সত্তর ও আশির দশকে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামনে রেখে বেশ ক’টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছিল। সংখ্যার বিচারে ওই সময়ে ধর্মীয় ভাবাদর্শভিত্তিক মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি বেশি না হলেও দয়াল মুরশিদ (১৯৭৩), ঈমান (১৯৭৯), বে-দ্বীন (১৯৮০), কুদরত (১৯৮১), আল্লাহ মেহেরবান (১৯৮১), বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২), দ্বীন দুনিয়া (১৯৮৬) প্রভৃতি চলচ্চিত্র দর্শক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। তবে এগুলোর মধ্যে ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মমতাজ আলী পরিচালিত ‘ঈমান’ ছবিটি সর্বাধিক দর্শক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বাণিজ্যিকভাবেও ছিল অত্যন্ত সফল ছবি। ধর্মীয় ভাবধারার একটি আদর্শ চলচ্চিত্র সমাজে নানাভাবে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম। বিষয়টি লক্ষ্য রেখেই ‘ঈমান’ ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। মূলত সমকালীন ধর্মীয় মূল্যবোধের ছবিসমূহের মধ্যে ‘ঈমান’ ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে এক ভিন্নমাত্রার সংযোজন। ‘ঈমান’ ছবিটির পরিচালক ছিলেন মমতাজ আলী এবং এর প্রযোজনায় ছিলেন ঢালী ব্রাদার্স।
এতে অভিনয় করেছিলেন ওয়াসিম (রুস্তম ডাকাত), শাবানা (লাইলি), কবরী (ময়না- রুস্তমের ছোটবোন), রাজ (চৌধুরী- জমিদার), মুস্তাফা (ইমাম)সহ অন্যান্য। ‘ঈমান’ ছবিটির শুটিং স্পট ছিল মানিকগঞ্জ ও সাভারের ফুলবাড়িয়া এলাকায়। শুটিংয়ের সময়ে হাজারো মানুষ দর্শক হলে তারাও ছবির অংশ হয়ে ওঠে। ছবিতে দেখানো দরবেশ রুস্তমের আস্তানা ভাঙা মসজিদটি এখনো ফুলবাড়িয়ায় বর্তমান। রুস্তম হিসেবে ওয়াসিমের চরিত্রে সত্যিকার ‘দরবেশ’-এর প্রতিফলন ঘটে। নায়ক ওয়াসিমের জীবনে প্রায় দেড় শতাধিক ছবিতে অভিনয় করলেও ‘ঈমান’-এর চরিত্রটিই সবচেয়ে তার প্রিয়। বাস্তবিক অর্থেও তিনি দীর্ঘকাল সাভার-মানিকগঞ্জ এলাকায় অনেক মানুষের কাছে ‘দরবেশ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্যতিক্রম ঘটনা হলো, ওই এলাকায় বেশ ক’জন সনাতন ধর্মাবলম্বী ‘ঈমান’ ছবিতে ওয়াসিমের চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। যা বাংলাদেশের সিনেমা জগতে বিরল দৃষ্টান্ত। এতেই ওয়াসিমের অভিনয় ও ‘ঈমান’ ছবির বাস্তব সার্থকতার পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। তা ছাড়া এই ছবিতে ওয়াসিম প্রথমে ডাকাত সর্দার পরে তার বোনের খোঁজে বৈষ্ণব রূপ ধারণ এবং সব শেষে জনসাধারণের কাছে একজন প্রকৃত দরবেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ- এভাবে একই ছবিতে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করে সিনেমা শিল্পে এক অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তার মতে পরে কোনো এক অজানা কারণে তার নামটি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং সে বছর কাউকেই ওই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ছবির কাহিনির এক পর্যায়ে রুস্তম ডাকাত নিজের মুক্তির জন্য প্রথমে এক পীরের মাজারে সেজদাহ করে। কিন্তু বিষয়টি ইসলাম স্বীকৃত নয়। এটি উপমহাদেশের মুসলমানদের মাঝে অজ্ঞানতাবশত একটি প্রচলিত ধর্মীয় কুসংস্কার। হয়তো পরিচালক সেই কুসংস্কারের চিত্রকেই তুলে ধরেছেন। তবে দরবেশরূপী রুস্তম তার পরবর্তী জীবনের পুরোটাই মসজিদকেন্দ্রিক জীবন অতিবাহিত করে। তাকে আর কোনো কুসংস্কারের চিন্তা বা আশ্রয়ে দেখা যায়নি। এভাবে সার্বিক বিচারে ছবিটিতে অনেকটা ইসলামের সুফি ভাবধারা প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সদ্ভাব ও সাম্যনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ঈমানের’ ন্যায় আরও ছবি তৈরি হোক এটি সুস্থ রুচিসম্পন্ন দর্শকদের প্রত্যাশা।