গত কয়েক দশকে ঢাকায় নির্মিত হয়েছে প্রচুর ছবি। এর মধ্যে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নানা কারণে এখনো মুক্তি পায়নি। অথচ এর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় ছিল কয়েকটি ছবি। তবু এগুলোর আলোর মুখ দেখার নাম নেই। দর্শক এখনো ছবিগুলোর অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষার প্রহর কি আর কাটবে? সে কথাই জানাচ্ছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
‘রানা প্লাজা’ অন্ধকারে হারিয়ে গেল
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি নিয়ে ২০১৪ সালে পরিচালক নজরুল ইসলাম খান ‘রানা প্লাজা’ নামে আরেকটি ছবি নির্মাণ করেছিলেন। পরীমণি ও সাইমন অভিনয় করেছেন মূল চরিত্রে। সেন্সর জটিলতা পেরিয়ে দুবার মুক্তির তারিখও চূড়ান্ত হয়েছিল ছবিটির। শেষ পর্যন্ত ছবিটিকে ‘প্রদর্শন উপযোগী নয়’ বলে ঘোষণা করে সরকার। এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন নজরুল। বলেন, রানা প্লাজা নিয়ে দর্শকদের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেটা গত তিন-চার দশকে বিরল। প্রায় আট মাস সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকার পর হাই কোর্টের রায় নিয়ে ১১ জুলাই ২০১৫ সালে ছবিটি ছাড়পত্র পায়। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি ‘রানা প্লাজা’ প্রদর্শনের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। বলা হয় ‘সেন্সর আপিল কমিটি কর্তৃক জনসম্মুখে প্রদর্শনের উপযোগী নয় বলে বিবেচিত হওয়ায় চলচ্চিত্রটি সেন্সর সনদবিহীন ঘোষণা করা হয়েছে।’ এর ফলে রানা প্লাজা অন্ধকারেই হারিয়ে গেল, মুক্তির আর কোনো পথ নেই।
‘ভালোবাসার রংধনু’ আর উঠবে না
বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা সৈয়দ নাবিল আশরাফ ২০১০ সালে তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসার রংধনু’ নির্মাণ শুরু করেন। নির্মাতা ছবির প্রধান তিন চরিত্রে বেছে নিয়েছিলেন তিন শিল্পী এফ এস নাঈম, এ্যানি খান ও আঁচলকে। শুধু পাত্র-পাত্রীই নয়, ছবির গল্প আর চিত্রায়ণের নতুনত্বেই দর্শক এই ছবি দেখবে। ২০১২ সালে ৯০ শতাংশ শুটিং হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় ছবিটি। ৯ বছর আগে ছবির নাম বদলে ‘রংধনু’ করেছিলেন। ফের শুটিংয়েও নেমেছিলেন। এরপর ছবিটির আশা ছেড়ে দেন পরিচালক। তিনি বলেছিলেন, ‘অল্প কিছু শুটিং বাকি ছিল। ছবিটি প্রযোজনা করেছিলাম আমি ও আমার এক ব্যবসায়িক পার্টনার। ৯০ শতাংশ শুটিং শেষ হওয়ার পর আমাদের ব্যাবসায়িক সম্পর্কচ্ছেদ হয়। এরপর আর ছবিটি নিয়ে নতুন করে ভাবার কোনো অবকাশ ছিল না। এই ছবিটি হারিয়েই গেছে। এটি আমার বড় আক্ষেপ।’ মানে ভালোবাসার রংধনু’ আর আকাশে উঠবে না।
৮ দিনের শুটিংয়েই শেষ ‘অপারেশন অগ্নিপথ’
২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শুটিং শুরু করেন পরিচালক আশিকুর রহমান। শাকিব খান অভিনীত ছবিটির একটা টিজারও প্রকাশিত হয়। টিজারটি বেশ প্রশংসিতও হয়। এরপরই অজানা কারণে ছবিটির শুটিং বন্ধ। ২০২৩ সালে ছবিটি নতুন করে ফের আলোচনায় আসে। ছবির অন্যতম প্রযোজক রহমতউল্লাহ নানা অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণ দাবি করে শাকিব খানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেন শাকিব খানও। পরিচালক আশিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু স্বার্থান্বেষী ও ঈর্ষাকাতর মানুষের কারণে আমরা অসাধারণ একটি গল্প পর্দায় আনতে পারিনি। এখনো চাই ছবিটির কাজ শেষ করতে। চাওয়াটা কতটুকু সম্ভব হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে মাত্র আট দিনের শুটিং আর দুই মিনিটের টিজারে যে ঘটনার জন্ম দিয়েছে, আমার মনে হয় না বিগত কয়েক বছরে কোনো চলচ্চিত্র এতটা আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।’ ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন মিশা সওদাগর, শিবা আলী খান।
‘ছায়া-ছবি’ ছায়াতেই রয়ে গেল
