ঢাকাই চলচ্চিত্রে বর্তমান সময়ে নতুন নায়ক-নায়িকার অভাব নেই। অভাব রয়েছে তাদের কাজের। নির্মাতাদের কাছে তারা উপেক্ষিত। কিন্তু কেন? এ বিষয়ে কয়েকজন নির্মাতার বক্তব্য তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
ডেডিকেটেড হতে হবে : দেবাশীষ বিশ্বাস
অনেক নির্মাতার মতে, নতুনদের নিয়ে কাজ করলে সেই কনটেন্ট ব্যবসা করে না। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি একেবারেই অমূলক নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নতুন যারা অভিনয়ে আসছে তাদের অধিকাংশেরই মূল ফোকাস কাজের প্রতি থাকে না, তাদের উদ্দেশ্য থাকে কীভাবে অতি সহজে এবং দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হওয়া ও নাম কুড়ানো যায়। এই দুঃখজনক চিন্তাভাবনার কারণে তাদের অভিনীত ছবিতে দক্ষতার অভাবে দর্শক তা প্রত্যাখ্যান করে ও নির্মাতা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ কারণেই নতুন শিল্পীদের ওপর নির্মাতারা আস্থা রাখতে পারেন না এবং তাদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নতুনরা যদি সত্যি কাজের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয় তাহলে তাদের নিয়ে কাজ করলে ফ্রেশ শ্বাস নেওয়া যায়। বর্তমানে শাকিব খান একা আর কত দিন এই ইন্ডাস্ট্রিকে টেনে নেবে। তাই অবশ্যই নতুন শিল্পীদের কাজের প্রতি শতভাগ ডেডিকেটেড হতে হবে। তাহলে সে এবং চলচ্চিত্র শিল্প দুই-ই বেঁচে যাবে। এ ছাড়া একজন পরিচালকের দায়িত্ব হলো শিল্পী তৈরি করা। তিনি যদি নতুনদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে পারেন তাহলে নতুনরা সহজেই সবার দৃষ্টি কাড়বে। আমি সব সময় নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য ও আগ্রহ বোধ করি। যেমন বছর কয়েক আগে ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করেছিলাম। সেই ছবিতে নায়ক-নায়িকা হিসেবে প্রায় নতুন মুখ আরিফিন শুভ ও আইরিনকে নিয়ে কাজ করেছি এবং তাদের কাছ থেকে যথাযথভাবে কাজ আদায় করে নিতে পেরেছি বলে সেই ছবি এবং তারা দর্শক নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।
কাজে আগ্রহের অভাব : মানিক
এখনকার নতুনদের মধ্যে কাজ শিখে আসা ও প্রপারলি কাজ করার আগ্রহের অভাব আছে। কারণ তাদের হাতে এখন অনেক মাধ্যম রয়েছে। যেমন টিকটক, ইউটিউব, নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল, ওটিটি ইত্যাদি। তাই আগের মতো বর্তমান সময়ের শিল্পীরা শুধু চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেয় না। এ কারণে নতুনদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নির্মাতাদের বেগ পেতে হয়। নতুন শিল্পীদের মধ্যে কাজের আগ্রহ কম থাকে এবং সহজে অর্থবিত্ত ও খ্যাতির লোভ বেশি থাকে। তাই তাদের কাজ হয় দুর্বল এবং দর্শক তাদের প্রত্যাখ্যান করে।
অন্যদিকে চলচ্চিত্রে নতুনরা সুযোগ না পাওয়ারও কারণ রয়েছে। যেমন- প্রযোজক, সিনেমা হল মালিক, ওটিটি, টিভি রাইটস সবাই সিকিউরিটি চায়। তাদের কথা হলো সুপারস্টার বা পুরোনো শিল্পী হলে সিকিউরিটি থাকে। নতুনদের ক্ষেত্রে নয়। তাই পরিচালকের ইচ্ছা থাকলেও এ কারণে নতুনদের তারা নিতে পারেন না।
অযৌক্তিক প্রবণতা বেশি : অনন্য মামুন
নতুন নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে কাজ শুরুর কদিন পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের মধ্যে কাজের চেয়ে সহজে অর্থবিত্তের মালিক আর নাম করার অযৌক্তিক প্রবণতা থাকে। এ ক্ষেত্রে আমি নিজেও ভুক্তভোগী। ক’বছর আগে নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়ে ‘কাছে এসে ভালোবাসো’ শিরোনামের একটি ছবি নির্মাণ শুরু করেছিলাম। কিন্তু তাদের অসহযোগিতায় কাজটি আজও শেষ করতে পারিনি। এ ছাড়া নতুনদের কনটেন্ট সিনেমা হল মালিক, দর্শক, ওটিটি এবং টিভি নিতে চায় না। ফলে নির্মাতারা নতুনদের নিয়ে কাজ করতে ভরসা পান না।
