বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্ম ১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খান পরিচালিত ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির মাধ্যমে। এরপর ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ছিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে দর্শক উৎসবের আমেজে সিনেমা হলে ছুটে যেতেন ছবি দেখত। টিকিট পাওয়া যেত না সহজে। কালোবাজারিদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে সিনেমার টিকিট কিনতেও দ্বিধা করতেন না কেউ। কারণ এ দেশে তখন প্রধান বিনোদন মানেই সিনেমা। একদিকে কালজয়ী সব সিনেমা নির্মাণ হতে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে সিনেমা হলের সংখ্যা।
যেভাবে সুদিন হারাল
একটা সময় দেশীয় সিনেমার এই সুদিন হারিয়ে যায়। বলতে গেলে ১৯৯৭ সাল থেকেই অশ্লীলতার তাণ্ডব শুরু হলো দেশের চলচ্চিত্রে। সে সময়ে বছরে ৮০টির বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু শতকরা ৯৯ ভাগই ছিল অশ্লীলতার দোষে দুষ্টু। সুশীল সমাজ ও রুচিসম্মত দর্শক এতে বাধ্য হয়ে সিনেমা হলে যাওয়া ছাড়লেন, টেলিভিশনমুখী হয়ে গেলেন এবং বিদেশি চলচ্চিত্রে বেশি আকৃষ্ট হলেন।
অশ্লীল নায়ক-নায়িকার আবির্ভাব
এ সময়ে অশ্লীল ছবির নায়িকার তালিকায় মুনমুন, ময়ূরী, পলি, নদী প্রমুখরা শীর্ষে পৌঁছে গেলেন। এ ঘরানার নায়ক হিসেবে আলেকজান্ডার বো লিডে চলে এলেন। মান্না তো আগে থেকেই ছিলেন। রুবেলের উপস্থিতিও ছিল দেখার মতো। এতে রিয়াজ-ফেরদৌসের উপস্থিতি খানিকটা কমে গেল। অমিত হাসান এই সারিতে ঢুকে গেলেন। ডন, মেহেদী, সোহেল, আসিফ ইকবাল, আবরাজ খান, শিখা, ঝর্ণা, শাপলা, শায়লা ও নাম জানা-অজানা অনেকে অশ্লীল নায়ক-নায়িকার তালিকায় যুক্ত হলেন। নব্বইয়ের দশকের নিয়মিত ও পরিচিত মুখ নাসরিন ছিলেন অশ্লীল যুগের কি-রোলে। প্রায় সব ছবিতেই তার উপস্থিতি থাকত এবং অশ্লীল দৃশ্যেও তিনি ছিলেন পেশাদার।
অশ্লীল যুগে যেমন সিনেমা
অশ্লীল যুগে নানা রকমের সিনেমা হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত পুরোদমে এবং তারপর থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিরতি দিয়ে চলল। ছবি মুক্তির পরিমাণ কমে গেল। অশ্লীল যুগের এই তপ্ত হাওয়া থেকে বছরে সর্বোচ্চ ১০টা ছবি গা বাঁচাতে পেরেছে। বাকি প্রায় সব ছবিই এই জ্বরে আক্রান্ত। ১৯৯৭-২০০৭ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০০ চলচ্চিত্র হয়েছে। সব প্রোডাকশনই এ ধরনের কম-বেশি সিনেমা নির্মাণ করেছে। তবে বিতরণের দিক থেকে লাভা ভিডিও ছিল উল্লেখযোগ্য। লাভা ভিডিও মূলত অশ্লীল যুগকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এ যুগের অধিকাংশ ছবিই মানের দিক থেকে খুবই নিম্ন। প্রায় প্রতিটারই গল্প একই রকম।
অশ্লীল সিনেমার ধাপ
