শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২২:১০

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৯

চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসার প্রত্যাশা

আলাউদ্দীন মাজিদ

চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসার প্রত্যাশা

চলচ্চিত্র, নাটক এবং গানের মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তরে পৌঁছনো যায়। দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য বাণী বয়ে আনা যায়। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণরা চলচ্চিত্র নির্মাণে বেশি এগিয়ে আসছে, এটি দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য সত্যিই আশার বাণী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই শিল্পর জন্য এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। এ কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকার নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা মানসম্মত ছবি নির্মাণ করুন যাতে দর্শক পরিবার নিয়ে আবার সিনেমা হলে ফিরতে পারে। গতকাল ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও করোনার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এতে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ড. মুরাদ হাছান, তথ্য সচিব খাজা মিয়া প্রমুখ। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে তথ্যমন্ত্রীই পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলচ্চিত্রের উন্নয়নে ইতিমধ্যেই নানা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সিনেমা হল নির্মাণ ও সংস্কারে ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং উপজেলা ও থানায় তথ্য ভবন নির্মাণ ও তাতে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের কাজও শুরু হচ্ছে। এ ছাড়া চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যা কিছু প্রয়োজন সবই করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার প্রত্যাশা আমাদের চলচ্চিত্র আবার দেশ ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করবে এবং বহির্বিশ্বে সুনাম বয়ে আনবে। তিনি আজীবন সম্মাননা এবং সম্মাননাপ্রাপ্তদের ধন্যবাদ জানান।

সুচন্দার দুঃখবোধ

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯-এ আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা গুরুতর অসুস্থ। সম্প্রতি তাঁর হার্টের বাইপাস সার্জারি হওয়ায় তিনি শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় তিনি স্বশরীরে পুরস্কার গ্রহণ করতে যেতে পারেননি। তাই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের কথামতো তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন। যা আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্তদের বক্তব্য রাখার জন্য বরাদ্দকৃত সময়ে তাঁর ছেলে অপু রায়হান পাঠ করবেন বলে আয়োজকরা জানালেও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এতে বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করা এই কীর্তিমান চলচ্চিত্রকার ও মুক্তিযোদ্ধা সুচন্দা মনে চরম আঘাত পেয়েছেন বলে উল্লেখ করে অঝোরে কেঁদে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, আয়োজকরা তাঁর প্রতি কেন এই অসম্মান করলেন তা হয়তো তিনি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেবেন। তিনি বলেন, ষাটের দশক থেকে চলচ্চিত্রের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। চলচ্চিত্রে কি আমার কোনো অবদান নেই? আজ কেন আয়োজকরা পুরস্কারের নামে আমাকে এই তিরস্কারে ভূষিত করলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিচার আমি আপনার কাছে চাই। এদিকে, সুচন্দার অপর দুই বোন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা ও চম্পাকে অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ না জানানোয় তাঁরাও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ববিতা ও চম্পা বলেন, আয়োজকরা আমাদের সঙ্গে কেন এমন দুঃখজনক আচরণ করলেন তার বিচার আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই চাইছি।

 

মাসুদ পারভেজের আনন্দ-বেদনা

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯-এ আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত অপর চলচ্চিত্রকার মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানা বলেন, যখন জানতে পারলাম আমাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে তখন আনন্দের পাশাপাশি দুঃখবোধও কাজ করল আমার মধ্যে, কারণ সবার ভালোবাসার কারণে প্রধানমন্ত্রী আমাকে এই সম্মানে ভূষিত করতে যাচ্ছেন অথচ করোনার কারণে প্রধানমন্ত্রী স্বশরীরে অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। তাঁর হাত থেকে আমার ৪৬ বছরের চলচ্চিত্র জীবনের শেষ সম্মাননাটি আমি নিতে পারব না এই দুঃখ কখনো ভোলার মতো নয়। তিনি বলেন, স্বাধীন দেশে প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ আমি প্রযোজনা করি। ছবিটি বঙ্গবন্ধু দেখেন এবং আমি যখন জাতির জনকের সঙ্গে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসায় দেখা করতে যাই তখন তিনি আমাকে বলেন, ‘ভালোই তো বানাইছস, চলচ্চিত্রে থেকে যা’। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন, তাঁর কথামতো চলচ্চিত্রে থেকে যাওয়ায় আজ আমি চলচ্চিত্রকার মাসুদ পারভেজ হতে পেরেছি। আমার পরিচিতি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছি। এ জন্য বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, যাঁরা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন তাঁদের যেন ভিআইপি এবং যাঁরা অন্য সম্মাননা পেয়েছেন তাঁদের যেন কমপক্ষে দুই বছরের জন্য হলেও ‘সিনেমা ইমপোর্টেন্ট পারসন’ মানে সিআইপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে আমি আমার এই সম্মাননা নিবেদন করলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলচ্চিত্রের সর্বস্তরের অসহায় মানুষের জন্য সহায়তা কামনা করেন তিনি। সরকার, দেশবাসী, চলচ্চিত্রের মানুষ ও জুরিবোর্ড, তাঁর সহধর্মিণী এবং পুত্রের প্রতি তাঁকে চলচ্চিত্রের কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন চলচ্চিত্রকার ও মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ পারভেজ।

মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অভিনয়শিল্পী আনিসুর রহমান মিলন ও ভাবনার সঞ্চালনায় প্রথমেই মঞ্চে ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’ গান নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন সাদিয়া ইসলাম মৌ ও তাঁর দল। এরপর গান পরিবেশন করেন লিজা, অপু আমান, লুইপা।  ঈগল ড্যান্স  কোম্পানির কোরিওগ্রাফিতে চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গে মঞ্চে নাচের ঝড় তোলেন অভিনয়শিল্পী ফেরদৌস, অপু বিশ্বাস, মাহিয়া মাহী, সাইমন, নুসরাত ফারিয়া। ওয়ার্দা রিহাবের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পর্দা নামে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯-এর করোনার কারণে  সীমিত পরিসরে করা আয়োজনের।

 একনজরে

আজীবন সম্মাননা (যুগ্ম) : অভিনেতা মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) ও অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা।

শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র (যুগ্ম) : ‘ন ডরাই’ ও ‘ফাগুন হাওয়ায়’।

শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : ‘নারী জীবন’।

শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র : ‘যা ছিল অন্ধকারে’।

শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক : তানিম রহমান অংশু (ন ডরাই)।

শ্রেষ্ঠ অভিনেতা : তারিক আনাম খান (আবার বসন্ত)।

শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী : সুনেরাহ বিনতে কামাল (ন ডরাই)।

শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্বচরিত্রে : এম ফজলুর রহমান বাবু (ফাগুন হাওয়ায়)।

শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্বচরিত্রে : নারগিস আক্তার (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খলচরিত্রে : জাহিদ হাসান (সাপলুডু)।

শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (যুগ্ম) : নাইমুর রহমান আপন (কালো মেঘের ভেলা) ও আফরীন আক্তার (যদি একদিন)।

শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক : মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ইমন (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক : হাবিবুর রহমান (মনের মতো মানুষ পাইলাম না)।

শ্রেষ্ঠ গায়ক : মৃণাল কান্তি দাস (গান : তুমি চাইয়া দেখ, সিনেমা : শাটল ট্রেন)।

শ্রেষ্ঠ গায়িকা (যুগ্ম) : মমতাজ বেগম ও ফাতিমা-তুয-যাহরা ঐশী : (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ গীতিকার (যুগ্ম) : নির্মলেন্দু গুণ (গান : ইস্টিশনে জন্ম আমার। সিনেমা : কালো মেঘের ভেলা) ও ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী (কবি কামাল চৌধুরী) (গান : চল হে বন্ধু চল। সিনেমা : মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ সুরকার (যুগ্ম) : প্লাবন কোরেশী (গান : বাড়ির ওই পূর্বধারে) ও সৈয়দ মো. তানভীর তারেক (গান : আমার মায়ের আঁচল। সিনেমা : মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার : মাসুদ পথিক (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার : মাহবুব উর রহমান (ন ডরাই)।

শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা : জাকির হোসেন রাজু (মনের মতো মানুষ পাইলাম না)।

শ্রেষ্ঠ সম্পাদক : জুনায়েদ আহমদ হালিম (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।

শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক (যুগ্ম) : মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বাসু ও মো. ফরিদ আহমেদ (মনের মতো মানুষ পাইলাম না)।

শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক : সুমন কুমার সরকার (ন ডরাই)।

শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক : রিপন নাথ (ন ডরাই)।

শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা : খোন্দকার সাজিয়া আফরিন (ফাগুন  হাওয়ায়)।

শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যান : মো. রাজু (মায়া দ্য লস্ট মাদার)।


আপনার মন্তব্য