ডেঙ্গু ঝুঁকিতে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা। এ জন্য মশাকে দায়ী করা হলেও এর পেছনে মূল কারিগর জলবায়ু পরিবর্তন। কারণ, ডেঙ্গু মশার প্রজনন, বিস্তার ও ডেঙ্গু ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে রয়েছে তাপমাত্রার সম্পর্ক। যে কারণে শীতে কমে যায় ডেঙ্গুর প্রভাব। শুধু রোগব্যাধির বিস্তারই নয়, পৃথিবীর জলবায়ু এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে, যেখানে ভারসাম্য প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে। টানা ১১ বছর রেকর্ড উষ্ণতা, সমুদ্রের অস্বাভাবিক তাপ বৃদ্ধি, বরফ গলার গতি বেড়ে যাওয়া-সব মিলিয়ে জলবায়ু এখন ‘লাল সংকেত’ দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমও।
সংস্থাটির স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট-২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫-এই সময়কালই ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৫ সাল ছিল বিগত ১৭৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর, যা প্রাকশিল্প যুগের (১৮৫-১৯০০) তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা ৬৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৩ সালে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১১ সেন্টিমিটার (৪.৩ ইঞ্চি) বেড়ে গেছে। উত্তর আমেরিকা ও আইসল্যান্ডের হিমবাহগুলোও দ্রুত বিলীন হচ্ছে। চরম আবহাওয়ায় কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, হাজারো প্রাণহানি হচ্ছে। গত সোমবার (২৩ মার্চ) বিশ্ব আবহাওয়া দিবস উপলক্ষে বার্ষিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ডব্লিউএমও।
প্রতিবেদন বলছে, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও খরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। এসব দুর্যোগ শুধু প্রাণহানি নয়, অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে পারে বলে সতর্ক করেছে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি)।
এই প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ‘আর্থ এনার্জি ইমব্যালেন্স’ বা পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতাকে মূল জলবায়ু সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি মূলত পরিমাপ করে সূর্য থেকে কতটুকু শক্তি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে আর কতটুকু মহাকাশে ফিরে যাচ্ছে। জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানায়, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস গত আট লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে সূর্য থেকে আসা শক্তি আর পৃথিবী থেকে বের হওয়া শক্তির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। পৃথিবী অধিক তাপ ধরে রাখছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯১ শতাংশই জমা হচ্ছে মহাসাগরে। ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। গত ৯ বছর ধরে সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে এবং ২০২৫ সালে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও দেখা গেছে। এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে। হুমকিতে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও শক্তি বাড়ছে। এ ছাড়া গত দুই দশকে মহাসাগর প্রতি বছর মানবজাতির মোট শক্তি ব্যবহারের প্রায় ১৮ গুণ শক্তি শোষণ করেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার বড় প্রমাণ।
তাপমাত্রা বাড়ায় আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে। ২০২৫ সালে আর্কটিকের বরফ ছিল সর্বনিম্ন বা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এবং অ্যান্টার্কটিকের বরফ ছিল তৃতীয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নভূমি ও উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং লবণাক্ততা বাড়ার ফলে উপকূলীয় কৃষি হুমকিতে পড়বে, পানীয় জলের সংকট বাড়বে, জলবায়ু উদ্বাস্তু বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য, স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি শ্রমিক (মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ) প্রচণ্ড ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, বিশেষ করে কৃষি ও নির্মাণ খাতের কর্মীরা। এই পরিস্থিতি খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে। এ ছাড়া নানান ধরনের রোগব্যাধি বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘এল নিনো’ আবহাওয়া প্যাটার্ন সক্রিয় হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে এবং নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে।
ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, ‘আমাদের আবহাওয়া প্রতিদিনই আরও চরম হয়ে উঠছে, যার প্রভাব আমরা দীর্ঘদিন ভোগ করব।’ তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই প্রভাব হাজার বছর ভোগ করা লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে বলছে, পৃথিবীকে রক্ষা করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমাতে হবে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, জলবায়ু তথ্যকে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব দেশগুলোকে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, এই প্রতিবেদন একটি সতর্কবার্তা-জলবায়ু বিশৃঙ্খলা দ্রুত বাড়ছে, দেরি করা মানে বিপদ ডেকে আনা।