অশ্লীল সিনেমার যুগকে চার ধাপে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ধাপে নায়িকাদের তুলনামূলক ছোট জামা পরানো হতো। দ্বিতীয় ধাপে সাদা জামা পরে বৃষ্টিতে ভেজা, গোসলের দৃশ্য, পোশাক পরিবর্তনের দৃশ্য ইত্যাদি। তৃতীয় ধাপে বিদেশি পর্নোগ্রাফির কাটপিস এবং সবার শেষ ধাপে দেশীয় নায়িকারাই এসব দৃশ্য করেছেন। অশ্লীল যুগের ট্রেডমার্ক অর্থাৎ চতুর্থ ধাপের ছবিগুলো হলো- দুর্র্ধর্ষ সামসু, নষ্টা মেয়ে, জাঁদরেল, জাল, জাতশত্রু। এগুলোতে কোনো কাটপিস নেই। সরাসরি অভিনেত্রীরাই যৌন দৃশ্যে অভিনয় করেন। একেবারে পর্নোগ্রাফির ধরনে দেশি নায়িকাদের রগরগে যৌন দৃশ্য বেশ সময় নিয়ে দেখানো হয়। ওই ১০ বছর এই পাঁচ ছবি আলোচনায় থেকেছে। মোহাম্মদ হোসেনের ‘অবুঝ দুটি মন’। এই সিনেমায় প্রথম বাংলাদেশের কোনো নায়িকাকে সুইমিংপুলে গোসলের দৃশ্য দেখানো হলো। নায়িকা ছিলেন মডেল রথি (গুরু জেমসের প্রথম স্ত্রী)। আবুল খায়ের বুলবুলের অন্যায়-অত্যাচার ছবিতে পাহাড়ি ঝরনায় গোসলের দৃশ্য দেখা গেল। মোহাম্মদ হোসেন পরে বানালেন ‘রাঙা বউ’। এবার নায়িকা কলকাতার ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা। এ ছবি আলোড়ন তুলল এক শ্রেণির দর্শকের কাছে রগরগে দৃশ্যের কারণে। এই ধারায় আরও ছিল এনায়েত করিমের জননেতা, কদম আলী মাস্তান, ক্ষুধার জ্বালা, ইস্পাহানি আরিফ জাহানের গোলাম, বাদশা ভাই, ভয়াবহসহ আরও অনেক সিনেমা। জননেতা ছবিতে প্রথমবার বাংলাদেশে সরাসরি উন্মুক্ত বক্ষ প্রদর্শন করা হলো। কদম আলী মাস্তানও অশ্লীলতার দিক দিয়ে স্মার্ট। ভয়াবহ ছবিতে বি-গ্রেডের নায়িকার আমদানি ঘটল। শরিফুদ্দিন খান দিপু বানিয়েছিলেন বাঁচাও দেশ, পুলিশ অফিসার।
কারা অশ্লীল সিনেমা বানাতেন
অশ্লীল যুগের সিনেমা বানাতেন মূলত এনায়েত করিম, মোহাম্মদ হোসেন (ফায়ার), শরিফুদ্দিন খান দিপু (হীরা আমার নাম), স্বপন চৌধুরী, শাহাদাৎ হোসেন লিটন (কঠিন শাস্তি), বাদশা ভাই (লণ্ডভণ্ড, জোগি ঠাকুর), বদিউল আলম খোকন (দানব), রাজু চৌধুরী, এম এ আউয়াল, পল্লী মালেক (ঢাকার কুতুব), এম বি মানিক (জাঁদরেল), শাহিন-সুমন (নষ্ট), মোস্তাফিজুর রহমান বাবু (স্পর্ধা), উত্তম আকাশসহ আরও অনেকে।
কোথায় নির্মিত হতো
এসব ছবি নির্মিত হয়েছে এফডিসিতে। কাকরাইলে প্রস্তুত হয়ে, সেন্সর বোর্ড ফাঁকি দিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। এ এক অন্ধকার যুগ। কারণ এফডিসিতে তখন ব্যাপক অরাজকতা চলেছে। নব্বইয়ের দশকে যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল তা হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল প্রমুখের মতো পরিচালকরা চাপে পড়ে গেছেন। সিনেমা বানানো বন্ধ করে দিয়েছেন। তৈরি হয়েছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। সরকার থেকে শুরু করে গ্রামের হল পর্যন্ত যার বিস্তার। সারা দিন এফডিসিতে অখণ্ড নীরবতা, সন্ধ্যার পরেই আলো জ্বলে উঠেছে সবখানে। শুরু হয়ে যেত তুমুল ব্যস্ততা। ফ্লোরে ফ্লোরে চলত শুটিং। মদ-গাঁজা-হেরোইনের গন্ধে মাতাল এফডিসি। সিনেমার কাজে নিরাপত্তা দরকার হয়। ভালো কাজে পুলিশ নিরাপত্তা দেয়, খারাপ কাজে দেয় মাস্তানরা। এফডিসি পরিণত হয় অনৈতিক কাজের আখড়ায়। এ সময় নতুন একঝাঁক নারী দিয়ে ভরে যায় এফডিসি। সংখ্যার তারা প্রচুর, চলছে তাদের স্বপ্ন দেখানো, চলছে নষ্টামি। চারদিকে টাকা ও যৌনতার ছড়াছড়ি। বেশ একটা ফুর্তি ফুর্তি ভাব। সবার মধ্যেই উল্লাস। যখন-তখন জামাকাপড় খুলতে হচ্ছে, জামাকাপড় না খুললে সেই ছবি লোকে দেখে না।
