দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতা বেড়েছে। প্রশাসন এসব আয়োজনের নিরাপত্তা দিতে অপারগ। কারণ অহেতুক মব সৃষ্টি করে গানের আয়োজন থেকে শুরু করে বড় বড় অনুষ্ঠান ভন্ডুল হচ্ছে এখন। সব মিলিয়ে অনুমতি, নিরাপত্তা, বাজেট- সবই জটিল। এরপর স্পনসরদের আগ্রহ কমে গেছে। করপোরেট কোম্পানিগুলো এখন টিভি রিয়্যালিটি শো বা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করছে, মাঠের উৎসবে নয়। দর্শকের অভ্যাস বদলে গেছে আগেই। অর্থনৈতিক চাপে মানুষ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে। সংস্কৃতি এখন বিলাসিতা। সব মিলিয়েই মঞ্চের আলো নিভে যাচ্ছে...
ঢাকা একসময় উৎসবের শহর ছিল। শীত নামলেই চারপাশে সুর, আলো, আনন্দে মুখর হয়ে উঠত নগরজীবন। আর্মি স্টেডিয়াম থেকে বসুন্ধরা মাঠ, সেন্টার ফর দ্য আর্টস থেকে নাট্যশালা-যেদিকে তাকানো যেত, কোথাও না কোথাও বাজত বাঁশি, উঠত তবলার ঝংকার। এখন সেই শহরটিই যেন নিঃশব্দ। লোকসংগীতের বাউল সুর থেকে শুরু করে ক্লাসিক্যাল সংগীতের মৃদু তাল, সবকিছুই যেন হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে। ফোক ফেস্ট নেই, ক্লাসিক্যাল ফেস্ট নেই, থিয়েটার উৎসব, নৃত্য উৎসব-সবই কেবল অতীতের স্মৃতি। শহর হারাচ্ছে তার শিল্পরস, মানুষ হারাচ্ছে নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়।
থমকে যাওয়া উৎসব
মাটির গানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত হতো দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ লোকগানের উৎসব ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’। হিম শীতের সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দর্শক আর্মি স্টেডিয়ামে লোকগানের রথী-মহারথীদের পরিবেশনা বিপুল আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করতেন। সংগীতপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হতো আর্মি স্টেডিয়াম। আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ফোকফেস্ট সাঙ্গ হলেও এর রেশ নিশ্চয়ই শ্রোতা-দর্শকের হৃদয়ে রয়ে যেত অনেক দিন। বিশ্বের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের পাশাপাশি এ দেশের শিল্পীদের পরিবেশনায় মুগ্ধতা ছড়াত সবার হৃদয়ে। ২০১৫ সালে যখন প্রথম ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’ শুরু হয়, তখন মনে হয়েছিল এ দেশেও লোকসংগীতের নতুন জোয়ার উঠছে। লালন, শাহ আবদুল করিমের গানে মেতে উঠত হাজারো তরুণ। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি ইউরোপ থেকেও শিল্পীরা এসে এক মঞ্চে গাইতেন বাংলার বাউল গান। কিন্তু ২০২৩ সালের পর হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় সেই আয়োজন। বলা হয়, অনুমতি, স্পনসর আর নিরাপত্তার জটিলতা মেটানো সম্ভব হয়নি। কবে হবে ভাটির মানুষের প্রাণের লোকসংগীত উৎসব?
