সংগীতে অসামান্য অবদান রাখার জন্য চলতি বছর একুশে পদক পেলেন রক কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। তিনি পেলেন মরণোত্তর পদক। ২০১৮ সালে অকাল প্রয়াত হন এই বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী। তাঁর প্রাপ্তিতে শিল্পীর সহধর্মিণী চন্দনার অনুভূতি ও আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-
মৃত্যুর সাত বছর পর একুশে পদক পাওয়ার খবরে আবেগাপ্লুত গায়কের স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। তাঁর মতে, এই পুরস্কার শুধু আইয়ুব বাচ্চুর জন্য সম্মানের নয়, বরং তা বাংলা ব্যান্ড সংগীত তথা সংগীতের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। চন্দনা বলেন, ‘২০২৬ সালের একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত হলেন রক আইকন আইয়ুব বাচ্চু। এটা শুধু আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পী হিসেবে সম্মাননা নয়, এটা বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ও সংগীতের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যিনি (আইয়ুব বাচ্চু) গিটার হাতে তাঁর ভক্তদের মাঝে বেঁচে নেই। যিনি সারাটা জীবনই দিয়ে গেছেন সংগীতের জন্য। সংগীতই ছিল আইয়ুব বাচ্চুর জীবন।’ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চন্দনা বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি বর্গ কিলোমিটারজুড়ে তিনি আছেন এবং বেঁচে থাকবেন। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে তিনি আছেন এবং থাকবেন। তাঁকে এই সম্মাননা প্রদানের জন্য জুরি বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।’
একনজরে আইয়ুব বাচ্চু
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। গিটার হাতে যার সুরের মূর্ছনা মুগ্ধ করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। আজও তাঁর গাওয়া গান এবং সুর ভক্ত-শ্রোতাদের আবেগে আন্দোলিত করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ব্যান্ড সংগীতের ধারা গড়ে উঠতে শুরু করে। পাশ্চাত্যের পিংক ফ্লয়েড, বিটলস বা ডায়ার স্ট্রেইটসের মতো ব্যান্ডের প্রতি ঝোঁক থাকলেও দেশীয় মঞ্চে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। শৈশব থেকেই গিটারের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল তাঁর। পরিবার প্রথমে সংগীতকে পেশা হিসেবে মেনে না নিলেও তা তাঁকে কখনো থামাতে পারেনি। তাঁর বাবা ইশহাক চৌধুরী ১১তম জন্মদিনে একটি গিটার উপহার দিলে শুরু হয় আইয়ুব বাচ্চুর নতুন যাত্রা। ধীরে ধীরে সেই গিটারের সুর ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশজুড়ে। ১৯৭৮ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড দিয়ে তাঁর সংগীত জীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘সোলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে এক দশক কাজ করেন। তবে প্রকৃত জনপ্রিয়তা আসে ১৯৯১ সালে গঠিত তার নিজস্ব ব্যান্ড ‘এলআরবি’ বা লিটল রিভার ব্যান্ডের মাধ্যমে। ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম ডাবল অ্যালবাম হিসেবে স্থান পায়। এলআরবির সাফল্যের পাশাপাশি আইয়ুব বাচ্চু একক শিল্পী হিসেবেও উজ্জ্বল ছিলেন। তাঁর অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ (১৯৮৬) দিয়ে শুরু হলেও প্রকৃত সাফল্য আসে ‘ময়না’ (১৯৮৮) ও ‘কষ্ট’ (১৯৯৫) অ্যালবামের মাধ্যমে। ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘অবাক হৃদয়’ কিংবা ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ গানগুলো তাঁর কণ্ঠকে চিরস্মরণীয় করে তোলে। ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’, ‘শেষ চিঠি’, ‘সুখের এ পৃথিবী’ কিংবা ‘যেও না চলে বন্ধু’, প্রতিটি গানই তাঁর শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে। চলচ্চিত্রেও তাঁর কণ্ঠের ছোঁয়া শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে আম্মাজান চলচ্চিত্রের গান ‘আম্মাজান আম্মাজান’ কিংবা ব্যাচেলর চলচ্চিত্রের ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ এখনো জনপ্রিয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কনসার্টে অংশ নেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন এই তারকা। ১৮ অক্টোবর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয় পুরো দেশ। চট্টগ্রামে স্থাপিত ‘রুপালি গিটার’ ভাস্কর্য আজও স্মরণ করিয়ে দেয়- বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পীর অবদান কোনো দিন ভুলবার নয়। আইয়ুব বাচ্চু নিজেকে ‘ভাড়াখাটা গিটারের ভাড়াখাটা প্রেমিক’ দাবি করতেন। বলতেন, ‘গান নয়, গিটার আমাকে ঘরছাড়া করেছিল। গিটারের জন্যই সংগীতযুদ্ধে নেমেছিলাম। সত্তরের দশকে আমি ভাড়ায় গিটার বাজাতে যেতাম। গিটারটাও ভাড়া নিয়ে যেতাম। ওই সময় ডিসকো কোম্পানির একটি গিটার আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে ৩০ টাকা দিনপ্রতি ভাড়ায় নিয়ে শো করতাম। ভাড়া হিসেবে ৩০ টাকা দেওয়ার পর আরও ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে যেত। এটা দিয়েই দিন চালাতাম।’ গিটারের প্রতি যে প্রবল ভালোবাসা, সেই ভালোবাসার জোরেই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন তিনি। তা ছাড়া তাঁর গানে আছে, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে/একদিন চলে যাব দূরে, বহু দূরে/ সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো/গোপন করে।’ আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে ‘রুপালি গিটার চত্বর।’