ভারত, চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন নগরভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ধুলা জমা পাতায় সালোকসংশ্লেষণের হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। পাতার নিচে সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাপ্রাপ্ত হয়। এতে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন নির্গমন কমে যায়। ফলে আরও বিষাক্ত হয়ে ওঠে বাতাস
শীত এলেই ভয়াবহ ধুলাদূষণের কবলে পড়ে রাজধানী ঢাকা। চলতি শীতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মানুষের চোখেমুখে, ফুসফুসে যেমন ধুলা ঢুকছে, তেমনই নীরবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি পাচ্ছে নগরীর গাছপালা। রাজধানীর সড়ক, মহাসড়ক, উড়ালসড়ক ও আবাসিক এলাকার অধিকাংশ গাছের পাতায় এখন পুরু ধুলার আস্তর। ধূসর হয়ে গেছে সবুজ পাতা। এতে কমে যাচ্ছে গাছের ক্লোরোফিল ও সালোকসংশ্লেষণ। বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন নির্গমন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এতে শুধু গাছই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, পুরো পরিবেশব্যবস্থা আরও বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, এমনিতেই ঢাকা মহানগরীতে জায়গা ও জনঘনত্বের তুলনায় গাছের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ফলে এই নগরের বাসিন্দারা কখনোই নিশ্বাসের সঙ্গে বুক ভরে অক্সিজেন নিতে পারে না। এই যৎসামান্য গাছের পাতাগুলোও ঢেকে গেছে ধুলার পুরু আস্তরে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো পরিবেশে। আরও দূষিত হয়ে উঠছে বাতাস। কিন্তু গাছ লাগানোয় সরকারি সংস্থাগুলোর যে আগ্রহ, তার ছিটেফোঁটাও নেই গাছের যত্নে।
এদিকে গতকাল ছুটির দিনের দুপুরেও ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। দুপুর দেড়টায় আইকিউএয়ারের বায়ুমান সূচকে (AQI) ঢাকার স্কোর ছিল ২৫৯, যা ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণির। পরিবেশবিদদের মতে, শীতকালে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটা, সড়কের উন্মুক্ত মাটি এবং যানবাহনের ধোঁয়া-সব মিলিয়ে বাতাসে ধূলিকণার ঘনত্ব বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়। গাছগুলো ধুলায় ঢেকে যাওয়ায় বাতাসের মান আরও খারাপ হচ্ছে। কারণ, গাছ পর্যাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন নির্গমন করতে পারছে না।
একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, গাছের পাতায় ধুলা জমলে প্রথম আঘাতটি আসে সালোকসংশ্লেষণে। পাতার ওপর ধুলার স্তর সূর্যালোককে আটকে দেয়। ফলে পাতার ভিতরে থাকা ক্লোরোফিল পর্যাপ্ত আলো পায় না, শক্তি উৎপাদনের হার কমে যায়। ভারত, চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন নগরভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ধুলা জমা পাতায় সালোকসংশ্লেষণের হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ধুলা জমে পাতার নিচের দিকে থাকা স্টোমাটা বা সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এই স্টোমাটার মাধ্যমেই গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নেয় এবং অক্সিজেন ছাড়ে। স্টোমাটা বন্ধ হয়ে গেলে গাছের শ্বাসপ্রশ্বাস ও বাষ্পীভবন কমে যায়। ফলে গাছের পানি ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, বৃদ্ধি কমে যায় এবং রোগ-পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় টিকে থাকার সংগ্রামে হার মেনে গাছ মারা যায়।
গতকাল দুপুরে ঢাকার ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়েতে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশে সারিবদ্ধ গাছগুলোর পাতায় এমনভাবে ধুলা জমেছে যে স্বাভাবিক সবুজ রং একেবারেই হারিয়ে গেছে। অথচ এই সড়কটিই ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন সড়ক। এ ছাড়া গত কয়েক দিনে এয়ারপোর্ট রোড, মিরপুর, শ্যামলী, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গাছগুলোকে একইভাবে ধুকতে দেখা গেছে। নেই যত্ন। নিয়মিত পানি দেওয়া হয় না। পাতার ওপর জমেছে ধুলার পুরু আস্তর।
পরিবেশ গবেষকরা বলছেন, গাছ শহরের প্রাকৃতিক ফিল্টার। তারা বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ছাড়ে, ধূলিকণা আটকে রাখে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন গাছ নিজেই ধুলায় আক্রান্ত হয় তখন এই প্রাকৃতিক সেবা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে নগরীর তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সামগ্রিক বায়ুগুণের ওপর। একই সঙ্গে ধুলা ও দূষণের কারণে পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য নগর জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ফুলের পরাগায়ন কমে যেতে পারে, খাদ্যশৃঙ্খলে দেখা দেয় অস্থিরতা।
ধুলাদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। চিকিৎসকদের ভাষায়, শীতকালে ধূলিকণার (বিশেষ করে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০) মাত্রা বেড়ে গেলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি, হৃদরোগ এবং চোখ ও ত্বকের নানা সমস্যা বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে ঝুঁঁকিতে থাকেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণ মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দেয়। বছরের বড় একটি সময় বায়ুমান অস্বাস্থ্যকর থাকায় ঢাকার সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বোঝা দিনদিন বাড়ছে। ধুলাদূষণের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য বা পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। নগর গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতায় দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। গাছ দুর্বল হলে শহরের সৌন্দর্য, বাসযোগ্যতা ও পর্যটন আকর্ষণও কমে যায়।
এদিকে প্রতি বছর শীতকালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে সড়ক ও গাছের ধুলা কমাতে পানি ছিটাতে দেখা যায়। তবে এবার সেই তৎপরতা তেমন চোখে পড়ছে না। পরিবেশবিদরা বলছেন, নিয়মিত পানি ছিটানো, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও যানবাহনের দূষণ কমানো এবং নগর গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সবুজ ঢাকা গড়ে তুলতে হলে গাছকে বাঁচাতে হবে। গাছ বাঁচলে শহর বাঁচবে।