‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়, ভেঙে যায় যাক তার করি না ভয় তবু প্রেমের তো শেষ হবে না।’ এই গানটি এখনো সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। বিশেষ করে প্রেমিক হৃদয়ে গানটি সব সময়ই অন্যরকম এক অনুভূতির শিহরণ জাগায়। এটি ছিল ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া নায়করাজ রাজ্জাক নিবেদিত শফিকুর রহমান পরিচালিত জীবনমুখী সিনেমা ‘ঢাকা ৮৬’ এর গান। নাগরিক পালাবদলে জীবনে ঘটনার ঘনঘটা কম থাকে না। তারই একটা স্পর্শ ‘ঢাকা ৮৬’। সিনেমার গল্প সাদামাটা। সাদামাটা বলতে শুনলে মনে হবে এরকম গল্প তো কারও না কারও জীবনে দেখতেই পাই আমরা। হ্যাঁ, সে ধরনের চেনা বাস্তব জীবনের গল্প। রাজ্জাক-বাপ্পারাজ সিনেমায় থাকে মামা-ভাগ্নে। ভাগ্নে বাপ্পা তার চলাফেরায় দারুণ আধুনিক। কলেজপড়ুয়া জীবনে যে নিত্যনতুন হাওয়া লাগে সেটাই ছিল বাপ্পার বৈশিষ্ট্য। বেকারত্ব এক সময় পেয়ে বসলে সেটার বাস্তবতাও পরিচিত জীবনের অংশ। বাপ্পার প্রেম হয় সহপাঠী রঞ্জিতার সঙ্গে। একদিন ঘরোয়া পার্টিতে সবার আধুনিক পোশাক-আশাকের সঙ্গে নিতান্তই সাধারণ পোশাক আর অভ্যাস নিয়ে মামা রাজ্জাক হাজির হলে তার রুচি নিয়ে কথা ওঠে। তখন মন্দিরা বাজিয়ে রাজ্জাক গান ধরে- ‘আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন আইলো রে, আরে সবার মাথা খাইলোরে, আমার সাধের একতারা কান্দে রে, আমার সাধের খঞ্জনি কান্দে রে’...। অনন্য সাধারণ জীবনমুখী এ গানে তখন মনোযোগ না আটকে পারা যায় না। দেখা যায়, গানের মধ্যে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অনেক উপাদান মিলে যায়। পুঁথি পাঠের আসর নেই, চৈত্র মাসে ঢাক বাজে না এ ধরনের হারানো ঐতিহ্যের জন্য আর্তনাদ আছে। এ গানকে ক্ষেত্রবিশেষে সবার কাছে শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানের সঙ্গে নস্টালজিক আবহ আছে। এ ধরনের অনুভূতির পাশাপাশি বাপ্পারাজ-রঞ্জিতা জুটির লিপে যখন আর একটি কালজয়ী গান একই সিনেমায় পাই সেটা কিন্তু একেবারে আলাদা স্বাদ। সে গানটি নিশ্চয়ই ধরতে পেরেছেন এতক্ষণে- ‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়...। এ গান কি পুরোনো হওয়ার কোনো সুযোগ আছে! প্রশ্নই আসে না। সিনেমার আবেদন বাড়ে এভাবেই গল্পে-গানে। এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে যোগ হয় ফ্যামিলি ড্রামা। সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে রাজ্জাক-বাপ্পারাজের ভুল বোঝাবুঝি। রাজ্জাককে কোনো কারণে মানসিক আঘাত দেয় বাপ্পারাজ। রাজ্জাক তখন তার পুরোনো প্রেমের স্মৃতি বলতে থাকে। ফ্ল্যাশব্যাক স্টোরিতে রাজ্জাক-ফাল্গুনী আহমেদের প্রেমের পর্ব চলে। সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে রবীন্দ্রসংগীত ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’। ‘ফ্ল্যাশব্যাক স্টোরির পরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে। ভিলেন পর্বে এ টি এম শামসুজ্জামান সরব ছিলেন। রাজ্জাক-বাপ্পারাজ এর মামা-ভাগ্নে রোল প্লে করা দর্শকের কাছে তখন আকর্ষণীয় ছিল। গানের কারণে সিনেমাটি স্মরণীয়। বিশেষ করে আমাদের মেইনস্ট্রিম কমার্শিয়াল সিনেমায় স্টোরি লাইন সাদামাটা হওয়ার পরিমাণ বেশি থাকলেও অনেক সিনেমাই গানের জন্য দর্শক মনে রেখেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে গানভিত্তিক কমার্শিয়াল সিনেমার বাজার আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই গুরুত্বের দিক থেকে ‘ঢাকা ৮৬’ গানের জন্য স্মরণীয়। ‘পাথরের পৃথিবীতে, আউল বাউল লালনের দেশে’ দুটি গানই কালজয়ী হয়ে আছে।
এমনকি গানের সঙ্গে ‘ঢাকা ৮৬’ নামকরণটিও সিনেমাটির জন্য ভিন্নতা ছিল দর্শক টানার ক্ষেত্রে। সময়কে মেনশন করে এমন নামকরণ দেখা যায় না। ’৮৬ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে একটা স্ট্রাগল পিরিয়ড পার করছে যেখানে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের ক্রাইসিস ছিল সম্পর্ক, বিদেশপ্রীতি, প্রেম, বেকারত্ব এসব নিয়ে। নাগরিক এসব সেন্টিমেন্ট কীভাবে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পাল্টাচ্ছে সেটারই ছোঁয়া আছে সিনেমাটিতে। এ ছবিটিতে জীবনকে খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ঢাকা ৮৬’ সিনেমার পোস্টারটি হাতে আঁকা। শৈল্পিক যত্ন আছে। আজকের নির্মাতাদের এ ধরনের সৃজনশীল কাজ স্টাডি করার সুযোগ আছে।