কেন অশ্লীলতায় জড়িত হলেন নায়িকারা
সে সময় সব নায়িকাই যে স্বেচ্ছায় এসব কাজ করেছেন তা কিন্তু নয়। নতুন নায়িকাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, পরে জামা খোলার কথা বলা হয়েছে। তারা রাজি হননি অনেক সময়, তখন চুক্তির আইনি ভয় দেখানো হয়েছে, জোর করা হয়েছে, ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। মাস্তানদের গান পয়েন্টেও অনেক নায়িকা এসব দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। অনেক সময় মাদকাসক্ত করে অভিনয় করানো হয়েছে। অনেক ছবির দৃশ্য লক্ষ্য করলেই এই অচেতন অবস্থা ধরা পড়ে। অনেক সময় নায়িকার মুখ না দেখিয়ে শুধু বিবস্ত্র শরীর দেখানো হয়েছে, নারী নিশ্চিতভাবে অচেতন এবং পুরুষের হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে তার শরীরে। অধিকাংশ নায়িকাকে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছে- যতটুকু সে করতে চায় তার থেকে বেশি করার জন্য ধারাবাহিক চাপ দেওয়া হয়েছে।
তৈরি হলো সিন্ডিকেট
অশ্লীল সিনেমা ঘিরে তৈরি হলো সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের কাছে দর্শক যেমন অসহায় ছিলেন, তেমন ছিল সমাজ, রাষ্ট্র, সিনেমা হল, সিনিয়র আর্টিস্ট ও নায়িকারাও। এফডিসি তখন এই সিন্ডিকেটের দখলে, সিনেমার মতোই। নগ্ন হামলা অনেকেরই খুব পছন্দের একটি ছবি। এখানে নায়িকা নদীর চরিত্রটি দেখলে এফডিসির তখনকার স্বভাব খানিকটা বোঝা যাবে। বোঝা যাবে নীতিমানদের ফ্যান্টাসি তখন কী ছিল। মূলত তখন ছবি বানানো হতো একটা ছোট অংশের দর্শকের ওপর নির্ভর করে। তাদের মন রাখার জন্য প্রায় সবকিছু করা হয়েছে।
নামি নির্মাতাদের ভূমিকা
নামিদামি জনপ্রিয় পরিচালকরাও এই সিন্ডিকেটের কাছে ছিলেন অসহায়। তারা বৈপ্লবিক কিছু না করে ‘পুওর টেকনিক’-এর দিকে হেঁটেছেন। চলতি হাওয়ায় গা ভাসিয়েছেন। তা ছাড়া অনেক কিছু থেকে বিরত থেকেছেন, সংযত রেখেছেন নিজেকে। কিন্তু তাতেও তারা অশ্লীল সিনেমা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।
যেভাবে অবসানের শুরু
বাংলা চলচ্চিত্রের ভয়ংকর অশ্লীলতার যুগ ২০০৬ সালে এসে কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়। ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এর প্রকোপ কিছুটা স্তিমিত হলো। র্যাব হানা দিল কাকরাইলের অফিসগুলোতে। জব্দ করল হাজার হাজার কাটপিস, অগণিত নীল ছবি, অসংখ্য অশ্লীল পোস্টার। ২০০৭-এর শুরুর দিকে এফডিসি এবং ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন অঙ্গনে শুরু হলো প্রতিরোধ। শুরু হলো অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলন। আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন নায়ক মান্না। সঙ্গে যোগ দিলেন কিছু শুভাকাক্সক্ষী। থাকলেন পরিচালক মালেক আফসারী ও ভিলেন ডিপজল। যদিও এরা সবাই অশ্লীল যুগে সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনকে সমর্থন দিল গণমাধ্যম। ২০০৭ সালের পর শাকিব-শাবনূর অভিনীত ছবি দিয়ে হাওয়া খানিকটা বদল হয়। তারপর ডিপজল এসে শাকিবকে নিয়ে কিছু সিনেমা নির্মাণ করেন, যার কারণে ইন্ডাস্ট্রি অশ্লীল যুগ থেকে একরকম মুক্তি পায়।