ভিয়েতনামের উত্তর-পূর্ব উপকূলে টঙ্কিন উপসাগরের বুকে অবস্থিত হ্যালং বে, প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পকর্ম। নীলাভ সবুজ পানির ওপর ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার চুনাপাথরের দ্বীপ ও দ্বীপিকা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কুয়াশার ভিতর ভাসমান কোনো প্রাচীন কল্পকথা। এই ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ সৌন্দর্যের জন্য হ্যালং বে শুধু ভিয়েতনামের নয়, বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় প্রাকৃতিক গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
হ্যালং শব্দের অর্থ ‘অবতরণ করা ড্রাগন’। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে আকাশ থেকে নেমে আসা এক ড্রাগন শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে সমুদ্রে ছুড়ে দিয়েছিল অসংখ্য মুক্তা ও পাথর, যা পরিণত হয় আজকের দ্বীপ ও পাহাড়ে। কাহিনি যেমন রোমাঞ্চকর, বাস্তবতাও তেমনই বিস্ময়কর। প্রায় ১,৬০০টির বেশি দ্বীপ ও দ্বীপিকা নিয়ে গঠিত এই উপসাগরটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য।
হ্যালং বে-এর চুনাপাথরের পাহাড়গুলো কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফল। বৃষ্টির পানি ও সমুদ্রের ঢেউয়ে ক্ষয় হয়ে গড়ে উঠেছে খাড়া পাহাড়, গুহা, খাঁজ ও প্রাকৃতিক খিলান। ‘সাং সোট’ বা সারপ্রাইজ কেভ, ‘থিয়েন কুং’ গুহার ভিতরের প্রাকৃতিক অলংকরণ যে কাউকে মুগ্ধ করে। সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের ছায়া যখন পানিতে পড়ে, তখন পুরো উপসাগর যেন রঙিন ক্যানভাসে রূপ নেয়।
প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি হ্যালং বে জীববৈচিত্র্যেরও ভাণ্ডার। এখানে রয়েছে নানান প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, প্রবাল, শামুক ও পাখি। ভাসমান গ্রামগুলোতে বসবাসকারী জেলেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপন করছেন। নৌকা ভ্রমণে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
হ্যালং বে আজ শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, দায়িত্বশীল পর্যটনের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও। অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ থেকে এই নাজুক পরিবেশ রক্ষায় ভিয়েতনাম সরকার ও স্থানীয় সম্প্রদায় বিভিন্ন সংরক্ষণ উদ্যোগ নিয়েছে; প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, নৌযানের সংখ্যা সীমিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রচার তারই অংশ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান কীভাবে সৌন্দর্য ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, হ্যালং বে তার জীবন্ত প্রমাণ। যারা প্রকৃতির নিঃশব্দ ভাষা শুনতে চান, পাহাড়-সমুদ্রের মেলবন্ধনে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান, তাদের জন্য হ্যালং বে নিঃসন্দেহে এক আজীবন স্মরণীয় গন্তব্য।
লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়