ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কমোডো দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানেই বাস করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবিত গিরগিটি, কমোডো ড্রাগন। প্রায় ৭০ মিলিয়ন বছর আগের প্রাগৈতিহাসিক যুগের স্মৃতি বহনকারী এই বিশাল সরীসৃপের জন্যই বিশ্বজুড়ে কমোডো দ্বীপ বিশেষভাবে পরিচিত। তবে কমোডো শুধু ড্রাগনের আবাস নয়; এটি এক বহুমাত্রিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থারও উদাহরণ।
কমোডো দ্বীপসহ আশপাশের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত কমোডো ন্যাশনাল পার্ক বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা। এখানকার শুষ্ক সাভানা, পাহাড়ি বন, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ এবং প্রবালপ্রাচীর-সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশ গড়ে তুলেছে। এই বৈচিত্রম্যয় বাস্তুতন্ত্রে শুধু কমোডো ড্রাগনই নয়; বরং হরিণ, বুনোশূকর, নানান প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর সহাবস্থান দেখা যায়। কমোডো ড্রাগন প্রকৃতির এক বিস্ময়। দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ওজনে ৭০-৯০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এই শিকারি প্রাণী। শক্তিশালী চোয়াল, ধারালো দাঁত ও বিষাক্ত লালার কারণে এটি শিকার ধরতে অত্যন্ত দক্ষ। তবে ভয়ংকর চেহারার আড়ালে কমোডো ড্রাগন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, দুর্বল ও অসুস্থ প্রাণী শিকার করে বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে। দ্বীপটির সামুদ্রিক পরিবেশও সমানভাবে সমৃদ্ধ। কমোডো ন্যাশনাল পার্কের পানির নিচে রয়েছে রঙিন প্রবাল, মান্টা রে, হাঙর ও নানান প্রজাতির মাছ। বিশ্বের সেরা ডাইভিং স্পটগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এ এলাকা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রাকৃতিক এ সম্পদ আজ নানান চ্যালেঞ্জের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার, অতিরিক্ত পর্যটন ও আবাসস্থল ধ্বংস কমোডো দ্বীপের প্রতিবেশব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়া সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করেছে; পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা তারই অংশ। কমোডো দ্বীপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর কিছু জায়গা কেবল ভ্রমণের জন্য নয়, বরং শেখার জন্য, প্রকৃতি কীভাবে লাখ লাখ বছর ধরে নিজস্ব নিয়মে টিকে আছে। এই প্রাগৈতিহাসিক ড্রাগনের আবাস রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ অনন্য বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়