মুক্তিযুদ্ধের সময়টা ছিল উত্তাল। গোটা দেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক আবুল হায়াত। সে সময়কার স্মৃতি রোমন্থন করেছেন তিনি। লিখেছেন-পান্থ আফজাল
স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা ছিল। স্মৃতির পাতা থেকে কিছু বলবেন কি?
তখন আমি ঢাকা শহরে ছিলাম। তবে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করিনি। মাঝে মাঝে বন্ধুরা এলে তাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর জানতাম, খোঁজ নিতাম। মূলত তারাই আমাকে দেশের সমস্ত অবস্থার কথা বলত। আমি মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত একটানা অসুস্থ ছিলাম। ভর্তি হলাম হাসপাতালে। আমি ২৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত কোমাতে ছিলাম। আর এই অসুস্থতা থাকা অবস্থাতেই আমার প্রথম সন্তান বিপাশার জন্ম হয়। সেই সময় স্বাধীনতার যুদ্ধ চরম রূপ ধারণ করে। তবে বাচ্চার জন্ম ও অসুস্থতা থাকার কারণে যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তখন গ্রামে ছিলাম। বাকি সময় ঢাকাতেই ছিলাম। তবে ’৬৯, ’৭০ ও ’৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কিন্তু আমরা দল বেঁধে নাটক করেছি। সেই সময় সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সবাই যুক্তও ছিলাম। সবাই মিলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছি।
জেনেছি, অলৌকিকভাবে একবার বেঁচেও গিয়েছিলেন আপনি...
দুবার মিলিটারি রেইড করেছিল। এর মধ্যে একবার মিলিটারিরা আমাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তবে সে যাত্রায় আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই। সেটা ডিসেম্বর ১ তারিখের কথা।
সেই উত্তাল সময়ে নাট্যবিপ্লবের সঙ্গে আর কে কে ছিলেন?
সেই সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে এ দেশের অনেক শিল্পীই যুক্ত ছিলেন। তবে আমার সম্ভব হয়নি ওখানে কাজ করার। আমি তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল অনেক দূরে। তবে আমি অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে সে সময় কাজ করেছি। তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন ড. ইনামুল হক ভাই, গোলাম রাব্বানি ভাই, হাসান ইমাম ভাই, আবেদ খান, ফখরুল ভাইসহ আরও অনেকেই। যাদের অনেকের নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সবাই সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ, সৃজনী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী এবং আমরা ক‘জনা-এই তিন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ঢাকার রাস্তায়, শহীদ মিনার, জগন্নাথ হলসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আমরা অনেক মুক্তিযুদ্ধের নাটক, পথনাটক ও কোরাস গান করেছি।
কোন ধরনের নাটক তখন বেশি করতেন?
তখন তো নাটক দিয়েই আমাদের আন্দোলন চালিয়েছি। মূলত সব নাটকই ছিল সংগ্রাম ও বিপ্লবকে উপলক্ষ করে। একসময় পাকিস্তানি শাসকরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক নিষিদ্ধ করে। কিন্তু আমরা সেই নিষেধ অমান্য করে ঢাকার মাঠে-ঘাটে, হলে, শহীদ মিনারে, ট্রাকে নাটক করেছি। সেই সময় করেছি রক্তকরবী, বৈকুণ্ঠের উইল, রক্ত দিলাম স্বাধীনতার জন্য, চাঁদ উঠবে এখনি, আবর্তনসহ প্রচুর নাটক। বিপ্লব ও সংগ্রাম উপজীব্য এ নাটকগুলো আমরা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করেছি। তখন এক একটা নাটকের ব্যাপ্তি কখনো ছিল ৩০ মিনিট, কখনো এক ঘণ্টার বা তারও বেশি। হাসান ইমাম ভাই আমাদের দলের প্রধান ছিলেন। তাঁর পরিচালনায় আমরা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে, পথে-ঘাটে, মঞ্চে দল বেঁধে নাটক করতাম। আর আমাদের গানের গুরু ছিলেন আমরা ক‘জনার আরিফুল হক ভাই। আমরা ঢাকার এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে ঘুরে এসব নাটক প্রদর্শন ও কোরাস গান গাইতাম।
স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে?
এখনো আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তথ্য উদ্ধারে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো অনেক কিছু জানার বাকি আছে। এসব তথ্য উদ্ধারে কেউ প্রপারলি কাজ করছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে আমার জানামতে, রশিদ হায়দার ভাই, বাংলা একাডেমিসহ অনেকেই কিছুটা কাজ করেছেন। সেই সময়কার কিছু কাজ, প্রযোজনা ছিল যা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর তথ্য নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। আর এসব বিষয় নিয়ে বর্তমান প্রজন্ম জোরালোভাবে এগিয়ে আসবে বলে আশা করছি।
স্বাধীন দেশের কাছে প্রত্যাশা কী?
অনেক কিছুই পেয়েছি। দেশ পেয়েছি, একটি পতাকা পেয়েছি। আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পেয়েছি। এর থেকে বড় পাওয়া আর কিছুই হতে পারে না! এই ঋণ শোধ হবার নয়। আমি এই স্বাধীন দেশে বসবাস করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।