প্রয়াত অভিনেতা রাজ্জাক। প্রায় ছয় দশক এ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন। যাদের অভিনয়ে বাংলা চলচ্চিত্র গড়ে উঠেছে, তাদের প্রধান ব্যক্তি রাজ্জাক। পেয়েছেন নায়করাজ উপাধি। আজ কিংবদন্তি এ অভিনেতার ৮৪তম জন্মদিনে জীবদ্দশায় তাঁর বলা কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
ফুটবল ছিল আমার প্রিয়
জীবদ্দশায় নায়করাজ রাজ্জাক এক স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ফুটবল ছিল আমার খুব প্রিয়। ক্রমেই তাঁর সঙ্গে এসে যুক্ত হলো নাটক। দুটো ক্ষেত্রেই সমান আগ্রহবোধ করতাম। নাটকটা আমার কাছে এলে নেশাতেই পরিণত হয়েছিল।
প্রথম নাটকের স্মৃতি
আমি বোধহয় তখন ক্লাস এইটে। সেই সময়েই ঘটল ঘটনাটা। আমাদের স্কুলে একটা নাটক হবে শুনলাম। নাটকটি ছিল আমাদের পাড়ারই এক ভদ্রলোক যতিময় ব্যানার্জীর লেখা ‘নতুন ইহুদি’। এই নাটকে একটি কিশোর ছেলের চরিত্র ছিল। ছেলেটি স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। পাশাপাশি হকারি করে। এই চরিত্রটিতেই অভিনয় করি। নাটকের দিন চিফ গেস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। সেদিনের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। এমনিতে অভিনয়ের ব্যাপারে খানিকটা ভীতই ছিলাম। কিন্তু মঞ্চে অভিনয় করার সময় হঠাৎ করেই ভয় কেটে যায় আমার। স্যাররা বলেছিলেন, আমার মধ্যে নাকি কোনো জড়তা ছিল না। যাই হোক। নাটকে একটি দৃশ্য ছিল এরকম, যেখানে আমার বাবা মারা যায়। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী এখানে কাঁদতে হবে আমাকে। আমি কাঁদলাম ঠিকই কিন্তু সে কান্না দর্শকরা দেখতে পেল না। অডিয়্যান্সের দিকে পেছন ফিরে উল্টো দাঁড়িয়ে কান্নার অভিনয় করলাম। নাটক শেষ হওয়ার পর ছবি বিশ্বাস আমাকে একটা চড় লাগালেন আদর করে। হাসতে হাসতে তিনি আমাকে বললেন, স্টেজ পারফরম্যান্সের সময় কখনো দর্শকদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াতে নেই, এটা ঠিক নয়। এ ঘটনাটি আমার জীবনে একটি মস্ত বড় স্মৃতি। এর কিছুদিন পর থেকেই ছবি বিশ্বাসের কাছে আবৃত্তি শিখতে শুরু করলাম। মূলত এ সময় থেকেই একটু একটু করে অভিনয়ের সঙ্গে জড়াতে শুরু করি। ১৯৬২ সালে বিখ্যাত পরিচালক পীযূষ বোসের নাট্যদল রঙ্গসভাতে যোগ দিলাম। প্রখ্যাত অভিনেতা দিলীপ রায়ও এ দলে নিয়মিত কর্মী ছিলেন। এমনকি আমার শ্রদ্ধার পাত্র ছবি বিশ্বাস রঙ্গসভার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এক সময়। রঙ্গসভাতে যুক্ত হওয়ার ফলে নাট্যচর্চার আগ্রহ আরও বেড়ে যায় আমার। ধীরে ধীরে নাটকই হয়ে ওঠে আমার সবকিছু। রঙ্গসভার পাশাপাশি