আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতাকে দেওয়া হচ্ছে চলতি বছরের রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক। বৃহস্পতিবার সরকারিভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ খবর জানার পর এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তাঁর অনুভূতির কথা জানান। তা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
আপনি একুশে পদকে ভূষিত হচ্ছেন, অনুভূতি কেমন?
একুশে পদক পাচ্ছি, এই খবরে আমি ভীষণ আনন্দিত। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। খবরটি শুনে আসলেই অনেক ভালো লাগছে।
আপনার প্রতি সরকারের এ মূল্যায়নকে কীভাবে দেখেন?
সত্যি কথা বলতে মূল্যায়নের ব্যাপারে আমি বলব, শিল্পীদের অবশ্যই এই সম্মান দেওয়া দরকার। বিশেষ করে বেঁচে থাকতে এই মূল্যায়ন পেলে কাজের প্রতি সংশ্লিষ্টজনের ডেডিকেশন আরও বেড়ে যায়। ফলে কাজ আরও উন্নত হয়। তাই প্রত্যেক শিল্পী যেন এই মূল্যায়ন পায় আমি সেটাই কামনা করছি। বিশেষ করে সিনিয়র শিল্পী যাঁরা একটা বয়সে এসে দাঁড়ায় তাদের সময়মতো সম্মান দিলে তাঁরা বেঁচে থাকতে গর্ববোধ করবেন।
এ প্রাপ্তির বিষয়ে কার অবদানকে প্রধান বলে মনে করেন?
প্রথমেই সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাব। তারপর মা, বাবা, বড় বোন সুচন্দা আপু ও জহির রায়হান ভাইয়ের অবদানকে বিশেষভাবে স্মরণ করব। কারণ তাঁদের সহযোগিতা না পেলে আজ আমি অভিনেত্রী ববিতা হতে পারতাম না এবং এই রাষ্ট্রীয় সম্মানও পেতাম না। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে নিয়ে কাজ করা সব শ্রদ্ধাভাজন নির্মাতার প্রতি। কারণ তাঁদের হাতেই ‘অভিনেত্রী ববিতা’র জন্ম হয়েছে। একই সঙ্গে আমার সব সহশিল্পী, কুলাকুশলী, সিনেমা হল মালিক এবং আমার প্রিয় দর্শক ও দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি বলব, সবার সমন্বিত সহযোগিতার কারণেই আজ আমি সবার প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা হয়েছি। একই সঙ্গে আমাকে এই সম্মাননার জন্য বিবেচনা করায় সরকারের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আপনার চলচ্চিত্রে যাত্রার গল্পটা এবার শুনি-
চলচ্চিত্রে আমার যাত্রার গল্পের শেষ নেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পুতুল খেলার সময় অভিনয়ে এসেছি। ১৯৬৮ সাল। শ্রদ্ধেয় নির্মাতা জহির রায়হানের উৎসাহে ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু। এতটুকু বয়সে বেশি কিছু বোঝার কথা নয়। তারপরও একটি বিষয় আমাকে খুব ভাবাতো, ভোগাতো। তখন দেশ স্বাধীন হয়নি। এই দেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এখানে তখন শিল্পমানের ছবি নির্মাণ হতো। সেগুলো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পেত না। আমন্ত্রণ জানানো হতো পশ্চিম পাকিস্তানের ধুমধাড়াক্কা বাণিজ্যিক ছবিগুলোকে। আমার ছোট্ট মনে বাংলা ছবির প্রতি এই অবজ্ঞা খুব কষ্ট দিত। একসময় দেশ স্বাধীন হলো। এ বন্ধ্যত্ব কাটল। এ দেশের ছবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসার ঝড় তুলতে শুরু করল। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অনঙ্গ বউ চরিত্রে আমাকে কাস্ট করলেন। ছবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝড় তুলল। ছবিটি নিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করলাম। বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে ছুটে গেলাম বুড়িগঙ্গা থেকে ভলগা হয়ে বিশ্বের আনাচেকানাচে। সবাইকে জানালাম ববিতা বাংলাদেশের মেয়ে, এসেছি বাংলা ছবির বিশ্বজয়ে। সবাই সাদরে গ্রহণ করল এ দেশের ছবি আর ববিতাকে। রাশিয়ায় তখন বলিউড অভিনেতা রাজ কাপুরের জয়জয়কার। বিমানবন্দর থেকে সব জায়গায় তাঁর ছবি ব্লো-আপ হতো। একসময় অবাক চোখে দেখলাম রাজ কাপুরের ছবির পাশে ববিতার ছবি স্থান করে নিয়েছে। মানে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সম্মানজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশ্বের জনপ্রিয় পত্রিকাগুলো গুরুত্ব দিয়ে আর্টিক্যাল তৈরি করল সত্যজিৎ রায়ের নায়িকা ববিতাকে নিয়ে। বিশ্বের প্রধান চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে আমি হয়ে গেলাম ডার্লিং অব দ্য ফেস্টিভ্যাল। ফেস্টিভ্যালের ওপেনিং আর ক্লোজিং হতো আমার হাতে। পৃথিবীর খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটিগুলোতে বক্তব্য রাখতে হয়েছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অগণিত স্বীকৃতি এবং দর্শক-ভক্তের ভালোবাসায় আমি দেশ, জাতি এবং চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
আপনার নাম ছিল ফরিদা আক্তার পপি, ‘ববিতা’ নামকরণ হলো কীভাবে?
