দুই বাংলাতেই অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন চম্পা। পুরস্কৃতও হয়েছেন বহুবার। তাঁর বড় দুই বোন কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচন্দা ও ববিতা। ষাটের দশক থেকে বড়পর্দায় অভিনয় করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সুচন্দা। নির্মাণেও সফলতা দেখান তিনি। একই দশকের শেষের দিকে বড় বোন সুচন্দা এবং ভগ্নিপতি জহির রায়হানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন চম্পার মেজো বোন ববিতা। সত্তরের দশক ছিল ববিতার অভিনয়জীবনের সোনালি সময়। একদিকে দেশে একের পর এক সুপারহিট ছবিতে তাঁর অভিনয়, অন্যদিকে ১৯৭৪ সালে কলকাতার বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয় করে ববিতা পান আন্তর্জাতিক অভিনেত্রীর খ্যাতি। আর আশির দশকে বড় বোন সুচন্দার হাত ধরে তাঁর প্রযোজিত ‘তিন কন্যা’ ছবি দিয়ে বড়পর্দায় পথচলা শুরু চম্পার।
কেন আনন্দ-বেদনা
চলতি বছর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছেন অভিনেত্রী ববিতা। এতে চম্পাসহ পুরো পরিবার ভাসলেন আনন্দ আর খুশির বন্যায়। তাঁদের কাছে এ আনন্দ ছিল সীমাহীন। কিন্তু একই সঙ্গে আবার চম্পাসহ তাঁদের পরিবারের মনের গভীরে বেদনাও লতিয়ে উঠেছে। এমনটাই জানিয়েছেন চম্পা। তাঁর কথায়, ‘আমাদের বড় বোন সুচন্দা আপু। তিনি আমাদের আগে চলচ্চিত্রে আসেন এবং ষাটের দশকে কাগজের বউ, বেহুলা, কুঁচবরন কন্যা, কাঁচের দেয়াল-সহ অজস্র্র ছবিতে অভিনয় করে দর্শক-নির্মাতাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। নির্মাণেও মুনশিয়ানা দেখান। তাই ববিতা আপার আগে সুচন্দা আপাকে এ সম্মাননায় সম্মানিত করা হলে সবার খুব ভালো লাগত। কারণ আপার বয়স হয়েছে। উনি যদি জীবদ্দশায় এই সম্মান পান তাহলে এর চেয়ে বড় আনন্দের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। তাই আমরা ববিতা আপার প্রাপ্তিতে যেমন আনন্দিত তেমনি ববিতা আপা-সহ সবাই সুচন্দা আপার এই সম্মান আগে না পাওয়ায় বেদনাহত।
চলচ্চিত্রে আসতে চাননি চম্পা
কখনো চলচ্চিত্রে আসতে চাননি চিত্রনায়িকা চম্পা। কারণ তিনি হতে চেয়েছিলেন শীর্ষস্থানীয় মডেল। ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলকে দেখেই ছোটবেলায় মডেল হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রে অভিষেকের আগে আশির দশকে সাপ্তাহিক বিচিত্রা ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে চম্পা বলেছিলেন, তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন না। ওই সময় কোনো একজন বলেছিলেন, দুই বোনের মতো চলচ্চিত্রে চম্পা সফল হবে না। এ কথা শুনে জেদের বশে তাঁর চলচ্চিত্রে আসা। তিনি তাঁর দুই বোনকে দেখে কখনো ভাবেননি, তিনি চলচ্চিত্রে আসবেন। চলচ্চিত্রে তাঁদের ব্যস্ততার জীবন চম্পার পছন্দ ছিল না।
যেভাবে চলচ্চিত্রে...
