মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সংঘাত দ্রুত বিস্তার লাভ করে লেবানন, সিরিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ যুদ্ধ শুধু ভূরাজনৈতিক সংকটই নয়, পরিবেশের ওপরও সৃষ্টি করছে নতুন হুমকি। বায়ু, পানি ও মাটি ভয়াবহ দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে।
এর আগে গত বছরের ১৩ জুন ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এক দফা সংঘাত শুরু হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ওই যুদ্ধের প্রথম পাঁচ দিনেই ৩৫ হাজার টনেরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা এক বছর ধরে চলা প্রায় ৮ হাজার ৩০০টি গাড়ির নির্গমনের সমান। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ড. বেঞ্জামিন নেইমার্ক এবং ঘানার জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ড. ফ্রেডেরিক ওটু-লারবির গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।
অন্যদিকে ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে। তিন বছর ধরে চলছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের সংঘাত। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহযুদ্ধও অব্যাহত রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালিবানদের মধ্যেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু স্থল বা আকাশের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় প্রভাব পড়ে পরিবেশে। যুদ্ধ চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, ধুলা ও গ্রিনহাউস গ্যাস। বিশেষ করে তেল স্থাপনা, জ্বালানি ডিপো, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা হলে দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো বিশ্বই এর ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার-নাসা, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি (সিইওবিএস) এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিবেশগত মূল্যায়নের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ ও ১০-সহ নানা ক্ষতিকর উপাদান ছড়িয়ে পড়ে। স্কাড-বি ধরনের একটি মাঝারি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে নির্গত হতে পারে ২০০ টনেরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড। অথচ একজন মানুষের বার্ষিক গড় কার্বন নিঃসরণ মাত্র ৪ থেকে ৫ টন।
টিএনটি বা আরডিএক্স জাতীয় বিস্ফোরক থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসে ছোট প্রাণী মারা যায়। বিস্ফোরণে ১৬০ থেকে ১৮০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সৃষ্টি হয়, যা মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উচ্চ শব্দের কারণে পাখি ও বন্যপ্রাণীর প্রজননেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিস্ফোরণের ফলে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে সিসা, ক্রোমিয়াম, কপারসহ নানা ভারী ধাতু, যা দীর্ঘস্থায়ী দূষণ সৃষ্টি করে। রকেট জ্বালানিতে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট পানিতে মিশলে ক্যানসার ও হরমোনজনিত নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ক্ষত এখনো বহন করছে দেশটি; এখনো সেখানে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মের ঘটনা ঘটে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে বেশ কয়েকটি তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে আগুন ও বিস্ফোরণের ফলে ধোঁয়ার বিশাল মেঘ তৈরি হয়েছে। পরিবেশ গবেষকদের মতে, এমন বিস্ফোরণে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম ধুলিকণা (পিএম ২.৫) বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
পরিবেশগত আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি এলাকায়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এ পথ দিয়ে পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে যদি তেলবাহী জাহাজ বা তেল স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়, তাহলে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধগুলোতে এমন দূষণের নজির রয়েছে, যার ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরের পানিতে ইরাকি বাহিনী অপরিশোধিত তেল ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, যা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত।
পরিবেশের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ১৯১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করা ১৯৩টি কেস স্টাডির তথ্য বলছে, এসব সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বনভূমি ও ভূমি। গবেষণা অনুযায়ী, বনভূমি ধ্বংসের হার ৩৪ শতাংশ এবং ভূমিক্ষয়ের হার ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণে ভারী ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থ মাটিতে জমা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পানির পাইপলাইন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা শিল্পকারখানা ধ্বংস হলে রাসায়নিক পদার্থ নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটই নয়, পরিবেশের ওপরও বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, যুদ্ধে শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ও ঘটছে। যুদ্ধ না করেও আমাদের মতো অনেক দেশ এর ভুক্তভোগী। তাই শান্তিপ্রিয় দেশগুলো জাতিসংঘের কাছে যুদ্ধের কারণে তাদের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরতে পারে, যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানাতে পারে এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।