একই পরিণতি ‘বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’-এর। এর আগে প্রতি বছর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজন হতো সংগীতের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব’। শীতের হিম হাওয়া আর সংগীতসুধা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। সংগীতপিপাসুরা রাত জেগে উপভোগ করতেন দেশবিদেশ থেকে আসা সংগীতের নানা পর্যায়ের শিল্পীদের হৃদয়হরণ করা পরিবেশনা। অ্যাস্রাজ, সেতার, বাঁশি, ঢোল তবলা, হাঁড়িসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আর ক্লাসিক্যাল সংগীতে বুঁদ হয়ে থাকত দর্শক। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবটি ছিল সবার কাছে অন্যরকম একটি মহামিলনের। তবে মাঝের কয়েকটা বছর সরকারের অনুমতি না পেয়ে সংগীতপ্রেমীদের এই প্রাণের উৎসবটি বন্ধ হয়ে যায়। যে উৎসবটিতে রাত পোহাত রবিশঙ্করের সেতারের সুরে, জাকির হোসেনের তবলার তালে, সেই উৎসবও এখন নিভে গেছে। এদিকে বাউল উৎসব, রক-জ্যাজ উৎসব, ব্যান্ড ফেস্টিভ্যালও তেমন করে হচ্ছে না। সংস্কৃতির এ আয়োজনগুলো অনেকেই মিস করে। রাত জেগে জেগে যেসব গানের তালে উন্মাতাল হতো সংগীতপ্রেমীরা, যেসব আয়োজন কেন থেমে আছে, জানা নেই।

নাট্যমঞ্চেও নীরবতা
নাটকের শহর ঢাকাও এখন নীরব। আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে নাট্যশালায় নতুন নাটক উঠত, বাইরে থেকে নাটকের দল এসে মঞ্চস্থ করত সেরা প্রযোজনাগুলো-সেগুলো এখন অতীত। যদিও বা কিছু হচ্ছে, তাও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুদানে। যেগুলো এখন গোনা যায় হাতে। নাট্যকর্মীরা বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। নেই সংস্কৃতিসেবকদের সুদৃষ্টি। অন্যদিকে দর্শক কমে গেছে, তহবিল নেই, স্পনসরও আগের মতো আসে না। নৃত্য উৎসব, ছোটগল্প উৎসব, কবিতা পাঠ আসর-সবই ছুটির তালিকায়। একসময় নাট্যাঙ্গনের মানুষ বলতেন, ‘মঞ্চে আলো জ্বললেই দেশের প্রাণ জ্বলে।’ এখন সেই আলোও জ্বলে না নিয়মিত।
কনসার্টের করুণ বাস্তবতা
বছরের শেষ দিকে কনসার্ট ছিল তরুণদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ব্যান্ড এলআরবি, সোলস, মাইলস, রেনেসাঁ, দলছুট, অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডস, জেমস, হাসান, অবসকিউর, ডিফারেন্ট টাচ, সোনার বাংলা সার্কাস, শিরোনামহীন, চিরকুট, জলের গান, ‘আর্টসেল’, ‘ওয়ারফেজ’, ‘নেমেসিস’ কিংবা একক শিল্পী তাহসান, আসিফ, বাপ্পা, লিমন, প্রীতম-তাদের কনসার্ট মানেই উৎসবের উন্মাদনা। এখন সেই ঢাকাও ক্লান্ত। একসময় দেশের নামকরা নানা ব্যান্ড দল ও একক শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখর হতো দেশ। শীতকালে চাঙা হতে দর্শক নানাদিক থেকে ছুটে আসত গানে গানে মাতোয়ারা হওয়ার জন্য। উন্মাদনা, আবেগ আর গানের তালে তালে প্রিয় শিল্পীর জন্য ভালোবাসাও উপচে পড়ত কনসার্টে। শীতের হিম ঠান্ডার সঙ্গে প্রিয় শিল্পীর গানের ব্রেল্ড- সেই রকম ছিল। এখন সবই ইতিহাস। ক্যাম্পাস আর গানে গানে কাঁপে না। প্রিয় প্রেমিকার হাতে শিল্পীর গানের কথার চিরকুট গুঁজে দেওয়া যায় না কনসার্টের আয়োজনে। বড় কোনো কনসার্ট হয় না, নিরাপত্তার অজুহাতে অনুষ্ঠান বাতিল হয় মাঝপথে। মাঝে জেমসের কনসার্টও বাতিল হয়ে যায় হুমকির মুখে। আরও অনেক ব্যান্ডও কনসার্ট করতে পারছে না মবের কারণে। যে শহরে রাতভর গানের তালে মানুষ মাতত, সেই শহর এখন রাত ৯টার পর নিস্তব্ধ। তবু চিরসুন্দর এই উন্মাদনায় ফের ফিরতে চায় তারুণ্য। মিথ্যা কথার শহরে হানাহানি ভুলে প্রিয় ব্যান্ড শিল্পীর গানের উন্মাদনায় মাতবে কবে দেশের তারুণ্য? সেটা দেখার অপেক্ষায়...