পাড়ায় আমরা কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে তখন আরেকটি নাটকের দল গড়ে তুলি। এর প্রধান উদ্যোগটা আমিই নিয়েছিলাম। অভিনয়ের প্রথম বীজটি বপন হয়েছিল কিন্তু আমার একদম ছোট থাকতেই। তখন ফাইভে পড়ি। আমাদের স্কুলের নাম ছিল কানপুড়া স্কুল। আমাদের স্কুলের স্পোর্টস টিচার যতীনময় মুখার্জীর নির্দেশনায় একটি নাটক করার পরিকল্পনা করা হলো। স্যার আমাকে নাটকের মূল চরিত্রটিতে অভিনয় করার জন্য বললেন। এতটা আশ্চর্য বোধহয় সে সময় আর কারও কোনো কথাতে হইনি আমি। স্যারকে সরাসরি জানিয়ে দিলাম, আমার দ্বারা অভিনয় হবে না। কিন্তু স্যার নাছোড়বান্দার মতোই আমাকে বোঝাতে লাগলেন এবং বললেন, ‘আমি জানি তুমি ঠিকই অভিনয় করতে পারবে।’ শেষ পর্যন্ত স্টেজে উঠলাম আমি। ঘেমেনেয়ে আমার অবস্থা তখন যাচ্ছেতাই। এত লোকজনের সামনে অভিনয় করতে গিয়ে লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলাম।
যাক। ভালোই উতড়ে গেলাম। প্রত্যেকেই প্রশংসা করল, বাহবা দিল। প্রচণ্ড তালির আওয়াজে আমি কেমন বিমূঢ় হয়ে পড়লাম। আর ঠিক তখনই অনেকটা নিজের অগোচরেই অভিনয়ের বীজ বপন হয়ে গেল আমার মধ্যে। সেদিনের সেই নাটকের পর থেকেই পাড়ায় কিংবা স্কুলে আমার ভাবমূর্তিই পাল্টে গেল। খেয়াল করলাম আশপাশের সবাই আমাকে একটু যেন ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করল। স্কুলের স্যারদের কাছে হঠাৎ করেই আমার আদর বেড়ে গেল। বিপ্লব চরিত্রে অভিনয় করে আমার জীবনধারাতেই একটা বিপ্লব হয়ে গেল যেন। এরপর থেকে পাড়ায় ছোটখাটো দু-একটা ফাংশনে আমার ডাক আসতে লাগল। সেই প্রথম কৈশোরেই রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘরে’ খোকাবাবুর বা শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ নাটকে আমিনের চরিত্রে অভিনয় করলাম। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকের ঘটনা এগুলো। বলতে কী পাড়ার ছেলেদের কাছে আমার খাতির বেড়ে গেল। পাড়াতে রাজা নামটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল (রাজা আমার ডাকনাম ছিল)। ফলে চারপাশের পুরো পরিবেশটাই যেন আমাকে অভিনয়ের দিকে ঠেলে দিল যা ক্লাস এইটে ‘নতুন ইহুদি’ নাটকে কাজ করার পর এক রকম চূড়ান্তই হয়ে গেল। তবে, তখনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করার ব্যাপারে কোনো ভাবনা ছিল না আমার। তা ছাড়া ‘ফিল্মে অভিনয়’, এ ব্যাপারটা আমার কাছে অসম্ভব মনে হতো। এই অসম্ভব ব্যাপারটি যে একদিন সম্ভব হবে এবং শুধু সম্ভবই নয়, চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে আমার যে এই প্রতিষ্ঠা আসবে তা কি ভেবেছিলাম আমি?
