সত্তর কিংবা আশির দশক। দেশীয় চলচ্চিত্র মানেই তাতে বিনোদনের পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ বক্তব্য থাকবে। কারণ চলচ্চিত্র হলো একটি দেশের প্রধান গণমাধ্যম। আর এ চলচ্চিত্র নির্মাণের অর্থ হলো এর মাধ্যমে জনগণকে একটি বক্তব্য বা মেসেজ দেওয়া। যাতে এর মাধ্যমে দেশ, সমাজ ও পরিবারের কল্যাণ সাধিত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো- নব্বইয়ের দশক থেকে চলচ্চিত্রে আর কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পেলেও তা হাতে গোনা। সস্তা বিনোদন, মানে অশ্লীলতা, ভাঁড়ামি, খুনাখুনি, মাদক গ্রহণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখনকার বেশির ভাগ চলচ্চিত্রের মূল গল্প। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। তারা ছবিতে এসব নেতিবাচক দিক দেখে নানা অপরাধে অহরহ জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সত্তর আর আশির দশকের কয়েকটি ছবির উদাহরণ টানলে দেখা যায় বক্তব্যসমৃদ্ধ এসব ছবির প্রতি কেমন আগ্রহ ছিল দর্শকের।
‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই, কোনোদিন কেউ যেন বলতে না পারে আমার কোনো বিদ্যা নেই...ও মাস্টার সাব...’, প্রয়াত জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর গাওয়া এ গানটি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ ছবির। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারহিট এ ছবিটি ছিল ‘নিরক্ষরতা দূরীকরণের’ স্লোগান নিয়ে নির্মিত। মানে বক্তব্যপ্রধান গল্পের ছবি। ছবিটি কয়েকটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ ও বোদ্ধাশ্রেণির প্রশংসা কুড়ায়। এ ছবির নির্মাতা প্রয়াত আজিজুর রহমান ছাড়াও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ছিল- ‘এ ধরনের জনসচেতনতামূলক বিষয়ভিত্তিক ছবি এখন আর নির্মাণ হয় না কেন’। খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার মতিন রহমান বলেন, চলচ্চিত্র মানে জীবনের ছায়া। যেখানে মানুষ তার পারিপার্শ্বিকতার চিত্র এবং বিনোদনের সঙ্গে সচেতনতামূলক বাণী পেয়ে জীবনে চলার পথের সঠিক সন্ধান পাবে। দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ আর হয় না বললেই চলে। ফলে দেশে নানা ধরনের অবক্ষয় বেড়েই চলছে। অথচ পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক ছবি এখনো প্রচুর নির্মিত হচ্ছে এবং দেশবিদেশে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি ছবির নাম নির্দ্বিধায় উল্লেখ করা যায়। যেমন অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘পিংক’, অক্ষয় কুমারের ‘প্যাডম্যান’, ‘টয়লেট এক প্রেমকথা’, রানী মুখার্জির ‘হিচকি’, আমির খানের ‘লগান’, ‘তারে জমিন পার’, ‘পিকে,’ অমিতাভ বচ্চনের ‘ব্ল্যাক’, ‘পিকু’, শ্রীদেবীর ‘ইংলিশ-ভিংলিশ’, মম ইত্যাদি। নির্মাতা হাসিবুর রেজা কল্লোল বলেন, ‘আমার নির্মিত ‘সত্তা’ ছবিটি ছিল সমাজে নারীর ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদের গল্প এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রতিবাদ।’ ছবিটি সাধারণ দর্শক থেকে সুধীসমাজ ব্যাপকহারে দেখেছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখন এ ধরনের বক্তব্যপ্রধান ছবি নির্মাণ বাদ দিয়ে বিনোদনের নামে মসলাদার ছবি বানাচ্ছি, যা দেশ ও সমাজের কোনো কল্যাণে আসে না বরং এতে নানা অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে এটি বেশি হচ্ছে। তবে মৌলিক গল্পের কিছু অবট্র্যাক মুভি এখনো বাণীসমৃদ্ধ হয়ে নির্মিত হচ্ছে এবং দেশবিদেশে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হচ্ছে। এমন কিছু ছবির মধ্যে রয়েছে ‘মৃত্তিকা মায়া’, ‘জালালের গল্প’, ‘গাড়িওয়ালা’, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’, ‘মাটির ময়না’, ‘পিতা’, ‘রানওয়ে’, সাঁতাও প্রভৃতি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভাবতেন কী করে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিনোদনের পাশাপাশি বক্তব্য দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়ে কীভাব দেশ, সমাজ ও পরিবারের উন্নয়ন করা যায়। এমন ভাবনা এখন আর নেই। কল্যাণকর এসব ছবির মধ্যে কয়েকটির নাম উল্লেখ করতেই হয়। যেমন- তিতাস একটি নদীর নাম, নয়ন মণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, কসাই, সুন্দরী, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, দুই