ছে না এফডিসির চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর গ্র্যাচুয়িটি বাবদ প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এফডিসির আয়ের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে লকডাউন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ খাতে ওই মাসে এফডিসির আয় ছিল মাত্র ৪৯ লাখ ২০ হাজার ১৫৬ টাকা এবং লকডাউন শেষ হলে গত সেপ্টেম্বর মাসে একই খাতে আয় হয় মাত্র ৪২ লাখ ৫২ হাজার ৯২৭ টাকা। এর পরবর্তী মাসগুলোর আয়ের চিত্রও প্রায় একই। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে এফডিসি প্রশাসন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এফডিসিতে চলচ্চিত্রের কাজ আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় ২০১০ সাল থেকে। তখন থেকে ডিজিটাল ফরম্যাটে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলে এফডিসিতে ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের টেকনিক্যাল সাপোর্ট না থাকায় নির্মাতারা প্রাইভেট সেক্টর ও দেশের বাইরে চলে যান ডিজিটাল চলচ্চিত্রের কারিগরি কাজের জন্য। এরপর এফডিসির আধুনিকায়ন প্রকল্প ২০১৮ সালের দিকে সম্পন্ন হলেও ক্যামেরা ও সম্পাদনা বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগে বিশেষ করে পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চালু হয়নি। আয় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে এফডিসি চিহ্নিত করেছে দুটি বিষয়কে। সংস্থার কথায় এফডিসির আয়ের প্রধান খাত ছিল নেগেটিভ বিক্রি ও নেগেটিভ পরিস্ফুটন। ৩৫ মিলিমিটারের যুগ শেষ হয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির নির্মাণ শুরু হলে এই দুটি খাত বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এনালগ আমলে এই দুই খাত থেকে যে আয় হতো তা দিয়ে এফডিসির যাবতীয় খরচ মিটিয়ে আরও অর্থ জমা থাকত। ডিজিটাল যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে আয়ের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে থাকা সংস্থাটির এফডিআরের বিপরীতে ঋণ নিয়ে বেতন ও অন্যান্য খরচ নির্বাহ হতো। একসময় তাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন থেকেই সরকারের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে চলতে থাকে সংস্থাটি। গত বছর করোনা মহামারী দেখা দিলে কাজ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। ফলে গত বছরের মে মাসেও ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ‘সরকারি অনুদান’ নিয়ে মার্চ ও এপ্রিল মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেছে এফডিসি। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে আগস্ট পর্যন্ত বেতন দিতে পারলেও সেপ্টেম্বর থেকে ফের সংকটে পড়ে এফডিসি। এই সংকট মোচনে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত ইয়াসমিন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ১৮ কোটি এবং অবসপ্রাপ্তদের গ্র্যাচুয়িটি পরিশোধে ১২ কোটি টাকা, মোট ৩০ কোটি টাকা চেয়ে গত ২৯ জুন তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এফডিসিকে ৩ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় ৭ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হলো। এর মধ্যে বকেয়া বেতন বাবদ ৫ কোটি ও অবসরে যাওয়া কর্মীদের জন্য ২ কোটি টাকা অনুদান দেয় সরকার। এফডিসি নিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কার কথা হলো- এভাবে সরকারি অনুদানে আর কতদিন চলবে এফডিসি। এভাবে চলতে থাকলে ১৯৫৭ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া চলচ্চিত্র নির্মাণের দেশীয় এই সূতিকাগারটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এফডিসি কর্তৃপক্ষ দুঃখের সঙ্গে জানায়, দেশের এই প্রধান গণমাধ্যমটি ২০১০ সাল পর্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। এফডিসির আয়ের প্রধান উৎস ছিল ফিল্মের কাঁচামাল বিক্রি এবং কালার ল্যাবে ফিল্ম পরিস্ফুটন। এই দুই খাতের আয় দিয়েই বেতন, ভাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ করে আরও অর্থ এফডিসির ফান্ডে জমা থাকত। ২০১০ সালের পর ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলে এই দুই এনালগ খাতে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এফডিসি আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। থেমে যায় সংস্থাটির স্বাভাবিক গতি। এর ওপর আবার গত বছর বৈশ্বিক মহামারী করোনাকাল শুরু হওয়ায় লকডাউনের কবলে পড়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ কাজ বন্ধ ও কমে যাওয়ায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের কবলে পড়েছে এফডিসি। শোবিজ জগতের মানুষের এখন একটিই প্রশ্ন- ‘কি হবে এফডিসির’?


আপনার মন্তব্য