বেশ কয়েক বছর থেকে ভারত ও বাংলাদেশে সিক্যুয়েল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা শুরু হয়েছে। আর বাংলাদেশেই প্রথম সিক্যুয়েল চলচ্চিত্র নির্মাণের সূচনা হয় ‘সূর্যগ্রহণ’ ও ‘সূর্য সংগ্রাম’ ছবির মাধ্যমে। প্রথমটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ ও দ্বিতীয়টি ১৯৭৯ সালে। চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণ করেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা আবদুস সামাদ।
পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে আবদুস সামাদ লন্ডনে যান। ভর্তি হন ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। তাঁর সামনে সুযোগ ছিল সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই ক্যারিয়ার গড়ার। কাজ শুরুও করেছিলেন শিক্ষানবিশ চিত্রগ্রাহক হিসেবে। ১৯৬২ সালে যোগ দেন বিবিসিতে। ক্যামেরাম্যান হিসেবে। কিন্তু এরপরই ফিরে আসেন দেশে। বাবা-মায়ের কথায়। তবে সিনেমার পোকা মাথা থেকে যায়নি কখনোই। দেশে ফিরে কাজ শুরু করেন চিত্রগ্রাহক হিসেবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা করতে থাকেন পরিচালনার। সেজন্য নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও দাঁড় করান-শামরোজ ফিল্মস। ১৯৭০ সালে কাজ শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের। জমির আইল ভাঙার গল্প। তবে এটাই তাঁর গল্পের একমাত্র বক্তব্য নয়। এই আইল বা বিভাজন রেখার প্রতীকে তিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভাজনগুলোকেও তুলে ধরতে চান। বোঝাতে চান এই অনৈক্য কীভাবে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। বন্ধ হয়ে গেল আইল ভাঙার গল্প লেখার কাজ। সক্রিয় সহযোগিতা করতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এ কারণে ধরাও পড়েন। যুদ্ধের একদম শেষ মুহূর্তে। ১৪ ডিসেম্বর। ধানমন্ডিতে। আলবদর বাহিনীর হাতে। বেঁচে যান স্রেফ ভাগ্যের জোরে। তার দুই দিন পর যখন চূড়ান্ত বিজয় ধরা দেয়, খুশিতে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন আবদুস সামাদ। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন আবার। আইল ভাঙার গল্পটি ১৯৭৩-৭৪ সালে শেষ করেন। তবে এ যাত্রায় ভূমিব্যবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্নের সেই প্রাথমিক গল্পে যোগ হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য অনেক বড় হয়ে যায়। এমনিতেই উপমহাদেশের গড়পরতা চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। আর আবদুস সামাদের স্বপ্নের গল্পটা হয়ে যায় তারও দ্বিগুণ। আর তাই সেটাকে ভাগ করেন দুই ভাগে। নির্মাণ করেন দেশের প্রথম সিক্যুয়েল বা পার্বিক চলচ্চিত্র ‘সূর্যগ্রহণ’ ও ‘সূর্য সংগ্রাম’। প্রথমটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর। দ্বিতীয়টা ১৯৭৯ সালের ২০ এপ্রিল। এবং বিপুল প্রশংসিত হয়। ঘরে তোলেন পুরস্কার। দুটোই অংশ নেয় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ‘সূর্যগ্রহণ’ অংশ নেয় ১৯৭৭ সালের দশম আসরে। আর ‘সূর্য সংগ্রাম’ ১৯৭৯ সালের একাদশে। সেবার উৎসবে ১১০ দেশ থেকে ৪৬৫টি চলচ্চিত্র জমা পড়ে। জুরি বোর্ড ৩৫টি বাছাই করে মূল প্রতিযোগিতার জন্য। সেই তালিকায় জায়গা করে নেয় ‘সূর্য সংগ্রাম’। সেই প্রথম বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় কোনো আন্তর্জাতিক উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায়। ছবি দুটির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন ও রোজী সামাদ।