পয়সার আলতা, সারেং বউ, জীবন থেকে নেয়া, আবার তোরা মানুষ হ, আলোর মিছিল, লাঠিয়াল, সুপ্রভাত, নোলক, পালংক, মেঘের অনেক রং, সীমানা পেরিয়ে, সূর্যকন্যা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলে, এখনই সময়, দি ফাদার, খোকন সোনা, জন্ম থেকে জ্বলছি, লাল কাজল, বড় ভালো লোক ছিল, পুরস্কার এবং মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র। ২০১৬ সালে এ দেশে নির্মিত হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমি একজন পাগল বলছি’। ছবিটি প্রসঙ্গে সাংবাদিক দেওয়ান পারভেজ ফেসবুকে দেওয়া তাঁর স্ট্যাটাসে বলেন, নগর জীবনে সবাই যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন একজন বৃদ্ধ মলিন কাপড়ে শহরময় ছুটে চলেছেন। তারপর হঠাৎই দাঁড়িয়ে গেলেন সড়কের পাশের আইল্যান্ডে, হাতে তুলে ধরলেন একটি প্ল্যাকার্ড। যাতে লেখা রয়েছে ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দিবস চাই’। ফরিদ চাচার গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা রায়হান রাফি সেটাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। এ ছবিতে দেখা যায়, শহরময় ঘুরে সবাইকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দিবস পালনের আহ্বান জানাচ্ছেন এক বৃদ্ধ। কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করছে না। সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। নাছোড়বান্দা ফরিদ চাচা পুলিশ থেকে নগরপিতা সবার কাছেই ছুটে গেছেন একটি মাত্র আবদার নিয়ে। বিনিময়ে মিলেছে দারোয়ানের গলা ধাক্কা আর পাগলের খেতাব। অগত্যা আবারও প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন ফরিদ চাচা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্ররা তখন তার সঙ্গে ছবি তুলতে ছুটে আসে, অনেকে আবার তাচ্ছিল্যও করে। কিন্তু অনড় ফরিদ চাচা রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন এক দফা এক দাবি নিয়ে। এ সময় হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন বৃদ্ধ। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সবকিছু চুপচাপ দেখছিলেন শামীম। কিন্তু এখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, ফরিদ চাচাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। তারপরই ঘটল আসল ঘটনা। শামীম ফরিদ চাচার গল্পটা ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন। ফলাফল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দিবস পালনের জন্য সবাই রাস্তায় নেমে এলেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমি একজন পাগল বলছি’ ইউটিউবে প্রকাশের পরপরই ভাইরাল হয়ে যায়। ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ দেখেছে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে নির্মাতা রায়হান রাফি বলেন, ‘আমি আগেও কয়েকটি বক্তব্যধর্মী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। সেই ধারাবাহিকতায় ফরিদ চাচার গল্পটা নিয়ে কাজ করলাম।’ এ ধরনের জনসচেতনতামূলক বক্তব্যপ্রধান বিষয় নির্বাচন প্রসঙ্গে রাফি আরও বলেন, ‘দেশে অনেক দিবস আছে, প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবস পালন করা হয়। কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য কোনো দিবস নেই। যদিও শুধু দিবস পালনের মাধ্যমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা সম্ভব নয়। তবে এর মাধ্যমে একটি অভ্যাস গড়ে তোলার প্রয়াস থেকেই আমার চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমি একজন পাগল বলছি’ অনলাইন দুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় মুশফিফুর রহিমসহ অনেক তারকাই ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করে এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘পরিবর্তন চাই’ নামের একটি সংগঠন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আমি একজন পাগল বলছি’র সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা সাধারণ মানুষের চিন্তাচেতনার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এখনকার সচেতন দর্শক এমনই বক্তব্যপ্রধান জনসচেতনতামূলক ও বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্র আশা করছে নির্মাতাদের কাছে।