তবু সীমিত পরিসরে শুরু কনসার্ট
১৪ নভেম্বর এক কনসার্টে গান শোনাবেন জেমস। রাজধানীর কুর্মিটোলার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে কনসার্টটি। এতে জেমসের সঙ্গে মঞ্চে গাইবেন পাকিস্তানের জুনুন ব্যান্ডের শিল্পী আলী আজমত। ‘লেজেন্ডস লাইভ ইন ঢাকা’ কনসার্টের সূত্র ধরে প্রথমবার একমঞ্চে মিলতে যাচ্ছেন দুই রক তারকা। যদিও জেমস ও তার ব্যান্ড ‘নগর বাউল’ সদস্যদের ব্যস্ত সময় কেটেছে বিভিন্ন দেশে আয়োজিত একাধিক কনসার্টে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। পার্থ বড়ুয়ার সোলস বাইরে একটানা শো করেছে। তাহসান ব্যস্ত ছিল দেশবিদেশের নানা শোতে। আসিফ, আতিয়া আনিসাও বাইরে কনসার্ট করেছেন একটানা। এদিকে ঢাকায় আসছে পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জল’। ‘সাউন্ড অব সোল’ নামের কনসার্টে অংশ নিতে চলতি মাসেই বাংলাদেশে আসবে দলটি। ২৮ নভেম্বর ঢাকার ৩০০ ফিট সংলগ্ন ‘স্বদেশ অ্যারেনা’ প্রাঙ্গণে হবে এই কনসার্ট। সেখানে জল ব্যান্ডের সঙ্গে আরও পারফর্ম করবে ব্যান্ড দল ‘ওয়ারফেজ’ ও ‘লেভেল ফাইভ’। সম্প্রতি কানাডা ট্যুর শেষে দেশে ফিরে আবারও কনসার্টে ব্যস্ত হয়েছে ‘ওয়ারফেজ’। ২৮ নভেম্বর ‘সাউন্ড অব সোল’ কনসার্টে অংশগ্রহণের আগে ২০ নভেম্বর আরও একটি কনসার্টে গান শোনাবে দলটি। ঢাকার কলেজ সেন্ট্রাল মাঠে আয়োজিত কনসার্টের মূল আকর্ষণ ‘ওয়ারফেজ’। ব্যস্ততা যাচ্ছে আরেক ব্যান্ড ‘অ্যাশেজ’র। ২৩ অক্টোবর থেকেই শুরু হয়েছে ব্যস্ততা, চলবে ডিসেম্বর পর্যন্ত। কনসার্টে ব্যস্ত সময় পার করছে ‘শিরোনামহীন’ ব্যান্ড। কানাডার টরন্টোতে শো শেষ করে এখন দেশে ফিরেছেন জিয়াউর রহমান, ইশতিয়াকের ব্যান্ডটি। দেশে ফিরে বছরের শেষ পর্যন্ত টানা কনসার্ট রয়েছে।
বন্ধ নৃত্য উৎসব-আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
তেমন করে সরব নেই নৃত্যশিল্পী-নৃত্যচর্চা কেন্দ্র। থমকে আছে নৃত্যাঙ্গন। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সাধনা, নৃত্যযোগ, সৃষ্টি কালচারাল সেন্টার, রেওয়াজ পারফর্মার স্কুল, ধৃতি নর্তনালয়, নৃত্যাঞ্চলের কার্যক্রম নেই। আর ভরা মৌসুমেও তেমন করে হচ্ছে না আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। নেই আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজনও। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে উৎসব করছে না ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিস অব বাংলাদেশ।