‘সংসার’ ছবির মুক্তির বছর দুয়েক পর জহির রায়হানের পরের ছবি ‘জ্বলতে সুরজ কি নিচে’তে কাজ করি। ছবির প্রযোজক বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী আর তাঁর স্ত্রী মিলে আমার নাম দিলেন ববিতা।
প্রথম নায়িকা হওয়ার গল্পটা কেমন ছিল?
‘সংসার’ ছবির পর জহির রায়হান আমাকে প্রথমবারের মতো নায়িকা করে ‘শেষ পর্যন্ত’ নির্মাণ করলেন। এ ছবির নায়ক ছিলেন রাজ্জাক ভাই। আমার পর্দাজীবনের প্রথম নায়ক তিনি। ছবিটি ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট মুক্তি পায়। সেই থেকে ‘নায়িকা ববিতা’র যাত্রা শুরু। ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম ১২ হাজার টাকা। ওই টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছিলাম। ইচ্ছা ছিল মাকেই প্রথম গাড়িতে চড়াব। সেই ভাগ্য আর আমার হলো না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছবিটি মুক্তির দিনই মা মারা গেলেন।
আপনি তো আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা ডিসিআইআই-এর শুভেচ্ছাদূত, শিশুদের নিয়ে কাজ করতে পেরে কেমন লাগছে?
আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা ডিসট্রেস চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফান্টস ইন্টারন্যাশনাল (ডিসিআইআই) ২০১২ সালে আমাকে শুভেচ্ছাদূত মনোনীত করে। তখন থেকে বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও তাদের পরিবারের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও তাদের পরিবারের কল্যাণে নিজেকে যুক্ত করতে পেরে গর্ববোধ করছি। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের দুঃখ-কষ্ট মোচন করা সবারই দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ দায়িত্ব আজীবন পালন করে যেতে চাই।
‘প্রকৃতি আপনার প্রিয়’ আপনাকে নিয়ে এমন একটি প্রবাদ রয়েছে। বিষয়টা সম্পর্কে পাঠককে কী জানাবেন?
ছোটবেলা থেকে প্রকৃতি আমাকে খুব কাছে টানে। মনে হয় যেন ইশারায় শিস দিয়ে ডাকছে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যাই। একসময় ভাবলাম প্রকৃতিকে নিজের ঘরে নিয়ে এলে কেমন হয়? ইট, কাঠের এ শহরে নৈসর্গিক প্রকৃতির দেখা চাইলেই তো আর মিলবে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে যখন-তখন গ্রামগঞ্জেও ছুটে যেতে পারি না। এই ভাবনা থেকে নিজের ঘরেই গড়ে তুলেছি এক অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশ। চমৎকার ফুল, ফল আর সবজির বাগান। সঙ্গে আছে হরেকরকম পাখি। আমার গুলশানের বাড়ির ছাদ যেন এখন এক স্বর্গীয় সুখের আধার। চারদিকে রংবেরঙের ফুলের মহাসমারোহ। সঙ্গে আছে পাখির কলতান। সব মিলিয়ে চোখ জুড়ানো পরিবেশ। গাছের প্রতি আমার এ ভালোবাসা বংশগত। বাবার হাতে গাছ বেশ ভালো হতো। তিনি যেখানে যেতেন সঙ্গে করে গাছ নিয়ে আসতেন। তা দেখে সেই একরত্তি বয়স থেকেই প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যাই। মেয়েরা শপিংয়ের প্রতি দুর্বল হয়। আমি কিন্তু দেশে-বিদেশে প্রথমে খবর নেই কোথায় নার্সারি আছে। ফুল-ফলের গাছ সংগ্রহ করি। এগুলো আমার কাছে শাড়ি-চুড়ি-গহনার চেয়েও অনেক দামি। ফজরের নামাজ পড়ে ছুটে যাই বাগানে। নিজ হাতে পরম মায়ায় প্রিয় গাছের যত্ন নেই। যে গাছটিকে অতি যত্নে বড় করে তুলি সে আমাকে সুন্দর ফুল দিয়ে মুগ্ধ করে। আমার সব একাকীত্ব দূর করে দেয়। পরমানন্দে সময় কেটে যায়...।
প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমন্বয় কতটা হয়েছে?
