অসচেতনতা, লোভ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর সরকারি নজরদারির অভাবে বিপর্যস্ত দেশের পরিবেশ। নদনদী, খাল-জলাশয়, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য সবই চরম ঝুঁকিতে। তাপমাত্রা বাড়ছে হু হু করে। উন্নয়নের নামে কেটে ফেলা হচ্ছে পুরোনো গাছ। নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভের পানির স্তর। মরূকরণের পথে যাচ্ছে দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় জোয়ারের সঙ্গে লবণাক্ত পানি চলে আসছে দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত, যা ধ্বংস ডেকে আনছে কৃষির। বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ কমানোই যাচ্ছে না। দুই যুগ আগে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও বাড়ছে ক্ষতিকর পলিথিনের রাজত্ব। পরিবেশের এ নাজুক পরিস্থিতি বাড়াচ্ছে জীবনের ঝুঁকি। হানা দিচ্ছে নানার রোগ-ব্যাধী। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বেড়ে উঠছে মেধাহীন অসুস্থ প্রজন্ম।
সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ রক্ষায় আশাজাগানিয়া অনেক ভালো কথা বলে মানুষের মধ্যে আস্থার জন্ম দিলেও দেড় বছরে আইনকানুনে কিছু কাগুজে পরিবর্তন ছাড়া দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখাতে পারেনি। দখল ও দূষণমুক্ত হয়নি একটা নদীও। কমেনি শব্দদূষণ। বায়ুদূষণে এখনো শীর্ষে বাংলাদেশ। দেড় বছরে বাজার থেকে সরাতে পারেনি পলিথিন। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কয়েক ডজন চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের পরিবেশের বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে মরূকরণ, উষ্ণায়ন, প্লাস্টিকদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী, খাল ও জলাশয়ের মৃত্যু, সবুজ কমে যাওয়া, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ও ভূমিকম্প।
মরূকরণ : নদনদী ও খালের মৃত্যুতে ভূগর্ভের পানির ব্যবহার বাড়ায় মাটির নিচে তৈরি হচ্ছে শূন্য গহ্বর, যা দেশকে ঠেলে দিচ্ছে পানিসংকট ও মরূকরণের পথে। গত বছর গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১৫৩টি ইউনিয়ন ও ৭২টি মৌজাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ৫০ বছরে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ২৩০ ফুট নেমে গেছে। গাজীপুর অঞ্চলে ২০০০ সালের দিকে ৭০ থেকে ৮০ ফুট খনন করে পানি পাওয়া যেত। এখন ৪০০ ফুটের অধিক খনন করতে হয়।
উষ্ণায়ন : বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশের তাপমাত্রা। এপ্রিলে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গরমে কাজ করতে না পারায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস হারাতে হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট, কাচের ভবন বৃদ্ধি, এয়ারকন্ডিশনের ব্যবহার বৃদ্ধি স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
প্লাস্টিকদূষণ : ২০০২ সালে প্লাস্টিক/পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও গত দুই দশকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এর ব্যবহার বহু গুণে বেড়েছে। চায়ের কাপ থেকে এক টাকার শ্যাম্পুর প্যাকেটও এখন প্লাস্টিকের, যা রিসাইকেল হচ্ছে না। এসব অপচনশীল প্লাস্টিক কৃষিজমির উর্বরতা শত শত বছরের জন্য নষ্ট করে দিচ্ছে। খাল, বিল, জলাশয় ভরাট করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকছে জীববৈচিত্র্যে, জন্ম দিচ্ছে ক্যানসার।
শব্দদূষণ : শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিমালা থাকলেও কেউ মানছে না। নীরব এলাকা ঘোষিত হাসপাতালের সামনেই হর্নের শব্দে নাজেহাল মানুষ। যানবাহনেই বিল্ডইন হিসেবে আসছে উচ্চ শব্দের হর্ন। পৃথকভাবে উচ্চ শব্দের হর্ন আমদানিও হচ্ছে, প্রকাশ্যে বিক্রিও হচ্ছে। আর শব্দদূষণ শিশুর মস্তিস্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। বধিরতা, উচ্চ রক্তচাপসহ নানান রোগ বাড়াচ্ছে।
সবুজ রক্ষা : উন্নয়নের নামে ক্রমেই বৃক্ষশূন্য হচ্ছে দেশ। প্রতি বছর কাটা পড়ছে লাখ লাখ বহুবর্ষজীবী প্রাচীন গাছ। গত বছরের মে মাসে মাদারীপুরে শিরক তকমা দিয়ে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি বট গাছ কেটে ফেলে স্থানীয় কিছু মানুষ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে দেশে কেটে ফেলা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৮১৮টি বড় গাছ। গড়ে প্রতিদিন কাটা পড়েছে ৪৯৯টি গাছ। এতে কমছে বনভূমির পরিমাণ। বাড়ছে তাপমাত্রা। বাড়ছে বায়ুদূষণ। নাজুক হচ্ছে পরিবেশ।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ : পরিবেশ ধ্বংসে হারিয়ে যাচ্ছে পশুপাখি। ২০১৫ সালে আইইউসিএনের সমীক্ষায় বাংলাদেশে পাখি পাওয়া যায় ৫৬৬ প্রজাতির। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির পাখিকে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে ৫০ হাজারের বেশি শকুন ছিল। ২০২৩ সালের শুমারিতে ২৬৭টি শকুনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিগত ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু গণ্ডার বিলুপ্ত হয়েছে তিন প্রজাতির।
নদী রক্ষা : বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ১৪০০-এর বেশি নদনদীর তালিকা করে গেছে। নদী গবেষকদের মাঠপর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, তালিকার ৬০ ভাগ নদীরই বর্তমানে অস্তিত্ব নেই। পুরোনো স্যাটেলাইট ম্যাপে এসব নদীর চিহ্ন থাকলেও সেখানে এখন ঘরবাড়ি। যে নদীগুলোর স্রোত টিকে আছে সেগুলোও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দেশের কৃষি ও পরিবেশ বাঁচাতে নদীগুলো বাঁচানো সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
নানা দূষণ : বায়ুদূষণে কয়েক বছর ধরে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় যা যা নিষিদ্ধ করা আছে, তার কোনো কিছুই থেমে নেই। এ ছাড়া পয়োঃবর্জ্য আর শিল্পদূষণে নদী, খাল, স্যুয়ারেজের পানি ভয়াবহ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইটিপি চালায় না অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই পানি দিয়ে সেচ দেওয়ায় দূষিত হচ্ছে মাটিও। পরবর্তী সময়ে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে সেই বিষ ঢুকছে গাছ, মাছ, পশুপাখি ও মানুষের দেহে।
ভূমিকম্প : ভূমিকম্পের মূল কারণ প্রাকৃতিক হলেও বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, পাহাড় কাটা ও ভূমিক্ষয়, বড় বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ, তেল-গ্যাস উত্তোলন ও খনন, ভারী স্থাপনা নির্মাণ, তেল-গ্যাস শিল্পে ভূগর্ভে বর্জ্য জল ইনজেকশন, জিওথার্মাল প্রযুক্তির ব্যবহার, ভূগর্ভে কার্বন ডাই-অক্সাইড সঞ্চয় ইত্যাদি ভূমিকম্প সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রাখে। এসব কর্মকাণ্ড ভূগর্ভের চাপে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা ভূকম্প ঘটায়। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি।