অন্যদিন লিখেছিল, ‘মন কেমন করা একটি চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’। প্রেমের ছবি। দুজন মানব-মানবীর ভালোবাসার গল্প। সোনাই ও পরীর প্রেমের উপাখ্যান। ব্যথা-জাগানিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস। এ দেশের জল-মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাজার বছরের বাংলাদেশ এখানে কথা বলে ওঠে।’ আসলে তা-ই। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে পরিচ্ছন্ন ছবির অভাবে দর্শক যখন সিনেমা হলবিমুখ হয়ে পড়ে, চলচ্চিত্রজগৎ যখন প্রচণ্ড খরায় আক্রান্ত, তখনই সেই খরার মাঝে স্বস্তির বৃষ্টি বয়ে এনেছিলেন নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম তাঁর সুনির্মিত ছবি ‘মনপুরা’র মাধ্যমে। ‘মনপুরা’কে শুরুতে টিভি নাটক হিসেবে লিখেছিলেন সেলিম, ১৯৯৭ সালে। সেই সময় পরীর চরিত্রে সিলেক্ট করেছিলেন আফসানা মিমিকে। কিন্তু আফসানা মিমি নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ে সেলিমকে বলেছিলেন, এটি কিন্তু সিনেমা হতে পারে। তুমি এটি দিয়ে সিনেমা করো। মিমির মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ‘মনপুরা’ নির্মাণে সেলিম হাত দেন ২০০৭ সালে। শুরুতে ‘মনপুরা’র প্রযোজক ছিল এনটিভি। কিন্তু এনটিভিতে তখন আগুন লাগার ফলে তারা মনপুরা প্রযোজনায় অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে গিয়াসউদ্দিন সেলিম নিজের এবং কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছবিটি নির্মাণে হাত দেন। একপর্যায়ে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন তিনি। এরপর সেলিম স্কয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি এককথায় রাজি হয়ে যান। দেশের কয়েকটি জায়গায় শুটিং করেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। পরী চরিত্রের জন্য ফার্স্ট চয়েস ছিলেন আফসানা মিমি। অতঃপর জয়া আহসান, তারপর প্রভা, সব শেষে ফারহানা মিলি। মিলিই রুপালি পর্দায় পরীকে জীবন্ত করে তুলেছেন। সোনাই চরিত্রের জন্য সেলিম প্রথমে ভেবেছিলেন রিয়াজকে। যখন পরীর চরিত্রে জয়াকে ভেবেছিলেন সেলিম তখন তাঁর বিপরীতে মানানসই মনে হচ্ছিল রিয়াজকে। কিন্তু তা না হওয়ায় পর চঞ্চল চৌধুরীকে সিলেক্ট করেন সোনাই চরিত্রে। ২০০৭ সালের মে মাসে ‘মনপুরা’র ক্যামেরা ওপেন হয়। প্রথম শটটি ছিল মনপুরা দ্বীপে। সোনাই ময়নাসহ খাঁচা এবং জিনিসপত্র নিয়ে শনে-বাঁধা ঘরের দিকে যাচ্ছে। ছবির নেপথ্যে শোনা যায়, ‘নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে’ গানটি। প্রায় ৫০ দিন যমুনার চর, কুষ্টিয়া, পুবাইল এবং এফডিসিতে ছবিটির শুটিং হয়েছে। শুটিং শেষ করতে বছরখানেক সময় লাগে। দ্বীপের সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে সোনাই এবং পরী, টপ শটে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে দুজন। এই শটটি নেওয়া হয় যমুনার চরে। ওপরে দাঁড়ান ক্রেনের মাধ্যমে। আরেকটি টপ শট রয়েছে ছবিটির শেষে। দেখা যায় গন্তব্যহীন যাত্রা করছে সোনাই। এই টপ শটটি ধারণ করা হয়েছে কুষ্টিয়ার গড়াই ব্রিজের ওপর থেকে। শুরুতে ‘মনপুরা’ দেশের মাত্র ছয়টি হলে মুক্তি পেয়েছিল। পরে দর্শক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে হলের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়। ‘মনপুরা’ ব্যবসার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ঢাকার বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে একটানা ৯ মাস ছবিটি চলেছিল। অন্যদিকে বলাকা সিনেমা হলে চলেছিল ছয় মাস। গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, ছবিটির নির্মাণে খরচ হয় ২ কোটি টাকা। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর সব শ্রেণির দর্শকের মন জয় করে। বোদ্ধা দর্শকদের অনেকে প্রশংসা করেন। যেমন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক দিন গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছবিটি আমি দুবার দেখেছি।’