অভিনয় নিয়ে বিপত্তিতে
নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে আমার মেজো ভাই যথেষ্ট সাহায্য করতেন আমাকে। তার নাম ছিল আবদুল গফুর। বড় ভাইয়ের নাম আবদুস শুকুর। এ ছাড়া তিন বোন শাবুরুন্নেসা, আশিরুন্নেসা এবং শাফিউন্নেসা। মেজ ভাই ছাড়া বোনরা প্রত্যেকেই নাটকের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে আমাকে। আমার নাটক তারা দেখতে যেত, আমার অভিনয় দেখে খুশি হতো এবং যতটুকু সম্ভব সব রকম সাহায্য করত। এক্ষেত্রে আমার বড় ভাইই কেবল ব্যতিক্রম। তিনি এসব পছন্দ করতেন না। অন্য আত্মীয় স্বজনরাও আমার নাটক করাটাকে খারাপ চোখে দেখতেন। এর কারণও অবশ্য ছিল। ধর্মের দিক থেকে আমাদের পরিবার যথেষ্ট গোঁড়া ছিল। মোল্লা পরিবারের একটি ছেলে নাটক করে বেড়াবে তা আমার মুরুব্বি আত্মীয়স্বজনরা ভাবতেও পারতেন না। নানা রকম ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেন তারা। বলতে কী অমন একটি গোঁড়া মুসলিম পরিবারের বলয়ে থেকে কীভাবে যে নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম এবং পরবর্তীকালে ফিল্মে অভিনয় করতে শুরু করলাম, তা এখনো আমার কাছে একটা ধাঁধা।
চলচ্চিত্রে যাত্রা যেভাবে
বাষট্টি সাল থেকে বলা চলে চলচ্চিত্রে ঘোরাঘুরি শুরু হয় আমার। সে সময় বেশ কয়েকটি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলাম। ছবিগুলোর নাম পঞ্চতিলক, এতটুকু আশা, রতনলাল বাঙালি, শিলালিপি এসব। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে আগ্রহ বাড়তে শুরু করে আমার। এক্ষেত্রে মহানায়ক উত্তম কুমার ছিলেন আমার একটি শক্তিশালী প্রেরণা।
সে সময়ে নিয়মিত ছবি দেখতাম। তবে বরাবরই বাংলা ছবির প্রতিই টান আমার বেশি ছিল। হিন্দি ছবি দেখতাম না। যদিও দিলীপ কুমার বা রাজ কাপুরের ভক্ত ছিলাম। বাংলা ছবির ক্ষেত্রে উত্তম কুমারের কোনো ছবিই মিস করতাম না। আর সেই উত্তম কুমারকে প্রথম সামনাসামনি দেখেই অভিনয় করার ইচ্ছা জাগে আমার। তাঁকে দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবছিলাম, আহা কোনোদিন যদি আমি তাঁর মতো হতে পারি। আমার নাট্যগুরু পীযূষদা আমার ভিতরের এ সুপ্ত ইচ্ছা বা বাসনার ব্যাপারটা বুঝতে পারতেন। ফলে ফিল্মে আসার ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন তিনি। যদিও সে সময়টাতে পীযূষদা আমাকে বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন, ‘এখনই ফিল্মে এত বেশি জড়িয়ে পড়ার কোনো দরকার নেই। বরং আরও বেশি করে নাটক করে যাও। এতে অভিনয়ের অনুশীলনটা তোমার আরও বেশি হবে, আর এটাই বেশি প্রয়োজন।’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের নেশার কারণেই ১৯৬১ তে বোম্বে পালিয়েছিলাম। ইচ্ছা একটাই, যে করে হোক ফিল্মে অভিনয় করতেই হবে এবং নায়ক হতে হবে। বোম্বেতে তখন একটাই ফিল্ম ইনস্টিটিউট ছিল। পুণা তখনও হয়নি। মুখার্জীর স্টুডিওর ফিল্ম ইনস্টিটিউটে প্রায় ৯ মাসের মতো ফিল্মের ওপর পড়ালেখা করেছিলাম। অশোক কুমার বাবুর শ্যালক নিখিল ব্যানার্জীর কথায় এখানে ক্লাস করতে শুরু করি। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষা আমার কাজে লেগেছে। বোম্বে থেকে ফিরে এসে পুনরায় পীযূষদার রঙ্গশালায় যোগ দিলাম।
অবশেষে ঢাকায়
পীযূষদার পরামর্শে চৌষট্টির এপ্রিলে বউ-বাচ্চাসহ মাইগ্রেশন করে চলে এলাম ঢাকায়। বাকি পুরো পরিবার আমার কলকাতাতেই থেকে গেল। আমার ভাগের সব সম্পত্তি ভাইদের দিয়ে দিলাম। তাদের জানিয়ে দিলাম যে এগুলোর কোনো কিছু আমার প্রয়োজন নেই। আসলে এসব বিষয়-আশয়ের চাইতে সে সময়ে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের স্পৃহাই আমার মধ্যে কাজ করেছে বেশি। অভিনয়টাই ছিল আমার একমাত্র মোহ। তখন ঢাকার মনিবোস ছিলেন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট। ফজলুল হক সাহেব ছিলেন একজন পরিচালক। পীযূষদা আমার জন্য তাদের চিঠি দিলেন।
তা ছাড়া আমার একটু পরিচয় ছিল জব্বার খান সাহেবের সঙ্গে। তিনি কলকাতায় আসতেন। আমার মেজদার সঙ্গে তার খানিকটা জানাশোনা ছিল। এ সূত্রটি কাজে লাগানো যাবে ভেবে ঢাকা চলে এলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়টা ছিল তখন। কলকাতায় ইচ্ছেমতো বাপের টাকা উড়িয়েছিলাম। ফলে জীবনের সঙ্গে সংগ্রামটা যে কত কঠিন তা টের পাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঢাকা এসে আষ্টেপৃষ্ঠে সেই জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে গেলাম। আর আসার সময় কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। সেই টাকাই অল্প কিছুদিনের জন্য আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করল। আর আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকার। যোগাযোগ করতে লাগলাম পরিচিত সবার সঙ্গেই। জব্বার সাহেবের কাছে গেলাম। মনিবোসের সঙ্গেও দেখা করলাম। কিন্তু ফল পেলাম না।
জব্বার সাহেব অবশ্য বললেন, ‘দেখি কী করা যায়, বুঝে নিতে তেমন কষ্ট হলো না যে আসলে ইনারা কেউই সাহায্য করবে না আমাকে। তবে শেষ পর্যন্ত জব্বার সাহেবের শালা আনিসের ইকবাল ফিল্মসের অফিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ঢুকলাম এবং এখানে থেকেই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলাম। ইকবাল ফিল্মের এ চাকরিটিও ছিল অবৈতনিক। শুধু কনভেন্স আর শুটিং হলে খাওয়া পেতাম। ইন্ডাস্ট্রির যাদের সঙ্গে দেখা করছিলাম তাদের কেউই ঠিক পাত্তা দিতে চাইছিল না আমাকে। যেমন ক্যাপ্টেন এহতেশাম বা সুভাষ দত্ত কিংবা কামাল আহমেদ এরকম অনেকেই। আমি তো বটেই এমনকি যে আমাকে ইনাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাকেও অপদস্থ হতে হচ্ছিল। এরা প্রত্যেকেই তখন হিট ডিরেক্টর। সুতরাং আমার সম্পর্কে তাদের এই ভাবভঙ্গি হজম করা খুবই কষ্টকর ছিল আমার জন্য। বারবার এই একই ব্যর্থতা আমার স্বপ্নকে নড়বড়ে করে তুলছিল। নিজেকে পরাজিত মনে হচ্ছিল। যাই হোক।
আশা ছাড়লাম না। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে না খেয়েও কাটাতে হয়েছে তখন। হতাশ হয়ে ভেঙে পড়তে লাগলাম। অনেক স্ট্রাগল শেষে ১৯৬৬ সালে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
তিনি জানালেন, আমাকে তাঁর পরবর্তী ছবি ‘বেহুলা’র নায়কের চরিত্রে কাস্ট করেছেন। নায়ক হিসেবে আমার প্রথম সাইনিং মানি ৫০০ টাকা। ‘বেহুলা’ রিলিজ হলো ছেষট্টিতে এবং বাম্পার হলো। ফলে সামনের রাস্তা আমার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। কষ্টের দিনগুলো অতীতে পরিণত হতে লাগল। আমি আর আটকালাম না।