ঢাকার সিনেমার যাত্রা ১৯৫৬ সালে। মানে পঞ্চাশের দশক থেকে। এ দেশের বেশির ভাগ সিনেমা নায়কনির্ভর। পঞ্চাশ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোন দশকে কোন নায়ক জনপ্রিয় তা তুলে ধরেছেন - আলাউদ্দীন মাজিদ

পঞ্চাশের দশকে আমিনুল হক
এ দেশের প্রথম বাংলা সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’। আবদুল জব্বার পরিচালিত এ সিনেমার নায়ক ছিলেন আমিনুল হক। ১৯৫৬ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। এ সিনেমার সাফল্যে নায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে যান আমিনুল। এরপর এ নায়ক বেশ কিছু সিনেমা করেছেন। ‘আকাশ আর মাটি’ তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় সিনেমা।

ষাটের দশকে রহমান-আজিম
ষাটের দশকের নায়কদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পান তিনি হলেন রহমান। ‘চান্দা’, ‘তালাশ’, ‘হারানো দিন’ ‘দরশন’সহ আরও অনেক দর্শকপ্রিয় সিনেমার নায়ক হয়ে রহমান আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভ করেন। একই সঙ্গে এ দশকের আরেক সাড়া জাগানো নায়ক ছিলেন আজিম। তাঁর অভিনীত ডাকবাবু, আয়না ও অবশিষ্ট, সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, সাত ভাই চম্পা, অরুণ বরুণ কিরণমালা, পাতালপুরীর রাজকন্যা, আমির সওদাগর ভেলুয়া সুন্দরী, মলুয়া, নয়নতারা প্রভৃতি সিনেমা কালজয়ী হয়ে আছে।

সত্তরের দশকে নায়করাজ রাজ্জাক
১৯৬৪ সালে ‘বেহুলা’ সিনেমা দিয়ে অভিনয়ে আসেন রাজ্জাক। ষাটের দশকের কিছুটা সময় পান তিনি। সত্তরের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কের নাম রাজ্জাক। সামাজিক, রোমান্টিক, অ্যাকশন ঘরানা-সব রকমের সিনেমায় রাজ্জাক নিজেকে জনপ্রিয়তার অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। লাভ করেন বিপুল দর্শকপ্রিয়তা। তাঁর অভিনীত বেঈমান, বদনাম, রংবাজ, অনন্ত প্রেম, বাবা কেন চাকর, নীল আকাশের নীচে-সহ প্রায় সাড়ে তিন শ ছবি এখনো দর্শকমনে গেঁথে আছে। তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।
আশির দশকে জাফর ইকবাল-ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না
আশির দশকের জনপ্রিয় নায়কের নাম জাফর ইকবাল। তাঁর অনেক হিট সিনেমা রয়েছে। যেমন ‘এক মুঠো ভাত’, ‘আপন পর’, ‘লক্ষ্মীর সংসার’, ‘ভাই বন্ধু’, ‘সন্ধি’ প্রভৃতি। আশির দশক মাতান আরও দুই নায়ক। তাঁরা হলেন ওয়াসিম ও জসিম। সত্তরের দশকে চলচ্চিত্রে আসেন এবং আশির দশকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান ইলিয়াস কাঞ্চন। এ নায়কের প্রথম সিনেমা ‘বসুন্ধরা’ মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। তাঁর অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা। এ দশকে একদিকে রুবেল অ্যাকশন ঘরানার নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন, অন্যদিকে মান্না অভিনীত প্রচুর সিনেমা মুক্তি পায় এবং তা হিট হতে শুরু করে।
নব্বইয়ের দশকে নাঈম-সালমান শাহ-রিয়াজ-ফেরদৌস-শাকিল খান
নব্বইয়ের দশকটি ছিল ঢাকার সিনেমার জন্য সুন্দর সময়। ১৯৯১ সালে তরুণ প্রজন্মকে হলমুখী করেন ওই সময়ের নতুন নায়ক নাঈম। এহতেশামের ‘চাঁদনী’ সিনেমা দিয়ে বাজিমাত করেন নাঈম। তারপর তাঁর অভিনীত সিনেমা একের পর এক ব্যবসাসফল হতে শুরু করে। এ দশক পায় আরও একজন জনপ্রিয় নায়ক। তাঁর নাম ওমর সানী। নব্বইয়ের দশকেই আগমন ঘটে দেশীয় সিনেমার ইতিহাসে অসম্ভব জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর। ১৯৯৩ সালে সালমান শাহ ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমা দিয়ে সফল যাত্রা শুরু করেন। ২৭ জনপ্রিয় ছবি উপহার দিয়ে ১৯৯৬ সালে অকালে প্রয়াত হন সালমান। আমিন খান ‘অবুঝ দুটি মন’ সিনেমা দিয়ে এই দশকে জয় করে নেন দর্শকমন। নব্বইয়ের দশকেই আসেন নায়ক রিয়াজ, ফেরদৌস এবং শাকিল খান। ফেরদৌস ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ করে নতুন চমক সৃষ্টি করেন। শাকিল খান ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’ সিনেমা দিয়ে টিকে যান সিনেমায়। শাবনূরের সঙ্গে জুটি হয়ে রিয়াজ প্রচুর হিট সিনেমা উপহার দিয়ে যান।

শূন্য দশকে শাকিব খান
১৯৯৯ সালে ঢাকার সিনেমা পায় আরেকজন নায়ক। নাম শাকিব খান। ’৯৯ সালে চলচ্চিত্রে এলেও ২০০০ সাল, মানে শূন্য দশক থেকে একটানা বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ২৬ বছর ধরে শাকিব খান আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা নিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন। ঢাকার সিনেমার ইতিহাসে কোনো নায়ক এতদিন টানা জনপ্রিয়তা ধরে রেখে কাজ করে যেতে পারেননি। এটা শাকিব খান এবং দেশের সিনেমার জন্য একটি অনন্য রেকর্ড।

সত্তরের দশকে আরও একঝাঁক নায়ক
ফারুক, উজ্জল, সোহেল রানা, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, জাভেদ প্রমুখ নায়কদের আগমন ঘটে। এসব নায়ক যার যার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ঢাকার সিনেমায় ভালো অবস্থান করে নেন। সবারই রয়েছে অসংখ্য হিট সিনেমা। ফারুক অভিনীত সুজন সখী, নয়ন মনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, লাঠিয়াল, সাহেব, মিয়া ভাই প্রভৃতি সুপারহিট সিনেমা। আরেক নায়ক উজ্জলকে বলা হতো মেগাস্টার। তাঁর অনেক সিনেমা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যেমন বিনিময়, বন্ধু, সমাধি, নসিব, উছিলা, নিয়ত প্রভৃতি। সোহেল রানা তাঁর অভিনয় গুণ দিয়ে জয় করে নেন দর্শকমন। অনেক হিট সিনেমা আছে তাঁর। যেমন মাসুদ রানা, এপার ওপার, মা, মিন্টু আমার নাম প্রভৃতি। আলমগীর সামাজিক ঘরানার সিনেমা করে মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করেন। যেমন মায়ের দোয়া, নিষ্পাপ, মরণের পরে, শিল্পী, মণিহার প্রভৃতি। বুলবুল আহমেদকে এখনো দেবদাস বলা হয়। তিনি দেবদাস সিনেমায় নাম-ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেন। তাঁর আরও জনপ্রিয় সিনেমার মধ্যে রয়েছে সোহাগ, ঘর সংসার, বৌরানী, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, মহানায়ক, ভালো মানুষ, আরাধনা প্রভৃতি।