বড় বোন সুচন্দার আগ্রহে চলচ্চিত্রে চম্পার অভিষেক হয় ১৯৮৬ সালে শিবলী সাদিকের ‘তিনকন্যা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই ছবির প্রযোজক ছিলেন সুচন্দা। তাঁরা তিন বোনই (সুচন্দা, ববিতা, চম্পা) এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। এ ছবিতে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় চম্পার অভিনয় অনেকেরই নজর কাড়ে। এতে একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে চম্পা অভিনয় করেন এবং ছবিগুলোও ব্যবসাসফল হতে থাকে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এক নম্বর নায়িকা ছিলেন চম্পা। সামাজিক, অ্যাকশন, ফোক-সব ধরনের ছবিতে তিনি সফলতা পান। তখন স্লোগান ছিল- ‘চম্পা মানেই ভালো ছবি’। তিন কন্যার পরই প্রচণ্ড সাফল্য আসে ‘সহযাত্রী’ এবং ‘ভেজা চোখ’ ছবিতে। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরপর বহু ছবি হিট হওয়ায় তিনি দেশের একজন আলোচিত শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। চম্পা প্রথম থেকেই বৈচিত্র্যবিলাসী। চরিত্রের প্রয়োজনে কোনো রূপসজ্জা ছাড়াই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে কুণ্ঠিত হন না তিনি।
ওপার বাংলায়ও প্রশংসিত
কলকাতা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান নির্মাতা গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘মনের মানুষ’ ছবিতে অভিনয় চম্পাকে একটি আলাদা স্থানে নিয়ে যায়। তাঁর খ্যাতির সীমানা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পদ্মা নদীর মাঝি ছবিতে মালা চরিত্রে অসামান্য অভিনয়ের জন্য চম্পা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রশিল্পেও। সত্যজিৎ তনয় সন্দীপ রায় ‘টার্গেট’ ছবিতে চম্পাকে নির্বাচন করেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তও ‘লাল দরজা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। ছবির পরিচালক বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত এবং প্রযোজক হচ্ছেন বাপ্পি লাহিড়ী। বুদ্ধদেব দিল্লি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘টার্গেট’ ছবিটি দেখার পর তাঁকে ‘লাল দরজা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পছন্দ করেন। মূলত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তাঁর ভিত্তিভূমি। কেননা ওখান থেকে ‘টার্গেট’, ‘লাল দরজা’ তারপর গৌতম ঘোষের ‘আবার অরণ্যে’ ছবিতে তিনি অভিনয়ের সুযোগ পান।
ছোটপর্দাতেই অভিনয় শুরু
১৯৮১ সালে বিটিভিতে আবদুল্লাহ আল মামুন রচিত ও প্রযোজিত ‘ডুবসাঁতার’ নামে একটি নাটকের মধ্য দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু। এ ছাড়া তিনি অভিনয় করেন, ‘শাহাজাদির কালো নেকাব’, ‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’, ‘খোলা দরজা’, ‘একটি যুদ্ধ অন্য একটি মেয়ে’, ‘অপয়া’, ‘এখানে নোঙর’ ইত্যাদি নাটকে। এসব নাটকে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত যত নাটকে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে চম্পার সবচেয়ে প্রিয় নাটক হচ্ছে- ‘এখানে নোঙর’। এখনো তিনি সমান জনপ্রিয়তায় ছোটপর্দার নাটকে অভিনয় করে যাচ্ছেন।
অভিনয়ের স্বীকৃতি
সেরা অভিনেত্রী হিসেবে চম্পা তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এগুলো হলো- গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, শাহজাহান চৌধুরীর ‘উত্তরের খেপ’ ও শেখ নেয়ামত আলীর ‘অন্যজীবন’। সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবেও দুবার পুরস্কার পেয়েছেন। চাষী নজরুলের ‘শাস্তি’ এবং মুরাদ পারভেজের ‘চন্দ্রগ্রহণ’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়াও ‘জিয়া স্বর্ণপদক’ ও ‘শেরেবাংলা পদক’ পেয়েছেন। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবিতে অভিনয়ে দক্ষতার জন্য ভারত থেকে পদক পেয়েছেন। কলকাতার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু তাঁকে পুরস্কৃত করেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাসখন্দ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর অভিনীত ‘লাল দরজা’ চলচ্চিত্রটি অস্কারের নমিনেশন পেয়েছিল।