কলকাতা চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তি একজন অস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, অন্যজন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। সুনিপুণ কাজের জন্য তাঁরা শুধু নিজ দেশ ভারত নয়, বিশ্ববাসীও তাদের কোনো দিন ভুলতে পারবে না। মহানায়িকার তকমা পাওয়া সুচিত্রার অভিনয় দক্ষতা বরাবরই মুগ্ধ করেছে সিনেপ্রেমীদের। টলিউড থেকে বলিউড সর্বত্রই দাপট চলেছে তাঁর। অথচ বাংলার প্রথম অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কখনোই কাজ করতে দেখা যায়নি সুচিত্রা সেনকে। কেন কখনোই এ দুই তারকা জুটি বাঁধলেন না সে প্রশ্ন রয়ে গেছে অভিনেত্রীর বহু ভক্তের মনে। একজন ছিলেন টলিউডের প্রথম সারির পরিচালক। অন্যজন মহানায়িকা। অথচ এ দুজন কখনো একসঙ্গে হলেন না ফ্রেমবন্দি। তবে টলিপাড়ায় কান পাতলেই শোনা যায় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার সুপ্ত ইচ্ছা ছিল অভিনেত্রীর মনে। কিন্তু জনপ্রিয় পরিচালক নাকি বেঁধে দিয়েছিলেন বেশ কিছু কঠিন শর্ত। আর সেই শর্ত মেনে নিতে না পারায় হয়নি তাঁদের একসঙ্গে কাজ করা। ‘পথের পাঁচালি’, ‘অপুর সংসার’-এর মতো একগুচ্ছ আইকনিক ছবি তিনি উপহার দিয়েছেন দর্শককে। তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন টলিউডের নায়ক-নায়িকারা। অথচ মহানায়িকার সঙ্গে কাজ করলেন না তিনি। যদিও ইচ্ছা ছিল উভয়েরই; কিন্তু হয়নি ফলপ্রসূ। ছবির প্রস্তাব পেয়েও মুখের ওপরই নাকি ‘না’ করে দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন।
সত্যজিৎকে কেয়ার করতেন না সুচিত্রা
সত্যজিৎ রায় তখন চারুলতার শুটিং করছেন টালিগঞ্জের এনটি-১ স্টুডিওতে। ঠিক পাশের ফ্লোরে তখন ‘গৃহদাহ’-এর শুটিং করছেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু সুচিত্রা ওসবের কেয়ারই করতেন না। সত্যজিৎ সম্পর্কেও তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। শুটিং ছাড়া বেশির ভাগ সময়টা থাকতেন তাঁর জন্যই বরাদ্দ মেকআপ রুমে। সেখানে কারও কোনো প্রবেশাধিকারই ছিল না। সেই যুগের নায়িকাদের সঙ্গে সুচিত্রার একটা বড় ফারাক ছিলো। অভিনয়, সাজগোজ, চলন, লিপ দেওয়া-সবই যেন উনি বদলে দিয়েছিলেন। আগে একরকম স্টাইল ছিল, সুচিত্রা তার থেকে বেরিয়ে এলেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি যে এত সাফল্য পেয়েছিল এর কারণ- এক. শক্তিশালী অভিনয়। দুই. তৎকালীন চলচ্চিত্র পরিচালকদের সৌন্দর্যবোধ। এ সৌন্দর্য বোধের সঙ্গে দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে যে কোনো চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন তাঁরা। এজন্যই উত্তম-সুচিত্রা স্থায়ী আসন পান মানুষের মনে।
দেবী চৌধুরাণীর প্রস্তাব দেন সত্যজিৎ : ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ অবলম্বনে একটি ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। নায়িকার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন সুচিত্রাকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সুচিত্রার প্রতি সত্যজিতের শর্ত ছিল এমন- এ ছবির কাজ চলাকালীন অন্য কোনো ছবির প্রস্তাবে রাজি হতে পারবেন না সুচিত্রা। তাকে শুধু ‘দেবী চৌধুরাণী’র চরিত্রের ওপরই মনোনিবেশ করতে হবে। পরিচালকের বেঁধে দেওয়া এ নিয়ম কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি সুচিত্রা। জানা যায়, ওই সময় মহানায়িকার হাতে ছিল বহু কাজের প্রস্তাব। এমনকি অসংখ্য ছবির জন্য সই করে ফেলেছিলেন তিনি। কথার খেলাপ করা মোটেই সম্ভব ছিল না অভিনেত্রীর পক্ষে। তাই তিনি মুখের ওপরই না করে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে। আর সে কারণেই একসঙ্গে কোনো কাজ করা হলো না সুচিত্রা আর সত্যজিৎ রায়ের। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সত্যজিৎ রায় আসলে ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে ‘দেবী চৌধুরাণী’ অবলম্বনে একটি ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেখানে নিঃসন্দেহে নায়িকার ভূমিকাতে সুচিত্রার কথাই ভাবা হয়েছিল। সত্যজিৎ রায় একান্তভাবে চেয়েছিলেন সুচিত্রাই এ চরিত্রটি করুন। এদিকে সুচিত্রাকে না পেয়ে ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিটাও আর বানাননি সত্যজিৎ রায়। তবে সুচিত্রা অবশ্য পরে দিনেন গুপ্তার ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিতে কাজ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো নাকি জনমনে আক্ষেপ রয়ে গেছে সত্যজিৎ আর সুচিত্রাকে এক ফ্রেমে না পাওয়ার। এ দুজনই এখন অনন্তলোকের চির বাসিন্দা। তাই দুজনের ভক্তদের মনোবাসনা পূরণ হওয়ার সুযোগ হয়ে গেল তিরোহিত।