আমার জীবনে সব প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত কিছু দুঃখবোধ আছে। আমার বিয়ের মাত্র চার মাস পরই আব্বা এএসএম নিজাম উদ্দিন আতাউব ইন্তেকাল করেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আমার জীবনের সাফল্যের মূলমন্ত্র কিন্তু আব্বার কাছ থেকেই পাওয়া। এই যে আমি এত পরিপাটি থাকি, গুছিয়ে থাকার চেষ্টা করি, এটা আব্বার কাছ থেকেই পাওয়া। আব্বা যখন অফিস থেকে আসতেন, তখন আমরা সবাই আব্বাকে পান বানিয়ে খাওয়াতাম। আব্বা তখন বেশ আয়েশ করে পান খেতেন। আব্বার পা টিপে দিতে দিতে তখন সব আবদার করতাম। আব্বা আমাদের সেই আবদার রাখতেন। আবার আব্বা অনেক সিনেমা দেখতেন। সিনেমা দেখে আমাদের মজার মজার গল্প বলতেন এবং সেসব গল্পে আব্বা আমাদের অভিনয় করতে বলতেন। সেখান থেকেই কিন্তু অভিনয়ে আমার অনুপ্রেরণা আসা। পরে যখন আমি সিনেমার নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করি, তখনো আব্বা আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিতেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয়ের আগে আব্বাই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান করতেন ইংরেজিতে। শুটিংয়ের সময় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আব্বার চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমার ইংরেজি শেখার খুব শখ ছিল বিধায় আব্বা আমাকে ছোটবেলায় একটি ডিকশনারি কিনে দিয়েছিলেন। আমি তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। বাগেরহাটে থাকি সবাই। সবাই আমাকে রেখে মামার বাড়ি যাবে বেড়াতে। আমি বুদ্ধি করলাম কীভাবে আব্বাকে রাজি করানো যায়। আব্বা সন্ধ্যা নাগাদ বাসায় ফেরার সময় আমিই হারিকেন নিয়ে আব্বাকে এগিয়ে আনতে গেলাম। আমাকে দেখে আব্বা ভীষণ খুশি, কারণ তখন বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে আব্বাকে এগিয়ে আনতে গিয়েছিলাম।
আব্বা তখন খুশি হয়ে বললেন, কী চাও মা? আমি বললাম, আমাকেও সঙ্গে করে মামার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। আব্বা রাজি হলেন। আমার পপি নামটি আব্বা এবং মা ডা. বেগম জাহানারা উভয়ে মিলেই রেখেছিলেন। আব্বা আমার জীবনের আদর্শ। তাই আমার ইচ্ছা, আমার মৃত্যুর পর যেন বনানী কবরস্থানে আব্বার কবরেই আমাকে দাফন করা হয়।
ববিতার যত প্রাপ্তি
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সবচেয়ে বেশিবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পুরস্কৃত হয়েছেন অভিনেত্রী ববিতা। তিনি প্রায় ৩০০ ছবিতে অভিনয় করেছেন। বাঁদী থেকে বেগম (১৯৭৫), নয়নমণি (১৯৭৬), বসুন্ধরা (১৯৭৭), রামের সুমতি (১৯৮৫) এবং পোকামাকড়ের ঘরবসতি (১৯৯৬) ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে ‘হাছন রাজা’, ‘খোদার পরে মা’ ও ‘কে আপন কে পর’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে জাতীয় পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ (২০১৫)। নিজের প্রযোজনা সংস্থা ববিতা মুভিজ থেকে নির্মাণ করেছেন ‘ফুলশয্যা’, ‘আগমন’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’র মতো জনপ্রিয় ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত ছবিগুলো। পোকামাকড়ের ঘরবসতি ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ প্রযোজকের জাতীয় পুরস্কারও পান তিনি। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অশনি সংকেত (১৯৭৩) চলচ্চিত্রে ‘অনঙ্গ বৌ’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই যশোরে ববিতার জন্ম। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা। প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার পপি।