২০১২ সালে শুটিং শুরু হয়েছিল ছবিটির। ছবির কয়েকটি গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এর মধ্যে আছে ‘ছায়া-ছবি’, ‘মন যা বলে বলুক’, ‘পথ জানা নেই’। আরফিন রুমির সুরে ছবিটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ভারতের অভিজিৎ চ্যাটার্জি, আকৃতি কাক্কর, শান, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, অন্বেষা দত্ত এবং বাংলাদেশের রুমি, পড়শী, নিশিতা বড়ুয়া প্রমুখ। প্রায় ১৭ বছর পরেও ছবিটির মুক্তির আর কোনো খবর নেই। বেশ ক’বছর আগে পরিচালক রাজ বলেছিলেন, ‘এ ছবির কথা আমি ভুলে গেছি, আপনারাও ভুলে যান।’ রাজ বলেন, ছবিটির পোস্ট প্রডাকশনের কাজের জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর প্রযোজক ছবিটি নিয়ে আর আগ্রহ না দেখানোর কারণে কাজ ওখানেই থেমে যায়।’ জানা যায়, চ্যানেল নাইন-এর প্রযোজনায় ছবিটির নির্মাণ শুরু হলেও শুটিংয়ের মাঝামাঝি তারা সরে দাঁড়ায়। পরে পরিচালক নিজে অর্থলগ্নি করে শুটিং শেষ করেন। মুক্তির পর চ্যানেল নাইন ও পরিচালক কীভাবে লভ্যাংশ ফেরত নেবে, এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে ছবিটি আটকে আছে। ছবিটি নির্মাণের সময় চ্যানেল নাইনের অনুষ্ঠান প্রধান ছিলেন তানভীর খান। দীর্ঘদিন হয়েছে তিনি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে নেই। ছবিটি নিয়ে ভীষণ হাইপ ছিল। কিন্তু নির্মাতা জটিলতায় ছবিটি আটকে যায়। মানে ছায়-ছবি ছায়াতেই রয়ে গেল আর আলোতে আসবে না।
‘শনিবার বিকেল’ দেশে অনিশ্চিত
২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজানে হামলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নির্মাণ করেছিলেন ‘শনিবার বিকেল’। ২০১৯ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। তবে বাংলাদেশে ছবিটিকে সেন্সর ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ চার বছর সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকার পর ২০২৩ সালে সিনেমাটি দেখে সেন্সর বোর্ডের আপিল কমিটি জানায় সিনেমাটি মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই। তবে তার দুই সপ্তাহের মাথায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়, এখনই সেন্সর ছাড়পত্র পাচ্ছে না, ছবিটি আবার দেখবে আপিল কমিটি। বাংলাদেশে মুক্তি না পেলেও বহির্বিশ্বে মুক্তি পায় ‘শনিবার বিকেল’। এতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন পরিচালক।
‘পারলে ঠেকা’ একেবারেই ঠেকে গেছে
২০১২ সালে অনলাইনে মুক্তি পেয়েছিল ‘পারলে ঠেকা’ ছবিটির ‘জঙ্গলের ডাক’ শিরোনামের একটি গান। এতে জয়াকে নতুন রূপে দেখেছিল দর্শক। তারপর অনেক দিন বিরতি। পাঁচ বছর পর নাম বদলে ফের শুরু করেন ছবির শুটিং। কিন্তু সেই যাত্রায়ও ছবি শেষ হয়নি। জয়া ছবিটি নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। জয়াকে ছবিতে এমন চরিত্রে আগে-পরে কখনো দেখা যায়নি। কখনো চোর, কখনো টারজানের মতো বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে জয়াকে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ছবিটি নিয়ে কয়েক বছর আগে পরিচালক সামুরাই মারুফ বলেন, ‘ছবিটি আর হবে না। আমি আর ছবি নির্মাণের ধকল নিতে পারিনি।’ মানে ‘পারলে ঠেকা’ ছবিটি শেষ পর্যন্ত একেবারেই ঠেকে গেল।
‘দীপ নেভার আগে’ নিভে গেল
জাহানারা ইমামের অনবদ্য সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’। বইটি অবলম্বনে ২০১০ সালে একঝাঁক নবাগত অভিনয় শিল্পী নিয়ে ইলাজার ইসলাম শুটিং শুরু করেছিলেন ‘দীপ নেভার আগে’ ছবির। আইয়ুব বাচ্চু, ফুয়াদ আল মুক্তাদির, অর্ণব, অদিত, রাফা ছবিটির জন্য তৈরি করেছিলেন নয়টি গান। গানগুলোর অডিও বেশ শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল। এই ছবির শুটিংও মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। পরিচালক জানিয়েছেন, প্রায় দুই বছর ছবিটি নিয়ে স্ট্রাগল করার পর শেষ পর্যন্ত কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। একটা গেরিলা মুভি বানানোর জন্য যে পরিমাণ বাজেট তিনি পেয়েছিলেন, সেটা নিতান্তই অপ্রতুল। ন্যূনতম মান ধরে রাখার জন্য যেটা অপর্যাপ্ত। তাই ছবিটি শেষ হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
‘স্বপ্নের বিদেশ’-এর গন্তব্য অনিশ্চিত
শাবনূর ও শাকিব খানকে জুটি করে নজরুল ইসলাম খান ২০০৮ সালে নির্মাণ শুরু করেছিলেন ‘স্বপ্নের বিদেশ’ ছবিটি। প্রবাসীদের মানবেতর জীবনের বাস্তবতার নিরিখে লেখা গল্পের কারণে ‘স্বপ্নের বিদেশ’ নিয়েও আশাবাদী ছিল দর্শক। কিন্তু ছবিটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৪ সালে একবার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মহারানী প্রোডাকশন ঘোষণা দিয়েছিল ছবিটি সেন্সরে জমা দেওয়ার। ওই বছর কোরবানির ঈদে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হবে বলেও জানায় তারা। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিচালক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমার সঙ্গে এই ছবির প্রযোজকের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ নেই। ছবিটি থার্টি ফাইভে নির্মাণ করেছিলাম। ফলে এখন নেগেটিভ কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, সেটাও অজানা। আদৌ সেটা প্রিন্ট করা যাবে কি না জানি না। এ অবস্থায় ছবিটির গন্তব্য অনিশ্চিতই বলা যায়।’