নতুনরাই দায়ী : সৈকত নাসির
আমার প্রায় সব ছবিই নতুনদের নিয়ে নির্মিত। তবে প্রায় নির্মাতা কেন নতুনদের নিয়ে কাজ করতে চান না তারও যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। অধিকাংশ নতুন শিল্পী অভিনয়ে এসে নিজেদের তারকা ভাবতে শুরু করে। অভিনয় নিয়ে চর্চা বা ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন মনে করে না। তাদের চলচ্চিত্রে আসার পেছনে যেন উদ্দেশ্য থাকে একটিই, সেটি হলো- কীভাবে সহজে দামি বাড়ি-গাড়ির মালিক এবং খ্যাতিমান হওয়া যায়। কিন্তু কাজের প্রতি মনোযোগ না থাকলে এসব লক্ষ্যের কোনোটিই পূরণ যে সম্ভব নয় তা তারা ভেবে দেখে না। এ কারণেই শাকিব খানের পর সেভাবে আর নতুন তারকার জন্ম হচ্ছে না। এ জন্যই প্রকৃত শিল্পীর অভাবে নির্মাতারা আজ অসহায়। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে নতুনদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আরও যেসব অন্তরায় রয়েছে সেগুলো হলো- সিনেমা হল মালিক, পরিবেশক, টিভি রাইটস, ওটিটির অনাগ্রহ। তারা ফেসভ্যালু নেই এমন নতুন শিল্পীর কাজ নিতে চায় না। যেমন পুরোনো শিল্পীর কনটেন্টের মূল্য যদি ওটিটি ৩০ লাখ টাকা দেয় সেখানে নতুন শিল্পী হলে ৫ লাখও দিতে চায় না। আসলে একসময় দেখার এত মাধ্যম ছিল না। একমাত্র সিনেমা হলই ছিল বিনোদনের মাধ্যম। তাই নতুন বা পুরোনো যে শিল্পীর ছবিই হোক না কেন, দর্শক তা দেখতে বাধ্য ছিল।
এখন দেখার মাধ্যম বেড়েছে বলে পছন্দের নতুন নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। আগে নির্মাতাদের ওপর সিনেমা হল মালিকদেরও আস্থা ছিল, নির্মাতারা যে শিল্পী নিয়েই কাজ করুক না কেন, তা তারা গ্রহণ করত। তা ছাড়া এখন কেউ আর কনটেন্ট বিচার করে না, সবাই ফেসভ্যালু চায়।
নতুনদের চর্চা করতে হবে : সাইফ চন্দন
একজন সুপারস্টার ছবিতে না থাকলে সেই ছবি টিভি রাইটস, ওটিটি এবং সিনেমা হল মালিকরা নিতে চান না। নিলেও রেট থাকে খুবই কম। এ কারণে নতুনরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে নতুনদেরও যথেষ্ট খামখেয়ালি রয়েছে। তারা কাজ দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেয়ে যে কোনোভাবে দ্রুত অর্থবিত্ত ও খ্যাতির মালিক হতে চায়। আমি বলব, নির্মাতারা নতুনদের যদি প্রপারলি ব্যবহার করতে পারে তাহলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে। নতুনদেরও কাজের প্রতি চর্চা থাকতে হবে। আমি আমার প্রায় সব ছবিতেই নতুনদের নিয়ে কাজ করেছি। পুরোনো বা সুপারস্টারদের নিয়ে কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। সুপারস্টারদের মেনটেইন করতে হয়, সে সময় আমার নেই। একজন সুপারস্টার বা পুরোনো শিল্পী নিয়ে কাজ করতে গেলে তার অসহযোগিতার জন্য সময়মতো কাজটি শেষ করা সম্ভব হয় না। নতুনদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। আমি মনে করি, যে শিল্পী মনেপ্রাণে বলবে এটি আমার ছবি এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে তাকে নিয়েই নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়। অন্যদিকে প্রোডাকশন হাউসগুলো নতুনদের নিয়ে গবেষণা করে না। যেহেতু আমাদের দেশে নতুন শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রে স্কুলিং ব্যবস্থা নেই, তাই তাদের নিয়ে চর্চা করতে হবে। কেননা চলচ্চিত্র হচ্ছে চর্চার জায়গা।