এক সময় বাংলাদেশের গ্রামবাংলা ছিল নারকেল গাছে ভরপুর। ঘরের পাশে, পুকুরপাড়ে কিংবা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি গাছ থেকেই বছরে প্রচুর নারকেল মিলত। বাড়িতে মেহমান এলেই ডাব দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। গাছ থেকে নামানো হতো কাঁদি কাঁদি ডাব। কিন্তু গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেই চিত্র বদলে গেছে। গাছ থাকলেও এখন আর তাতে ডাব বা নারকেল ধরছে না। কোথাও আবার গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন ও গুজব ছড়ালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিব্যবস্থার অবক্ষয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, নারকেল গাছ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ফসল। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, নিয়মিত বৃষ্টিপাত ও পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না পেলে গাছে ফুল ধরা ও ফল হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বৃষ্টির বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও আবার অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আবার তাপমাত্রা কখনো ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নারকেল ফলনে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৯১ টন নারকেল উৎপাদন হয়েছিল। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ছিল ১৪.৬৬ টন।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ২২১ হেক্টর জমিতে ৫ লাখ ১০ হাজার ৩৬০ নারকেল উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ছিল ১৩.৩৫ টন। অর্থাৎ, একদিকে আবাদের পাশাপাশি হেক্টরপ্রতি ফলনও কমেছে। মালয়েশিয়ার পুত্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি বিভাগের ‘আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নারকেল চাষ উন্নত করা : চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন, যেমন খরা বা অতিবৃষ্টি, নারকেল গাছের পরাগায়ন এবং ফলের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। একই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নারকেল কমিউনিটি।
দ্য কোকোনাট কো-অপারেটিভে প্রকাশিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যাপী নারকেল উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণায় দেখা গেছে-উচ্চ তাপমাত্রা ও ভিন্ন বৃষ্টি প্যাটার্ন নারকেল গাছকে জলসংকট ও পোকামাকড় বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে বলা হয়, নারকেল গাছ পরিবেশ পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে এর বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা প্রভাবিত হয়। উপরন্তু, বর্ধিত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের ধরনে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে। অনাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমেও নারকেল গাছের ফুল ঝরে যায়। এতে আগে যেসব এলাকায় স্বাভাবিকভাবে নারকেল হতো, সেখানে এখন গাছ টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার এবং জৈব সারের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া অন্য গাছের যত্ন যতটা করা হয়, নারকেল গাছের ক্ষেত্রে হয় না। এতে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া নতুন নতুন পোকামাকড়ের আক্রমণ নারকেল গাছ ও ফলনের ব্যাপক ক্ষতি করছে। গাছের বয়স ৩০ বছরের বেশি হলেও ফলন কমে যায়।
কৃষিবিদদের মতে, সমস্যার সমাধানে উন্নত ও রোগ সহনশীল জাতের চারা রোপণ, জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি, নিয়মিত পোকা দমন এবং সেচ ব্যবস্থাপনা জরুরি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বরিশাল আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নারকেল গবেষক ড. মো. ইসহাকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে দেশের নারকেল গাছে হোয়াইট ফ্লাই ও বিভিন্ন ধরনের মাকড়ের আক্রমণ অনেক বেশি। এগুলো ডাব ও পাতার রস শুষে খায়।
পরাগায়নের দুই মাস পর ডাবের বৃদ্ধি শুরু হয়। তখনই মাকড়ের আক্রমণ বাড়ে। বাংলাদেশে প্রথম কেক্সিকান মাকড় শনাক্ত করি ২০০৪ সালে যশোরে। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। কচি ডাবে আক্রমণ করে খোসার রস শুষে খায়। খোসা কুচকে যায়। নারকেল বড় হয় না। কচি ডাব ঝরে পড়ে। সাদা মাছি পাতায় আক্রমণ করে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। পাতা কালচে হয়ে যায়। এগুলো আগে ছিল না। তবে টানা বৃষ্টিপাতে এগুলোর আক্রমণ কমে যায়।’ তিনি বলেন, ‘ভালো জাত নির্বাচন, নিয়মিত সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং কিটনাশক প্রয়োগ করতে পারলে নারকেলের ফলন বাড়ানো যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কাছে এলে পরামর্শ ও সহযোগিতা করি।’